লক্ষ্মীপুর-ভোলা জেলার সীমান্তবর্তী চর রমণীমোহন ইউনিয়নের
মেঘনা নদীতে জেগে ওঠা দ্বীপ চর মেঘা দখলে
নেয়ার অভিযোগ উঠেছে রাসেল খাঁর নেতৃত্বে একদল দস্যুর বিরুদ্ধে। এ সময় অস্ত্রের
মুখে কোটি টাকার সয়াবিন লুট করে নিয়ে যায় তারা। গত কয়েকদিন থেকে
দস্যুরা ওই চরে অবস্থান
নিয়ে কৃষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। জমির সয়াবিন ও চরের বাড়িঘর
হারিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন দেড় শতাধিক কৃষক।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে রুহুল আমিন মাতুব্বর নামে এক কৃষক। এতে রাসেল খাঁকে প্রধান করে ২০ জনের নাম উল্লেখসহ ৪০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রুহুল আমিন মাতুব্বর সদর উপজেলার চর রমণীমোহন ইউনিয়নের সিরাজুল মাতুব্বরের ছেলে।
অভিযুক্ত রাসেল খাঁ ভোলা জেলার রাজাপুর ইউনিয়নের মৃত শামছু খার ছেলে ও দস্যু বাহিনীর প্রধান। অন্য অভিযুক্তরা হলেন—রাসেল খাঁর ভাই হালিম খা, মিন্টু খা, মাপু খা, মো. মাহবুবুল হক রাসেল, মামুন খা, জসিম বারী, আফজল মাতুব্বর, মো. খবির সিকদার ও ছোয়াদ ব্যাপারী। অন্যরা লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের চর কাছিয়ার শাহজালাল রাহুল, কালাম ব্যাপারী, রাজ্জাক ব্যাপারী, সাহেব আলী, জুলহাস, বাবুল ব্যাপারী, হাকিম আলী, সালাহ উদ্দিন, সাদুদম ব্যাপারী, সুলতান ব্যাপারীসহ ১৫/২০ জন।
রোববার রাত থেকে দস্যুরা সশস্ত্র মহড়া দেয়। সোমবার দিনের বেলায় ফসল তুলে আনতে গেলে গুলি করে ধাওয়া করে সন্ত্রাসীরা। সয়াবিন কাটতে হলে প্রত্যেক কৃষককের ৫০ হাজার টাকা চাঁদার শর্ত দেয়। রাসেল খাঁদের দাবি করা চাঁদার টাকা না দেয়ায় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চর দখলে নেয় তার দস্যু বাহিনী। লুট করে নিয়ে যায় কৃষকের কোটি টাকার ফসল। এমনকি ওই চরে বসবাসকারী কৃষককেও তাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দস্যু বাহিনীর প্রধান রাসেল খাঁ বলেন, ‘চাঁদা দাবি, সয়াবিন লুট ও অস্ত্র প্রদর্শনে চর দখলের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। বিরোধীয় ওই চরটি আমাদের ভোলা জেলার অন্তর্গত। ওখানে আমাদের ৩০০ একর জমি রয়েছে। সেখানে দীর্ঘদিন আমরা চাষাবাদ করছি। লক্ষ্মীপুরের কিছু সন্ত্রাসী চরে আমাদের আবাদ করা সয়াবিন লুট করতে না পেরে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাকে হয়রানি করছে।’
লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘চর দখল, সয়াবিন লুট ও মারধরের ঘটনায় একটি অভিযোগ পেয়েছি। শিগগিরই ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোন দস্যু বাহিনীকে চর দখল কিংবা কৃষকদের ফসল লুট ও ঘর-বাড়ি দখল করতে দেয়া হবে না।’
মঙ্গলবার চর রমণীমোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীরহাট থেকে ট্রলার নিয়ে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে চর মেঘার গিয়ে দেখা যায়, ওই চরে রাসেল খাঁর নেতৃত্বে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সারিবদ্ধভাবে মেঘনা নদী থেকে চরে প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে ভোলা থেকে আসা শতাধিক দস্যু। রাসেল খাঁর ভাই মিন্টু খাঁর নেতৃত্বে অস্ত্রধারী আরেকটি দল স্পিড বোটে করে মেঘনা নদীতে মহড়া দিচ্ছে। কোনো ট্রলার ওই চরে ভিড়তে চাইলে অস্ত্রের মুখে ফিরিয়ে দিচ্ছে তারা। এতে প্রাণের ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে নিরীহ কৃষক। এ সময় তাদের (দস্যু) সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে গণমাধ্যমকর্মীদের নৌকাও ফিরিয়ে দেয়া হয়।
চর মেঘার কৃষক হারিছ সর্দার বলেন, ‘নতুন জেগে ওঠা এ চরে চাষাবাদ করতে গেলেই রাসেল খার দস্যুরা ১ থেকে দেড় লাখ টাকা করে কৃষকের কাছে চাঁদা দাবি করে। দাবির চাঁদা না দেয়ায় আমার হাত-পা মুড়িয়ে ভেঙে পঙ্গু করে দিয়েছে। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করায় দস্যুরা আমার ছেলে রাকিবকে জবাই করে হত্যা করে লাশ গুম করে রেখেছে। আজও ছেলের মরদেহ খুঁজে পাইনি। শেখ ফরিদ নামে আরেক কৃষককেও তারা হত্যা করেছে।’
ভুক্তভোগী বিবি আনঞ্জুমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শহর থেকে চর অনেক দূরে হওয়ায় পুলিশ এখানে আসতে চায় না। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।’
ভুক্তভোগী সিরাজ সর্দার বলেন, ‘বিগত দুই বছর ধরে তারা আমাদের ফসল ওঠাতে দেয় না। ভোলার রাসেল খাঁ ও হালিম খাঁর নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা ৪-৫ লাখ টাকা চাঁদা চায়। না দিলে চাষীদের সব ফসল তুলে লুট করে নিয়ে যায়। রায়পুরের চর কাছিয়ার রশিদ মোল্লা, শাহজালাল রাহুল তাদের মদদে আমাদের সব ফসল লুট করে।’










