নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যেই খুলনায় বেড়েছে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ফেরদৌসী আক্তার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া একজনের বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়া ও আরেকজনের বাড়ি বাগেরহাটের রামপালে। এ নিয়ে বিভাগে চলতি বছর মোট ৩৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান ফেরদৌসী আক্তার।
এদিকে বিভাগের সব হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জ্বর-কাশির রোগীদের করোনা পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর জন্যও আইজিএম ও আইজিজি এবং এনএস-১ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ওয়ার্ড করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুলনার সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ।
খুলনা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ মেহেদী নেওয়াজ জানান, বর্তমানে হাসপাতালে দুয়েকজন ডেঙ্গু রোগী আসায় তাদের মেডিসিন ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. রবিউল হাসান বলেন, হাসপাতালের তিনজন রোগীর মধ্যে একজন মেডিসিন ওয়ার্ডে ও দুজন শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। তবে তাদের কারো অবস্থা গুরুতর নয়।
ডা. রবিউল আরো বলেন, তাদের ধারণা, এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে। সে কারণে তারা প্রথম পর্যায়ে শিগগিরই ১০ অথবা ২০ শয্যা নিয়ে ডেঙ্গু ইউনিট চালু করবেন।
হাসপাতালের কোথায় এই ইউনিট করা হবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আজ চিকিৎসকদের নিয়ে বৈঠক করে কতটি শয্যা হবে, কোথায় ওয়ার্ডটি হবে এবং কবে থেকে চালু করা হবে, তা চূড়ান্ত করা হবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানান, বর্তমানে হাসপাতালে তিনজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তারা হলেন বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার কচুবুনিয়া গ্রামের সজীব শেখ (৩২), একই
জেলার রামপাল উপজেলার বাঁশতলি গ্রামের অতিস (৪) ও নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার লুটিয়া গ্রামের কানু ঘোষের ছেলে লিংকন ঘোষ (১০)।
ডা. সুহাস জানান, এর মধ্যে সজিব ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্পে কাজে করেন। ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন, পরে ২ আগস্ট খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন।
অতিসের বাবা অপু জানান, ঢাকা থেকে তার ছেলে সম্ভবত আক্রান্ত হয়েছে।
বটিয়াঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান জানান, উপজেলার হাটবাটি গ্রামের ২০ বছর বয়সী যুবক মুন্না ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তার ঢাকায় যাওয়ার রেকর্ড নেই। তিনি স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত হয়েছেন বলে তারা ধারণা করছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. জিল্লুর রহমান (তরুণ) বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মূলত প্রয়োজন রক্ত। রক্তের মজুদ না থাকলেও রক্তদাতাদের তালিকা তাদের কাছে রয়েছে। ফেসবুকে এ-সংক্রান্ত একাধিক গ্রুপও আছে। সুতরাং রক্তের প্রয়োজন হলে দ্রুত তাদের রক্তের জোগান দেয়া যাবে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. এসএম তুষার আলম জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় প্লাটিলেট দিতে হাসপাতালে আলাদা দুটি মেশিন প্রয়োজন। এ দুটি মেশিন ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী।
ডা. তুষার আরো বলেন, অ্যাফারেসিস মেশিন হলে রক্ত নষ্ট হবে না। এটি একটি অত্যাধুনিক ও উন্নতমানের মেশিন। কোনো রক্তদাতা একজন রোগীকে রক্ত দিলে সেখান থেকে শুধু প্লাজমা আলাদা করে নেয়ার সুযোগ আছে। অর্থাৎ রোগীর যা দরকার শুধু সেটুকুই গ্রহণ করা হবে। বাকিসব দাতার শরীরে থেকে যাবে।
অন্যদিকে খুলনা সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. স্বপন কুমার হালদার বলেন, ডেঙ্গু বিষয় নিয়ে তাদের মূলত দুটি বিভাগ কাজ করছে।
কনজারভেন্সি বিভাগ আগে থেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে। আর স্বাস্থ্য বিভাগের ব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত ডেঙ্গু বিষয়ে প্রচারণা চলছে। বিশেষ করে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
জন উদ্যোগ খুলনার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, নগরীতে মশার উপদ্রব বেড়েছে। সন্ধ্যার পর মশার যন্ত্রণায় টেকা দায় হয়ে পড়লেও খুলনা সিটি করপোরেশনের কোনো তত্পরতা আমার চোখে পড়েনি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং লার্ভা নিধনের কাজে অনেক পিছিয়ে রয়েছে তারা।
তবে মশার উপদ্রব ঠেকাতে নগরীতে ব্যাপক কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আব্দুল আজিজ।
তিনি বলেন, মশার উপদ্রব রোধে খুলনা সিটি করপোরেশনের কাজ চলমান। সিটি করপোরেশনের ৪৬টি ফগার মেশিন রয়েছে। আরো ২০টি মেশিনের ওয়ার্ক অর্ডার হয়েছে। প্রতিদিনই ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধন অভিযান চলমান আছে।










