চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং বন্দরের কোনো স্থাপনা দেশী বা বিদেশী মালিকানায় ইজারা না দেয়ার দাবিতে বন্দর রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম বন্দর অভিমুখে পদযাত্রা করেছে। কর্মসূচি থেকে আগামী ১৫ আগস্ট ‘বন্দর রক্ষা নাগরিক কনভেনশন’ আয়োজনের ঘোষণাও দেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের বাদামতলী মোড় থেকে আজ বন্দর অভিমুখে পদযাত্রার আয়োজন করে বন্দর রক্ষা কমিটি। পদযাত্রা বারিক বিল্ডিং মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে সংগঠনের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

পদযাত্রা শুরুর আগে বাদামতলী মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। সঞ্চালনা করেন সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু।

সমাবেশে বক্তব্য দেন শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য তপন দত্ত, বন্দর সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শ ম জামাল উদ্দিন, বাসদ (মার্ক্সবাদী) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সদস্য দীপা মজুমদার, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল বাতেন, সহকারী সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম ফরাজী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুর রহমান মজুমদার, বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রহিম, হোটেল সেন্ট মার্টিন কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান, নির্মাণ শ্রমিক দল চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি আব্দুল মন্নানসহ বিভিন্ন শ্রমিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা।

তপন দত্ত বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ বিদেশী বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়া হলে তা দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন আছে। তবে এর অর্থ জাতীয় সম্পদ ইজারা দেয়া নয়।

তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে লাখো শ্রমিক, কর্মচারী, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। বন্দরের উন্নয়নের নামে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বা জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে জনগণ তা মেনে নেবে না। বন্দর রক্ষায় দেশের সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের সম্পদ। শ্রমিকদের মতামত উপেক্ষা করে বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হবে না। অতীতের মতো ভবিষ্যতেও দেশের স্বার্থ রক্ষায় শ্রমিকরা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবেন বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, বন্দরের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তবে তা রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই করতে হবে। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে বন্দর ব্যবস্থাপনা তুলে দিলে দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকরাই বন্দরের কার্যক্রম সচল রেখেছেন। শ্রমিকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে শ্রমিক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে তার প্রতিরোধ করবে।

অন্যান্য বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন্দরের কোনো স্থাপনা দেশী বা বিদেশী মালিকানায় ইজারা দেয়ার উদ্যোগ জনগণ মেনে নেবে না। তারা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের দাবি জানান। একই সঙ্গে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

সমাবেশে প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার আগামী ১৫ আগস্ট সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই হলে ‘বন্দর রক্ষা নাগরিক কনভেনশন’ আয়োজনের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, শ্রমিক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এ কনভেনশন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা ‘বন্দর বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’, ‘এনসিটি-সিসিটি ইজারা দেওয়া চলবে না’, ‘জাতীয় সম্পদ রক্ষায় জনগণ ঐক্যবদ্ধ’ এবং ‘বন্দর রক্ষার আন্দোলন সফল করো’ লেখা ফেস্টুন ও ব্যানার নিয়ে বন্দর অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন।