দেশে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। মহামারী নিয়ন্ত্রণকে দুষ্কর করে তুলেছে ডেল্টা ধরনের আবির্ভাব। সংকটাপন্ন অবস্থায় আগত রোগীর চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতেও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত মাসের শেষার্ধে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় সংকটাপন্ন অবস্থায় আগত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। তাদের সবাইকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দিতে হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে শিগগিরই পরিত্রাণের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন রোগতত্ত্ববিদরা। বরং অবস্থা দিনে দিনে আরো খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
দেশে করোনার দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ শুরু হয় চলতি বছরের মার্চে। এরপর মে মাসের মাঝামাঝি সংক্রমণ কিছুটা কমে আসে। সপ্তাহখানেক পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকার পর সংক্রমণের সংখ্যা আবার বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসের প্রথম ১৫ দিনে দেশে করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছিলেন ৩২ হাজার ব্যক্তি। শেষ পনের দিনে অর্থাৎ দ্বিতীয়ার্ধে শনাক্ত হয়েছেন প্রায় ৮০ হাজার রোগী। সে হিসেবে গত মাসের শেষ ১৫ দিনে সংক্রমণ শনাক্তের মোট সংখ্যা বেড়েছে প্রথমার্ধের তুলনায় আড়াই গুণ। এ সময় কভিডে অসুস্থ থাকা রোগীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৭ শতাংশের বেশি।
অধিদপ্তরের দৈনিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গত মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোর সাধারণ শয্যায় করোনা রোগী ভর্তির সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এর মধ্যে ১-১৫ জুন প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে ১৫-১৬ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি হয়েছেন সাড়ে চার হাজার করোনা রোগী। তাদের মধ্যে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা রোগীদের আইসিইউতে নেয়া হয়। মাসজুড়ে ১৩ হাজারের বেশি রোগীকে আইসিইউতে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ১৫ দিনে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছে ৫ হাজার ২৬৭ জন। দৈনিক হিসাবে এ সংখ্যার গড় দাঁড়ায় ৩৫১-এর বেশিতে। শেষ ১৫ দিনে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজার ৮৩৪ জন। অর্থাৎ গত মাসের শেষার্ধে প্রতিদিন গড়ে ৫২২ জন রোগী সংকটাপন্ন অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসা নিয়েছেন। সে হিসেবে জুনের প্রথমার্ধের তুলনায় শেষার্ধে হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসা নেয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
রোগীর চাপে এরই মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি জেলার হাসপাতালে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত আইসিইউ শয্যার অভাবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সংকটাপন্ন রোগীরাও। গতকাল দেশের ১৪টি করোনা বিশেষায়িত হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে একটি শয্যাও খালি ছিল না। এর মধ্যে রাজধানীতেই এমন হাসপাতাল ছিল ১০টি। ঢাকার বাইরে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে করোনা সংকট প্রকট আকার নিয়েছে। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের সাতটি হাসপাতালে এখন রোগীর সংখ্যা শয্যা সংখ্যার চেয়ে বেশি। অনেক রোগীকেই এখন হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, গতকাল সেখানে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত ৩৮৫ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিলেন ৪৪২ জন। ২০টি কভিড আইসিইউ শয্যার সবক’টিতেই সংকটাপন্ন রোগী ভর্তি ছিলেন। একইভাবে খুলনায়ও সাধারণ ও আইসিইউ শয্যার সংকট দেখা দিয়েছে। গতকালও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬০টি সাধারণ শয্যার বিপরীতে ভর্তি ছিলেন ২৮৩ জন রোগী। হাসপাতালটির আইসিইউ ইউনিটের ২৫টি শয্যার সবক’টিতেই রোগী ভর্তি ছিলেন।
দেশে গত ৮ মে প্রথম করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর গত জুনের প্রথম দিকে ডেল্টার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা গোষ্ঠীগত সংক্রমণ ঘটে। বর্তমানে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে সংকটাপন্ন রোগীর সংখ্যা বাড়ার ক্ষেত্রে এ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন ভাইরোলজিস্ট ও রোগতত্ত্ববিদরা।
তারা বলছেন, গত এক মাসের প্রতিদিনই হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কোনো চেষ্টাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন ও টিকা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সংক্রমণ বেড়েছে।
তবে সংক্রমণ বাড়ার প্রধান কারণ হিসেবে এখনই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে নিশ্চিতভাবে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন না রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট করোনার ধরনের কারণেই যে সংক্রমণ বৃদ্ধি পায় তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করাই সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
সংক্রমণের গতি সহসাই নিচে নামছে না বলে মনে করছেন সরকারের করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি কমিটির সদস্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ভাইরাসের সংক্রমণ কখনো আপনাআপনি কমে যায় না, এটাকে ঠেকাতে হয়। এর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। সরকার যে বিধিনিষেধ দিয়েছে, তাতে চলাচলের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ কোনো নির্দেশনা নেই। যারা সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের আলাদা করে সবার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, দেশে বর্তমানে ১৩১টি সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কভিড-১৯ পজিটিভ রোগীদের চিকিৎসায় মোট ১৩ হাজার ২৩৯টি সাধারণ শয্যা রয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোয় আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ১ হাজার ১৬৫টি, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ১ হাজার ৬৭০টি, অক্সিজেন সিলিন্ডার ২৪ হাজার ৪৬৪টি এবং অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরের সংখ্যা ১ হাজার ৬৪৭টি।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগও সংক্রমণ বাড়ার পেছনে স্বাস্থ্যবিধি না মানাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও পরিচালক (অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, সংক্রমণ কমানোর জন্য সরকার আবারো কঠোর বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছে। এতে আগামীতে সংক্রমণ কমে আসবে। সংক্রমণ কমাতে সরকার পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে।










