সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক ও জাতীয় নানা বাস্তবতায় (ক্ষুধা, দারিদ্র্য, কর্মহীনতাসহ বহুমাত্রিক ঝুঁকি ও বিপদের সম্ভাবনা) অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ সামলাতে সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের হিমসিম অবস্থা। বিশেষত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা এর সবচেয়ে করুণ ভুক্তভোগী।

বিদ্যমান বাস্তবতা বিবেচনায় দেশে সম্পদের অধিকতর দক্ষ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সেবাপ্রদান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে ক্রমান্বয়ে একটি অধিকতর অন্তর্ভুক্তিমূলক খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন যা সমাজের দরিদ্র ও সর্বাধিক বিপদাপন্ন সদস্যদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে জীবনচক্রের বিভিন্ন ঝুঁকিসমূহ কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে। এক্ষেত্রে যথাযথভাবে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সীমাবদ্ধতা উত্তরণে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, কার্যকরী বাস্তবায়ন কৌশল এবং শাসন কাঠামোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্কওয়েভ ফাউন্ডেশন এর নিউট্রিশন স্মার্ট কমিউনিটি (ওয়েলটহাঙ্গারহিলফের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন) প্রকল্পের সাথে অংশীদারিত্বে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘খাদ্য নিরাপত্তার সতর্কবার্তা, পুষ্টি ও দারিদ্রাবস্থা এবং খাদ্যব্যবস্থার উন্নয়ন’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব বলেন।

খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এর সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশন এর নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এর মহাপরিচালক ড. এ. কে. এনামুল হক।

এছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন, খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এর সমন্বয়কারী ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক কানিজ ফাতেমার সঞ্চালনায় আলোচনা সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, ওয়েলটহাঙ্গারহিলফ- বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রামস মলটে শুমেলফেডার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, সেভ দ্যা চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ এর ইয়ুথ, চাইল্ড পোভারটি অ্যান্ড ইকোনমিক রেজিলিয়েন্স বিষয়ক সিনিয়র অ্যাডভাইজার তানিয়া শারমিন।

বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ এম. শাহান। আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্কের নাগরিক সংস্থার সদস্যবৃন্দ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা।

সভাপতির বক্তব্যে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এর সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশন এর নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী বলেন, যেহেতু খাদ্য নিয়ে আলোচনা তাই গত দু’দিন সাতজন কৃষকের সাথে কথা বলেছি। এদের একজনও ভালোভাবে খেতে পারে না।

তারা উৎপাদন করে, বিক্রি করে। বর্গা যে দেয় সেই কৃষক ভালো থাকে কিন্তুবর্গাচাষি ভালো থাকে না। আমাদের খাদ্যের কথা বললেই শহরসহ গ্রামে সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলি, কৃষির কথা আসে। মানুষের চলার পথে এখন তেল, গ্যাস অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৫-২০২০ সাল পর্যন্ত আমরা বলেছি - খাদ্য অধিকার আইন করে গরীব মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের ন্যুনতম খাদ্য অধিকার না থাকলে মানুষ কী করবে? বাংলাদেশের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে খাদ্য অধিকার আইন করতে হবে। ‘খাদ্য অধিকার’ একটি মানবাধিকার যা খাদ্য আইনে আছে তাহলে সরকারের উচিত মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করা। ‘আমাদের’ সংখ্যাটা বাড়াতে হবে চাপ প্রয়োগ করার জন্য।

কিছু করতে হলে নাগরিক হিসেবে রাজনীতিতে হাত দিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে সচেতনতা হয়ে যেভাবে কাজ করলে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করা যায় পরিবর্তনের জন্য সেভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এর মহাপরিচালক ড. এ. কে. এনামুল হক বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে খাদ্যে প্রবেশাধিকার, সহজলভ্যতার বিষয় আসে। জনগণ চাপ প্রয়োগ করলে তা যেন তার প্রতিনিধির কাছে পৌঁছায় সেটা দেখতে হবে।

চাপ কমানেরা জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশে গণতন্ত্রকে কাজের ক্ষেত্রে আরও নিচের স্তরে নামিয়ে আনতে হবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আগামী শীত থেকে মূদ্রাস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে। ব্যাপারটা আমরা সরকারকে নানাভাবে বলার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, শুধু সরকার সব করতে পারবে না। খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনতে হবে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে । বাংলাদেশের ৪৫% লোক ঋণগ্রস্ত। শহরাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের আয় স্থিতিশীল, কিন্তুগ্রামে তা নয়। প্রতিটা জায়গায় বাজার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

খাদ্যের সাথে জ্বালানীর একটা সম্পর্ক আছে। জ্বালানীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুব কঠিন। জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ফুড চেইন ঠিক করতে হবে; খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ উদ্যোগ উন্নত করতে হবে; এ কাজে যারা আছে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; কৃষি উৎপাদনে খরচ কীভাবে কমানো যায় তার উপায় বের করতে হবে; মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান হচ্ছে কী না তা দেখতে হবে; নতুন টেকনোলজি কীভাবে কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলছে তা বিবেচনা করতে হবে। সর্বোপরি, সমাধানভিত্তিক গবেষণা করতে হবে।

অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, সামনে আমরা একটা ভয়াবহ সংকটের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি - মন্দা পরিস্থিতি এবং মুদ্রাস্ফীতি। মানুষের আয় থাকবে না কিংবা যা তার ন্যূনতম প্রয়োজন তার দাম বাড়বে। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লে তারা তো বেঁচে যাবে। সকলের জন্য সুষম খাদ্যের সংস্থান দরকার। এই ভয়াবহ অবস্থার সাথে চুরি, লুটপাট যুক্ত হয়েছে। জুলাই অভুত্থান আমাদের চাওয়াকে আকাশচুম্বি করেছে। যারা ছিঁটকে পড়বে তাদের বাঁচাতে ’৭৪ এর দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা যেন তৈরি না হয় সেই চ্ষ্টো করা জরুরি।

আমাদের সৌভাগ্য আমাদের কৃষকরা আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে-অন্ন দিচ্ছে। যদিও তাদের জমি আমরা কেড়ে নিচ্ছি। আমরা যদি সংকটে পড়ি তাহলে খাদ্য আমরা আমদানী করতে পারবো কী না তা ভেবে দেখতে হবে। আবার যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন অর্থনীতির ওপর আরেকটা চাপ তৈরি হবে। খাদ্য অধিকারের সমাধানের জন্য ভূমি সংস্কার করতে হবে। এ সমস্যাগুলো নিয়ে সরকারের কাছ থেকে খোলাখুলি আলোচনা ও উদ্যোগ দেখতে চাই।

ওয়েলটহাঙ্গারহিলফ - বাংলাদেশ এর হেড অব প্রোগ্রামস মলটে শুমেলফেডার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর বেশি পড়ে। এই অভিঘাত সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। তাই তাদেও দিকে বেশি নজর দিতে হবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো যেভাবে কাজ করে, সরকার সেটার অনুসরণে আরো বড় পরিসরে কাজ করতে পারে।

অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার সাথে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা জড়িত। এটার সাথে খাদ্য সরবরাহজড়িত, যা নিয়ন্ত্রিত না হলে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিবে। খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা বললে সেখানে রাজস্ব আয়ের ঘাটতির ইতিবাচক চিত্র আমরা পাচ্ছি না। প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার। প্রবৃদ্ধি ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য, গুণগতমান দেখতে হবে।

খাদ্য নিরাপত্তার সাথে খাদ্য পুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। শিশুদের জন্য এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ হয়তো মূল্যস্ফীতির জন্য সম্পদ বিক্রি করে দেয়। এক্ষেত্রে দেখা যায় ঋণ নেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আছে। মানুষ এখন নতুন করে দরিদ্র হচ্ছে। বিশেষ করে, যে পরিবারে বৃদ্ধ ও শিশু আছে এবং দিনমজুর পরিবার এই ঝুঁকিতে বেশি আছে। তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার দরকার।

টিসিবির বরাদ্দ বাড়াতে হবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা এবং এখানে স্বচ্ছতা আনা দরকার। বিশেষ করে, শহরাঞ্চলের দরিদ্রদের জন্য দরকার। এদের জন্য মিনিমাম ওয়েজ নির্ধারণ করার এবং এর আওতায় নিয়ে আসা দরকার। তাদেরকে স্বস্তির মধ্যে নিয়ে আসা দরকার।

সেভ দ্যা চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ এর ইয়ুথ, চাইল্ড পোভারটি অ্যান্ড ইকোনমিক রেজিলিয়েন্স বিষয়ক সিনিয়র অ্যাডভাইজার তানিয়া শারমিন বলেন, শিশুর কথা আসলেই তাদের পুষ্টির বিষয় জোরালোভাবে আসে। শেষ দুই দশকে এক্ষেত্রে উন্নত হয়েছে। কিন্তু শেষ এক দশকে সেটা কি খুব স্থিতিশীলভাবে উন্নত হয়েছে কিনা, সেটা কেন হয়নি বা টেকসই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো কিনা— সে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা বলে, চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন না হলে দরিদ্র, অতি দরিদ্র বা শহরের দরিদ্র পর্যন্ত আমরা আমাদের টার্গেট জনগোষ্ঠীতে পৌঁছাতে পারবো না। আমাদের ইকুইটির ভিত্তিতে উন্নয়নে যেতে হবে। ঘাটতি অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে হবে।

শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের পুষ্টির ঘাটতি তো এক নয়, উদ্যোগ যথেষ্ট বা যথাযথ নয়। চাহিদা অনুযায়ী আমরা শুধুমাত্র একটা সোশাল সেফটি নেট কার্ড দিয়ে তা সমাধান করতে পারি। পুষ্টিও অনেকটা খাদ্য নিরাপত্তার মতো হয়ে গেছে। খাদ্য সহজলভ্যতায় আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। কিন্ত প্রবেশাধিকারে সেভাবে এগোয়নি। স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বলা যায়- জলবায়ু সহনশীল খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। -- বিজ্ঞপ্তি