স্বাধীনতার ৫০ বছরেও অরক্ষিত ঐতিহাসিক মুজিবনগর তথা মেহেরপুর জেলার ১০ বধ্যভূমি। বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে হাতেগোনা কয়েকটি বধ্যভূমিতে পরিচর্যা করা হলেও অধিকাংশই চেনারও উপায় নেই। এতে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা ও হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের টর্চার সেলগুলো সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে পারছে না। এগুলো সংরক্ষণ করে নামফলকের মাধ্যমে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে জানানোর সুযোগ করে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন জেলার মুক্তিযোদ্ধারা।
জানা গেছে, মেহেরপুর জেলায় স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বধ্যভূমিগুলোর সংরক্ষণ না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ বধ্যভূমি বেদখল হয়েছে। হারাতে বসেছে বধ্যভূমি ও হানাদার বাহিনীর টর্চারসেলের স্মৃতিচিহ্নগুলো। বধ্যভূমিগুলোর কোনো কোনোটিতে ইটের পর ইট গেঁথে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, কোনোটি আবার সরকারি অফিস, কোনোটি খনন করে তৈরি করা হয়েছে পুকুর। সরকারিভাবে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ছয়টি বধ্যভূমি স্বাধীনতার পর চিহ্নিত করা হয় কিন্তু দু-একটি বাদে সেগুলোও এখন হারানোর পথে।
সরেজমিন এসব বধ্যভূমি ঘুরে দেখা গেছে, মেহেরপুর কলেজ মোড়, জেলা প্রশাসনের কার্যালয় চত্বর, কাজিপুর আটকবর ও সাহারবাটির টেপুখালীর বধ্যভূমিগুলো সংস্কার করা হলেও বাকি ১০টি রয়েছে অরক্ষিত। তার মধ্যে মেহেরপুর সরকারি কলেজে পাশের আমের বাগান নিশ্চিহ্ন করে আশপাশে বাড়ি ও পুকুর তৈরি করা হয়েছে। ৬ ডিসেম্বর মেহেরপুর মুক্ত দিবসে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম যান সেই বধ্যভূমির খোঁজে। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজির পরও মেলাতে পারেননি বধ্যভূমির স্থানটি। ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান বাড়িতে।
গাংনী উপজেলার বামন্দী পশুহাটের পাশের বধ্যভূমিটিও এখন হাট মালিকদের দখলে চলে গেছে। এছাড়া সদর কালাচাঁদপুর মাঠ, মুজিবনগর উপজেলার সোনাপুর গ্রাম, গাংনী উপজেলার ভাটপাড়া কাজলা নদীর তীর, জোড়পুকুর ও মত্তরাপুর গ্রামের বধ্যভূমিগুলোকে নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে। হাতেগোনা কয়েকটি বধ্যভূমি ছাড়া স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময়ে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা বধ্যভূমিগুলোকে কোনো সরকার কিংবা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কেউই ‘বধ্যভূমি’ হিসেবে নামফলকও টানাতে পারেনি।
মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম বলেন, মেহেরপুর সরকারি কলেজের পেছনে বাগানের কোনো এক জায়গায় পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধকালীন বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারী-পুরুষকে ধরে এনে নির্যাতন শেষে হত্যা করে পাশেই লাশ পুঁতে রাখত। অনেক মানুষের হাত-পা ভেঙে অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো এখানে। কিন্তু জায়গায়টি সংরক্ষণ করা হয়নি। দীর্ঘদিন পর আমি এ কলেজ ক্যাম্পাসে এসে সেই নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্ন বা বধ্যভূমি কোনোটিই খুঁজে পাচ্ছি না। আমাদের দাবি, এ বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হোক, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারে।
মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল
মালেক বলেন, স্বাধীনতার সূতিকাগার মেহেরপুর জেলায় সব মিলিয়ে ১৫টির মতো বধ্যভূমি রয়েছে। যার হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকি সবই অরক্ষিত। বধ্যভূমি ও হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের স্থানগুলোকে সংরক্ষণ করে যেন ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানার সুযোগ করে দেয়া হয়। শহীদদের যেন মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে পারে এবং এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত হবে।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ মুনছুর আলম খান বলেন, মেহেরপুরে অনেকগুলো বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাকিগুলোও সংরক্ষণ করা হবে। শহীদদের শ্রদ্ধা করতে অবশ্যই আমরা এগুলো সংরক্ষণ করব। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব আমরা বাকিগুলোকে সংস্কারের আওয়তায় এনে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাব।










