পরিচর্যার অভাবে মরে যাচ্ছে দেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের স্থান ঐতিহাসিক মুজিবনগর আম্রকাননের গাছ। শিগগিরই গাছগুলো বাঁচানোর উদ্যোগ না নেয়া হলে ইতিহাসের সাক্ষী আম্রকানন অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। ইতিহাসের পাতায় মেহেরপুরের মুজিবনগর বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরের আম্রকাননে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা শপথ নেন।

এদিকে দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকা বাগান ও গাছের পরিচর্যা না হওয়ায় স্থানীয় এবং দর্শনার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চাপা ক্ষোভ। এমনকি বাগান টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে প্রথম সরকারকে গার্ড অব অনার প্রদানকারী ১২ আনসারের জীবিত তিন সদস্য।

তবে আশার বাণী শুনিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ও মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেছেন, এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের একটি টিম এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নিয়ে গাছের নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। অল্প সময়ে গাছগুলো বাঁচানোর নানা উদ্যোগ নেয়া হবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের স্থান ঐতিহাসিক বাগানের আমগাছগুলো কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাগানটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে কয়েক প্রজাতির ছোট-বড় এক হাজার ১০৭টি আমগাছ রয়েছে। মারা গেছে অসংখ্য গাছ। জীবিত গাছগুলোর বেশির ভাগই রোগাক্রান্ত। গাছের বিভিন্ন স্থান দখল করেছে আগাছা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করলেও গাছের পরিচর্যা করে না। প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে বাগান ঝাড়ু দেয়া আর গাছের গোড়া রং করা ছাড়া আর কোনো কাজ করে না প্রশাসন। এ পর্যন্ত অনেক গাছ মারা গেছে। অনেক গাছের কাণ্ড শুকিয়ে গেছে। শতবর্ষী গাছগুলো ছায়া ও ফলদানের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তাই যথাযথ পরিচর্যায় বাগানের প্রাণ ফিরিয়ে আনার দাবি সবার।

দর্শনার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনাকারী সুভাষ মল্লিক জানান, শপথ গ্রহণের সময়ে এ বাগানের পরিস্থিতি ছিল আলাদা। বাগানে ২ হাজার ২৫০টি গাছ ছিল। তখন অনেক আম ধরতো।  দিন দিন এ গাছগুলো ফুরিয়ে যাচ্ছে। শুধু যত্নের অভাবে এ গাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এখানে গাছ অনুযায়ী পানি, সার, কীটনাশক প্রয়োগ করার দরকার। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না।

শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা দাউদ শেখের ছেলে জহির উদ্দীন জানান, আমি ২০০১ সাল থেকে মুজিবনগর আম্রকাননের পরিচর্যা করে আসছি। যদি কোনো গাছ মারা যায় তাহলে সেখানে আরেকটি গাছ লাগিয়ে দেয়া আমার কাজ। এ পর্যন্ত আমি ২৫০টি গাছ রোপণ করেছি।

প্রথম সরকারের গার্ড অব অনার প্রদানকারী জীবিত তিন আনসার সদস্যের মধ্যে দুজন আজিমউদ্দীন শেখ ও সিরাজ উদ্দীন জানান, আমরা ১৯৭১ সালে দেশের প্রথম সরকারকে গাড অব অনার প্রদান করি মুজিবনগর আম্রকাননে। তখন এ বাগানের সৌন্দর্য ছিল অনেক বেশি। আর এখন এ বাগানের অনেক গাছ মরে গেছে। কিন্তু এর আদি নাম ছিল ঘের বাগান, যেদিকে তাকাব সেদিকে লাইন। গাছ মরে যাওয়ার জন্য লাইনও হারিয়ে যাচ্ছে। এ গাছের ভালোভাবে পরিচর্যা করার জন্য কয়েকজন লোক রাখার দরকার। শুধু ১৭ এপ্রিল এলে গাছের গোড়ায় রং দেয়া হয়। আর ১৭ এপ্রিল চলে গেলে সব ভুলে গেলাম— এমন হলে চলবে না।

গাংনী সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক (উদ্ভিদবিদ্যা) ইসরাত জাহান জানান, গাছগুলোর অনেক বয়স, তাই নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের যেমন ভিটামিন প্রয়োজন, ঠিক তেমনই গাছেরও ভিটামিন দরকার হয়।

মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন কুমার জানিয়েছেন, কৃষি বিভাগ ও বনবিভাগের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। বর্তমানে গাছগুলোর জন্য তারা যৌথভাবে কাজ শুরু  করেছেন। পাশাপাশি এখন থেকে পরিচর্যার জন্য লোক থাকবে যাতে করে আর কোনো গাছ না মারা যায়।