খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) লক্ষ্য আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী গড়ে তোলা। কিন্তু ৫৬ শতাংশ পদে জনবল সংকটে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। কর্মকর্তাসহ ১৭ পদ চলছে চলতি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে। আবার পদোন্নতি না পেয়ে হতাশায় কাজে অনীহা প্রকাশ করছেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এতে যেমন ভোগান্তিতে পড়ছে সেবাপ্রত্যাশীরা, তেমনি ঝিমিয়ে পড়েছে সংস্থাটির সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম।

সেবাপ্রত্যাশীরা জানান, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে নগরবাসীর প্রত্যাশাও বেড়েছে। নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন বাড়ির নকশা অনুমোদন বিষয়ে কেডিএতে এসে কথা বলছেন। তবে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থাটিতে আগতরা জানান, কেডিএর অধিক্ষেত্র অনেক বড়। কিন্তু জনবল অনেক কম। পরিকল্পনাবিদও মাত্র হাতেগোনা তিন থেকে চারজন। সে কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাছাড়া ভূমি ছাড়পত্র অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা সেটিও তদারকির কাজ ঠিকঠাক মতো হয় না। সবকিছু চলছে বিশৃঙ্খলভাবে। কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ফাঁদে পড়ে হয়রানির শিকার হন সেবাপ্রত্যাশীরা। অনেক কর্মকর্তা খুলেছেন চাকরিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তেও এর সত্যতা মিলেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ১৯৬১ সালের ২১ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে সংস্থাটি। তখন থেকে কেডিএ অর্ডন্যান্স ১৯৬১-এর ক্ষমতাবলে প্রতিষ্ঠানটি নগর পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

সংস্থাটির অধিক্ষেত্র এখন ৮২৪ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তর সীমানার মধ্যে রয়েছে নওয়াপাড়া পৌরসভা, পূর্বে অভয়নগর, দীঘলিয়া ও রূপসা উপজেলা, দক্ষিণে মোংলা পোর্ট পৌরসভা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে বটিয়াঘাটা উপজেলা ও পশ্চিমে ডুমুরিয়া উপজেলার কৈয়াবাজার। পরিকল্পনা, অথরাইজড, বৈষয়িক ও প্রকৌশল—এই চারটি শাখার মাধ্যমে সরাসরি জনসাধারণকে সেবা প্রদান করে থাকে সংস্থাটি। 

কেডিএ জানায়, ২০২১ সালের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী কেডিএতে অনুমোদিত জনবল ৪৪৬ জন। এসব পদের বিপরীতে বর্তমানে শূন্য রয়েছে ২৫২টি পদ। ২০০৩ সালের নিয়োগবিধি অনুযায়ী সংস্থার চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্যরা ১৯৪ জনবল নিয়ে কাজ করছেন। এর মধ্যে চলতি দায়িত্বে ১৫ ও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন দুজন। এছাড়া কেডিএতে সবশেষ ২০১২ সালে পদোন্নতি হয়েছিল। এরপর ১২ বছর পদোন্নতি পায়নি কেউ। এতে প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, জ্যেষ্ঠ বৈষয়িক কর্মকর্তা, উপপরিচালক, অর্থ ও হিসাবরক্ষণ, পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ ১৭ পদে চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চলছে কাজ।

পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-১ শাখা প্রজ্ঞাপনের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অনুচ্ছেদ ৩-এর বিধানসাপেক্ষে সাময়িক ছয় মাসের জন্য চলতি দায়িত্ব দিতে পারবে। ছয় মাসের অধিক চলতি দায়িত্ব দেয়ার প্রয়োজন হলে ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে আবশ্যিকভাবে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি কমিটি বা বোর্ডের অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু সংস্থাটিতে এই আইনের ব্যত্যয় ঘটছে। চার-পাঁচ বছরের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অবসরে যাবেন। পদোন্নতি না হলে এসব পদে প্রেষণে জনবল আনা প্রয়োজন হবে। তাছাড়া কর্মকর্তারা অনেকে হতাশ হয়ে কাজে মনোনিবেশ না করে অনীহাও প্রকাশ করছেন। এতে সংস্থাটির উন্নয়নকাজ ঝিমিয়ে পড়ছে। 

সংস্থার সহকারী প্রকৌশলী মো. ছানাউল্লাহ বলেন, ‘‌তিন-চার বছরের মধ্যে অবসরে যেতে হবে। কিন্তু চাকরি জীবনে পদোন্নতি জোটেনি। এখনো চলতি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। পদোন্নতি পেলে অন্তত পক্ষে মর্যাদা বৃদ্ধি পেত।’

কেডিএর সচিব মো. বদিউজ্জামান বলেন, ‘‌নিয়োগ ও পদোন্নতির কার্যক্রম চলমান। পর্যায়ক্রমে সবই হয়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’ 

অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, নানা অনিয়মে জড়িয়ে পরিকল্পিত নগরী গড়তে ব্যর্থতার পাশাপাশি দিনে দিনে একটি বাণিজ্যিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থায় রূপ নিচ্ছে কেডিএ। বেশির ভাগ প্রকল্পই তারা শেষ করতে পারছেন না। আবার শেষ করা প্রকল্প থেকেও দীর্ঘস্থায়ী সুফল পায় না নগরবাসী।

তাছাড়া নগরীতে নকশা ছাড়া অবৈধভাবে নির্মিত ভবন উচ্ছেদে ব্যর্থতা, আবাসিক এলাকায় অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশের জন্য পর্যাপ্ত রাস্তা না থাকা, ময়লা অপসারণের সুব্যবস্থার অভাব, খাল খনন করে প্লটবাণিজ্য, মার্কেট নির্মাণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর না করাসহ বহুবিধ অভিযোগ রয়েছে কেডিএর বিরুদ্ধে। 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কেডিএর চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম মিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘খুলনাকে সুশৃঙ্খল, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়তে বিল্ডিং কোড ও আইন মেনে ঘরবাড়ি নির্মাণে সচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করেছে কেডিএ।’ সংস্থার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি কেন হচ্ছে না—এ বিষয় কেডিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘সেই বিষয় সংস্থার কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। আর জনবল নিয়োগও প্রক্রিয়াধীন।’