মেহেরপুর জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চাষ হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার তেলজাতীয় ফসল সাউ পেরিলা। যদিও এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলায় সাউ পেরিলা পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা মিলেছে। উচ্চ পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এ ফসল শুধু পারিবারিক ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে নয়, স্থানীয়ভাবে তেল ও বীজ উৎপাদন করে তা বিক্রির প্রস্তুতি নিয়েছেন জেলার কৃষকরা। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসের ও মেহেরপুরের আমঝুপি তৈলবীজ খামারের প্রযুক্তিগত সহায়তায় সাউ পেরিলার বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।

কৃষি তথ্য সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, আমাদের দেশে তেল ফসলের মধ্যে সরিষা, চীনাবাদাম, তিল, তিসি, সয়াবিন ও সূর্যমুখী প্রভৃতি চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে সরিষা, তিল এবং সূর্যমুখী থেকেই সাধারণত তেল বানানো হয়। বর্তমানে দেশে আবাদি জমির মাত্র ৪ ভাগ তেল ফসলের আবাদ হয়। দেশে মোট ৪ দশমিক ৪৪ লাখ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়, যা থেকে ৬ দশমিক ৫ লাখ টন সরিষা উৎপাদন হয়। এ সরিষা থেকে ২ দশমিক ৫০ লাখ টন তেল উত্পন্ন হয়।

ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো ও অতি উত্তম তেল খাওয়ার জন্য এবার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ ফসল আবাদের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে।

মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্র জানিয়েছে, মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি তৈলবীজ খামারের পাশাপাশি তাদের উদ্যোগে পাঁচজন চুক্তিভিত্তিক কৃষকের মাধ্যমে ৬ বিঘা জমিতে ও গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় তেরাইল গ্রামের কৃষক বাদল হোসেন এবং নজরুল ইসলাম কৃষি কর্মকর্তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০ শতক জমিতে সাউ পেরিলা আবাদ করেন। গাংনী উপজেলার ২০ শতক জমিতে আবাদ করা এ ফসলে এখন কৃষকরা স্বপ্ন দেখছেন। এ জমি থেকে ২ মণ ১০ কেজি ফলনও হয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে তৈল হিসেবে এবং বীজ হিসেবে ভালো চাহিদা রয়েছে।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, স্থানীয় একটি সরিষা তেল মাড়াই মিলে গিয়ে ১০ কেজি সাউ পেরিলা ভাঙিয়ে প্রায় তিন কেজি তেল হয়েছে ওই কৃষকের। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬ হাজার টাকা। তাছাড়া বীজেরও ভালো চাহিদা রয়েছে। ৩০০-৫০০ টাকা কেজি দরে স্থানীয় কৃষকরা নিতে চাচ্ছেন দক্ষিণ কোরিয়ার এ পেরিলার বীজ। আর এক বিঘা জমিতে সাউ পেরিলা আবাদে খরচ হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বকুল হোসেন জানান, গাংনী উপজেলার তেরাইল গ্রামের বকুল হোসেন ও নজরুল ইসলাম দক্ষিণ কোরিয়ান সাউ পেরিলা চাষ সম্পর্কে আগ্রহী হলে বীজ সংগ্রহ করে তাদের দেয়া হয়। পরে ২০ শতক জমিতে এ চাষ শুরু হলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমি দুইদিন পরপর ওই ক্ষেতে যেতাম। সার, কীটনাশক থেকে শুরু করে সব ধরনের কারিগরি সহায়তা আমরা দিতাম। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার চাষীরা সাউ পেরিলা চাষের জন্য বীজ ক্রয়ের জন্য আমাদের অনুরোধ করছেন।

কৃষক বাদল হোসেন ও নজরুল ইসলাম বলেন, সরিষা ও অন্যান্য তেল জাতীয় ফসল আবাদের মতোই সহজ উপায় অবলম্বন করা হয়েছে সাউ পেরিলা চাষে। রোগবালাই তেমন নেই। আবাদের খরচও সরিষা আবাদের মতোই। সাউ পেরিলা আবাদ অন্যান্য তেল জাতীয় ফসল আবাদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি লাভ হবে।

পেরিলা ভোজ্যতেলের দাম সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন সুপারশপে আমদানীকৃত এ তেল প্রতি লিটার ১৮০০-২২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। স্থানীয় পর্যায়ে এত দাম পাওয়া যাবে না। তবে যে দাম পাওয়া যাবে তা অন্যান্য ফসলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কৃষক বাদল হোসেন ও নজরুল ইসলামের কাছে অনেকে তেল ক্রয়ের জন্য আগাম বুকিং দিয়েছেন। সাউ পেরিলা মাড়াই করে স্থানীয়ভাবেই তেল তৈরি ও বীজ বিক্রি করা হবে বলে জানান তারা।

গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসার লাভলী খাতুন বলেন, ভোজ্যতেল হিসেবে সাউ পেরিলা মানবদেহের জন্য উত্তম। যেহেতু লাভজনক তাই আগামী মৌসুমে এ উপজেলায় ব্যাপকভাবে চাষের আশা করা হচ্ছে। শতাধিক কৃষক পেরিলা আবাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

সাউ পেরিলা সম্পর্কে তিনি বলেন, শুধু ভোজ্য তেল হিসেবেই নয়, আরো অনেক উপায়ে এটি খাওয়া যায়। বিশেষ করে এর পাতা সবজি হিসেবে এবং আচার, চাটনিতে তেল ব্যবহার করা যায়।

কৃষি তথ্য সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, পানি জমে না এমন প্রায় সব ধরনের মাটি এ ফসল চাষের জন্য উপযোগী। তবে বেলে দো-আঁশ ও দো-আঁশ মাটি পেরিলা চাষের জন্য বেশি উপযোগী। খরিফ-২ মৌসুমে চাষ করা হয়। প্রতি হেক্টরে ১ দশমিক শূন্য থেকে ১ দশমিক ৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। বীজ বপনের উপযুক্ত সময় ১৫ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই। মোট উৎপাদনকাল ১০০-১০৫ দিন (বীজতলায় ৩০ দিন এবং রোপণ-পরবর্তী ৭০-৭৫ দিন)।

মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক স্বপন কুমার খাঁ জানান, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে পেরিলা চাষ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। তাছাড়া পেরিলা তেল দেশের বাইরে রফতানি করতে পারলে লাভের পরিমাণ আরো বাড়বে। রফতানির পাশাপাশি পেরিলা চাষকে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।