গত পাঁচ দশক অর্থাৎ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একদম তলানিতে, ঠিক এমনই সময়ে ১৯৭৩ সালের প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি ঘোষণা করা ছিল দেশের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে একটি মাইলফলক। পরে ১৯৭৪ সালের কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টেও প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করাসহ সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছিল। এ শিক্ষা কমিশনের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে যেসব সুপারিশ প্রদান করা হয়েছিল তার মধ্যে কিছু পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং কিছু সুপারিশ আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
পাঁচ দশকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার পরিমাণগত অগ্রগতি যথেষ্ট সাধিত হয়েছে। যেমন স্বাক্ষরতার হার অনেক বেড়েছে, বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ১০০ ভাগের কাছাকাছি চলে এসেছে, ছেলে শিশুদের তুলনায় অগ্রগতির সব সূচকেই মেয়ে শিশুরা বর্তমানে এগিয়ে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত অনেকটাই কমে এসেছে, বিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেক হয়েছে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিংসহ অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এতকিছুর পরও ঝরে পড়ার হার এখনো যথেষ্ট। এর বাইরেও বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় গুণগত প্রাথমিক শিক্ষার দিক দিয়ে আমরা এখনো পিছিয়ে। পঞ্চম শ্রেণী সমাপ্ত করার পরও একটা তাৎপর্যপূর্ণ সংখ্যক শিক্ষার্থী মাতৃভাষায় সাবলীলভাবে পড়তে এবং পড়ে মানে বুঝতে পারছে না। যদিও গুণগত শিক্ষা প্রসারের জন্য চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি নামক অনেক বড় বাজেটের প্রজেক্ট চলমান। তাদের উদ্যোগে অনেক শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে ও বিদ্যালয়কেন্দ্রিক উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রয়েছে। নতুন করে ১২টিসহ মোট ৬৭টি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। উপজেলা রিসোর্সের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এতকিছু উদ্যোগের পরও গুণগত প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে। পাঁচ দশকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যারা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নির্ধারণসহ সার্বিক অগ্রগতির জন্য ২০০৩ সালে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নামে একটি আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা শিক্ষার অগ্রগতির জন্য আরেকটি মাইলফলক।
পরিশেষে বলা যেতে পারে গত পাঁচ দশকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতির জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা এগিয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে। তবে আশার কথা হচ্ছে দেশের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষাও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।









