এক বছরেরও অধিক সময় ধরে দেশে রাজনৈতিক বিরোধ যতটা না উত্তাপ ছড়িয়েছে তার চেয়ে বেশি ছড়িয়েছে শিক্ষায় পরিবর্তন নিয়ে বিরোধ। রাজনৈতিক বিরোধ আপাত একটি পরিণতি পেলেও শিক্ষার বিতর্কটি এখন অবধি থামেনি। একটা যুক্তিসংগত অবস্থায় আসার আগ অবধি এটা থেমে যাবে বলে মনে হয় না।
অনেকে মজা করে বলেন, শ্রীলংকার সঙ্গে আমাদের অনেক মিল। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে আমরা শ্রীলংকার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে আছি। তাহলো শিক্ষা। শ্রীলংকায় শত শতাংশ মানুষ শিক্ষিত। আর আমাদের শত শতাংশ মানুষই শিক্ষাবিদ! মজা করে বলা হলেও কথাটার মধ্যে অতিরঞ্জন ও সাধারণ মানুষের মতামতের প্রতি অবজ্ঞা লুকানো রয়েছে নিঃসন্দেহে। শিক্ষা এমন একটি বিষয় যার সঙ্গে দেশের প্রতিটি মানুষের ভাগ্য সরাসরি জড়িত। বিশেষত তাদের প্রত্যেকের সন্তানের। সুতরাং এ ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে প্রত্যেক মানুষের যোগাযোগ। ফলে বিষয়টি নিয়ে যে যার বুঝমতো কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক, বলছেনও।
কিন্তু এ মতামতগুলো একটি ঐক্যমত সৃষ্টি না করে প্রবল মতানৈক্যের সৃষ্টি করেছে। বলা যায় দুটি প্রবল প্রতিপক্ষ তৈরি হয়ে গেছে। একপক্ষের মত, সরকার পরিকল্পিতভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিচ্ছে। আর সরকার পক্ষের লোকজনের দাবি শিক্ষার পরিবর্তনের সমালোচনা মূলত সরকারের সমালোচনা। তাদের দিক থেকে এক ধরনের জিদের অবস্থান লক্ষ করা গেছে। এ দুটো অবস্থানই বিপজ্জনক। আশার কথা নতুন শিক্ষামন্ত্রী প্রয়োজনীয় পরিমার্জনের আশ্বাস দিয়েছেন। তাকে ধন্যবাদ জানাই। কেননা শিক্ষা একটি সর্বজনীন বিষয়। এর সঙ্গে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ভবিষ্যৎ সরাসরি জড়িত। সুতরাং এ বিষয়ে ন্যূনতম একটি যুক্তিসংগত অবস্থায় পৌঁছনো প্রয়োজন।
শিক্ষা নিয়ে অতীতেও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ঘটেছে। বিশেষত পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে। কিন্তু এবারের পরিবর্তনটি আমূল। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রমের পরিকল্পনায় শুধু পরীক্ষা পদ্ধতি নয়, শিক্ষার বিষয়, শিখন শেখানো ও মূল্যায়ন সবকিছুতেই আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। গত বছর যখন এ পরিবর্তন প্রথমে প্রথম শ্রেণীতে এবং পরে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণীতে প্রয়োগ করা হয়, তখন তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক স্তর নিয়ে এটা ঘটেনি, ঘটে মাধ্যমিক পর্যায় নিয়ে। সে আরেক প্রসঙ্গ। সে প্রসঙ্গে না গিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া মাধ্যমিক পর্যায় নিয়েই কথা বলা যাক।
প্রথম বিতর্ক তৈরি হয় বিষয় নিয়ে। পাঠ্যপুস্তকে ডারউইনের তত্ত্ব ও প্রজনন স্বাস্থ্য যুক্ত করা নিয়ে প্রথমত রক্ষণশীল অভিভাবকরা আপত্তি তোলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পাঠ্যপুস্তকে গুগল থেকে সরাসরি অনুবাদ করে যুক্ত করা পাঠ নিয়ে বিতর্ক। পাঠগুলো সংশোধন ও প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে এ বিতর্ক খানিকটা স্তিমিত হলেও বাড়তে থাকে পাঠদান ও পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক। এর সঙ্গে আছে বিভাগ তুলে দেয়াসহ সমন্বিত বিষয়গুলোর মান নিয়ে বিতর্ক।
আমাদের আগের শিক্ষাক্রম ছিল যোগ্যতাভিত্তিক। প্রতিটি পর্যায় শেষে শিক্ষার্থী কী কী যোগ্যতা অর্জন করবে তার একটি তালিকা ছিল। সে যোগ্যতাগুলো অর্জনের জন্য বাকি সব বিষয় পরিকল্পনা করা ছিল। আর বর্তমান শিক্ষাক্রম অভিজ্ঞতাভিত্তিক। এ শিক্ষাক্রমের ধারণাও বেশ পুরনো। জঁ পিঁয়াজে, জন ডিউইসহ অনেক শিক্ষাবিদের তত্ত্বেই এ শিক্ষাক্রমের ধারণা ছিল। এ শিক্ষাক্রমের মডেল প্রথম প্রণয়ন করেন ডেভিড এ ক্লুব। তাও গত গতাব্দীর আশির দশকে, ১৯৮৪ সালে। এ মতের মূল কথাটি হচ্ছে শিশু সবকিছু শিখবে অভিজ্ঞতা লাভের ভেতর দিয়ে। আগের শিক্ষাক্রমের শেখার পদ্ধতি ছিল শিশুকে কোনো কিছু বিষয়ে প্রথমত ধারণা দেয়া হবে। তার পর শিশু সেটা অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে অনুশীলন করবে। তারপর এ শেখাকে নিজের যোগ্যতায় রূপান্তরিত করবে। কথাটি নতুন মনে হলেও আগের শিক্ষাক্রমেও এ ব্যবস্থা ছিল। ছিল অংশগ্রহণমূলক নানা পদ্ধতি। কিন্তু সে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিকে মূল গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিপত্তি ঘটেছে। অভিভাবকরা সে সক্রিয় অংশগ্রহণকেই মূলত বাস্তবে বেশি দেখতে পাচ্ছেন। এটাকেই একমাত্র মনে করছেন। নতুন পদ্ধতিতে যেহেতু সক্রিয় অংশগ্রহণকেই অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সে কারণে মূল্যায়নেও প্রাধান্য পেয়েছে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি। মানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বাস্তব অংশগ্রহণ দেখে তাকে মূল্যায়ন করবেন। ফলাফল সংরক্ষণ করবেন নতুন পদ্ধতিতে, যা আগের খাতা-কলম ও নম্বর গ্রেডিংয়ের চেয়ে একেবারেই পৃথক। ফলে অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হচ্ছেন এ ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে শিশু বিশ্ববিদ্যালয় বা চাকরি বাজারে প্রবেশ করতে পারবে কিনা। কেননা সেগুলো পরিচালিত হচ্ছে আগের মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে।
শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। প্রতি পাঁচ বছর পর পর তার পরিবর্তন সাধন করা হয়। এবারের পরিবর্তনটি করা হয়েছে প্রায় ১০ বছর ব্যবধানে। এ পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত ছিল। কিন্তু যে পরিমাণ পরিবর্তন হওয়ার কথা হয়েছে তা থেকে অনেক বেশি। একেবারে আমূল পরিবর্তন। জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষাক্রম নিয়ে এ মাত্রার পরিবর্তন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এটা নিয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার ছিল। দরকার ছিল ধাপে ধাপে পরিবর্তন করে ট্রাই আউট করা। একসঙ্গে করার ফলে এ পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য বিষয়ও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে শিক্ষক প্রশিক্ষণ। এ অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষককে নতুন শিক্ষাক্রমে প্রশিক্ষিত করা কঠিন। অধিক শিক্ষার্থীসংবলিত শ্রেণীকক্ষ, বিদ্যালয় অবকাঠামো, উপকরণের মূল্য, অভিভাবক সংযোগ ইত্যাদি প্রসঙ্গ নাইবা তুললাম।
তবে লক্ষ করার বিষয় একই শিক্ষাক্রমের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কোনো বিতর্ক তৈরি হয়নি। কেননা সেখানে পরিবর্তন করা হয়েছে শিক্ষাক্রমের নিয়ম অনুযায়ীই সীমিত আকারে।
এ অবস্থায় উচিত মাধ্যমিকের সঙ্গে প্রাথমিকের সংযোগ সাধন। মাধ্যমিকের শিক্ষাক্রমের পরিমার্জন। সমন্বয় সাধন। এটা যত দ্রুত করা হবে তত মঙ্গল। সবার জন্যই।
লেখক: কবি, শিক্ষাবিদ। অধ্যাপক, স্কুল অব এডুকেশন, বাউবি। সাবেক শিক্ষা পরামর্শক, ইউনিসেফ। soaibgibran@gmail.com









