বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ১৯৮১ সালে দেশের ইতিহাসে প্রথম ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগ চালু হয়। সে সময় পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম দিয়ে যাত্রা শুরু করা বিভাগটি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে পাঠদান শুরু করে ১৯৯৭ সালে। এ পথচলায় বিভাগটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অসংখ্য উদ্ভাবন উপহার দিয়েছে। এসবের ব্যবহার জীবনকে সহজতর করেছে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। সম্প্রতি উদ্ভাবিত তাদের তিনটি মৌলিক আবিষ্কারের কথা জানাচ্ছেন আনিসুর রহমান
স্মার্ট প্লান্ট কেয়ার
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও তীব্র তাপপ্রবাহের প্রভাবে বাসাবাড়িতে বারান্দায় কিংবা ছাদের টবে গাছ লাগানোর প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু শহর জীবনের নানাবিধ ব্যস্ততায় নিয়ম করে পানি দেয়া হয়ে ওঠে না। আবার টবে অতিরিক্ত পানি জমে ডেঙ্গু মশা জন্মানোর ঝুঁকি তো আছেই। এসব সমস্যা বিবেচনায় ইন্টেলিজেন্ট অটোমেটিক প্লান্ট ওয়াটারিং সিস্টেম উইথ এয়ার হিউমিডিফায়ার সংক্ষেপে স্মার্ট প্লান্ট কেয়ার নামক গাছে পানি দেয়ার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন আইপিই বিভাগের শিক্ষার্থীরা। ময়েশ্চার সেন্সর যুক্ত থাকায় টবের মাটির আর্দ্রতা নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নেমে গেলে যন্ত্রটি নির্দিষ্ট বিভব পার্থক্য তৈরির মাধ্যমে গাছের জন্য প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ কোডে ক্যালিব্রেট করবে। পরে তথ্যানুসারে আর্দ্রতা আদর্শ মাত্রায় না পৌঁছা পর্যন্ত একটি সাবমারসিবল পাম্প একই হারে পানি দিতে থাকবে। আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে এলে পাম্পটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেবে। ফলে অতিরিক্ত পানি জমার কোনো আশঙ্কা থাকবে না। এছাড়া মোটরের সাহায্যে বাতাসে পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা স্প্রে করার মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশের আর্দ্রতা বজায় থাকবে এবং ঘরের মাইক্রো দূষক কণা শোষণ করবে। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় ও ব্যাটারিচালিত হওয়ায় রিজার্ভারে একবার পানি দেয়ার পর দীর্ঘদিন আর পানি দিতে হবে না। বৃক্ষপ্রেমীদের জন্য যন্ত্রটি উদ্ভাবন করেছেন মিনহাজ আলম দ্বীপ, মোহাম্মদ রাফি, মাকসুদ বিন মালিক, উৎস রায় শুভ ও ইশমাম তাসনিম।
স্বয়ংক্রিয় নালা নিষ্কাশক
বিষাক্ত ও পচা আবর্জনাপূর্ণ নালা-নর্দমা পরিষ্কারের পদ্ধতি পুরনো, সেকেলে ও ঝুঁকিপূর্ণ; এমনকি ততটা কার্যকরও নয়। এ সমস্যা নিয়ে নিছক আড্ডার ফাঁকে স্বয়ংক্রিয় নালা নিষ্কাশক যন্ত্র ধারণা আসে বুয়েট আইপিই বিভাগের শিক্ষার্থীর। সেই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেন মো. ইব্রাহিম, শাশ্বত সেনগুপ্ত, দেবদ্যুতি মজুমদার, নাবিলা নজরুল পার্ল ও এ এম সালেম মাশরুর। উদ্ভাবন করেন অটোমেটিক ড্রেন ক্লিনার বা স্বয়ংক্রিয় নালা নিষ্কাশক, যা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে করবে কার্যকর, নিখুঁত। নিষ্কাশক যন্ত্রটি শহরের যেকোনো নালার চলমান স্রোতে বসিয়ে দিলে দুটি কনভেয়র বেল্টের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যেকোনো কঠিন বর্জ্য আলাদা করে ফেলবে। এতে থাকা বর্জ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি প্রতিদিন দুয়েকবার খুলে পরিষ্কার করাই যথেষ্ট। শুধু তাই নয়, পরিবর্তনশীল প্রস্থের ব্যবস্থা রাখায় এটি যেমন নানা প্রস্থের নালায় বসানো যাবে, তেমনি এটি বসানোর পদ্ধতিও খুবই সরল। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বর্জ্য জমে মেশিন বন্ধ হলে তা জানানোর জন্যেও রয়েছে সেন্সরের ব্যবস্থা।
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সেলাই মেশিন
দেশের গ্রামাঞ্চলে অপ্রতুল বিদ্যুৎ সরবরাহ জনজীবনের দুর্ভোগ অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়। সে কথা মাথায় রেখেই বুয়েটের আইপিই বিভাগের শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন আশ্চর্য এক সেলাই মেশিন। যার চাকা ঘুরলে তৈরি হবে বিদ্যুৎ, জ্বলবে ঘরের বাতি। এ সেলাই মেশিনের চাকার সঙ্গে যুক্ত লম্বা শ্যাফট জুড়ে দেয়া হয়েছে একটি জেনারেটর। ফলে চাকা ও শ্যাফট ঘুরলেই একদিকে জামা-কাপড় তৈরি হবে, অন্যদিকে মেকানিক্যাল এনার্জি ইলেকট্রিক এনার্জিতে রূপান্তরিত ও সংরক্ষিত হবে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জমা হতে থাকবে। এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে সাইকেলের প্যাডেলিং সিস্টেম, যাতে অনেক দ্রুত প্যাডেল ও শ্যাফটের গতি অর্জন করা সম্ভব হয়। শ্যাফটের একদিকে পুলি, অন্যদিকে জেনারেটর স্থাপন করায় দুদিকের কাজই নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন হয়। এছাড়া মেশিনটির প্যাডেলিং সিস্টেম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে শহরের কায়িক শ্রমবিমুখী নাগরিক সেলাইয়ের পাশাপাশি শারীরিক ব্যায়ামও করতে পারেন। দেশীয় প্লান্টে মেশিনটি তৈরি বাবদ খরচ পড়বে মাত্র ৫-৭ হাজার টাকা। এ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে গ্রামের গৃহিণীরা কাপড় সেলাইয়ের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজেরা স্বাবলম্বী হতে পারবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। এটি তৈরি করেছেন বুয়েট আইপিই বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান (রাকিব), প্রিতু রায়, তানভীর আহমেদ, মো. শওকত হোসেন (অন্তর) ও সাগর নমদাস।









