ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন লন্ডনে, তখন চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ঘিরে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। এক সাক্ষাৎকারে চীনের সাবেক নেতা মাও সে তুংকে নিয়ে তৈরি একটি মিম নিয়ে রসিকতা করেছিলেন ফরাসি এই ফুটবল তারকা। এর জেরে চীনা ব্র্যান্ডগুলো একে একে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। এমনকি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির মূল প্রতিষ্ঠান চায়না মিডিয়া গ্রুপ স্প্যানিশ লিগ লা লিগার খেলা সম্প্রচারও স্থগিত করে।
শেষ পর্যন্ত নিজের মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান এমবাপ্পে। তবে চীনের ইন্টারনেটে বিতর্কের মূল বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট আলোচনা করতে দেখা যায়নি অনেককে।
এমবাপ্পের একটি সাক্ষাৎকারের ভিডিও থেকে বিতর্কের সূত্রপাত। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন মিমটি দেখে সবচেয়ে বেশি হাসি পায়। উত্তরে এমন একটি মিমের কথা বলেন, যেখানে তার মুখ বসানো হয়েছে চীনের একনায়ক মাও সে তুংয়ের মতো দেখতে একটি চরিত্রের শরীরে। মাওয়ের শাসনামল চীনের ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত।
ভিডিওটি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষোভ তৈরি হয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কথা ও কাজের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই চীনা সমাজের সব পক্ষ একযোগে প্রতিবাদ জানাবে।’
তবে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ঠিক কোন কথা বা কাজের জন্য এমবাপ্পের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ, তা স্পষ্ট করে বলছিলেন না। এমনকি মাওয়ের নামও সরাসরি উল্লেখ করছিলেন না।
এর পেছনে রয়েছে চীনের কঠোর ইন্টারনেট সেন্সরশিপ ব্যবস্থা। বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের দেশটিতে তথ্য নিয়ন্ত্রণের কারণে অনেকেই জানতেন না, এমবাপ্পে ঠিক কী বলেছেন। শুধু ‘চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত’ করার অভিযোগই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের বিরোধিতা করতে অনেকে দ্বিধা বোধ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও সেই ক্ষোভকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
পরিস্থিতির মুখে এমবাপ্পে নিজের মন্তব্যকে ‘বিবেচনাহীন’ উল্লেখ করে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। তার ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এবং স্প্যানিশ লিগ লা লিগাও ক্ষমা চায়। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের জন্য চীন বড় বাজার হওয়ায় বিষয়টি বাণিজ্যিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে ক্ষমা চাওয়ার পরও ক্ষোভ কমেনি। চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে একজন লেখেন, ক্ষমা চাওয়া ন্যূনতম দায়িত্ব, কিন্তু এমবাপ্পেকে ক্ষমা করা উচিত নয়। বরং তার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকুক।
মাওয়ের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও অনেক চীনা নাগরিক মনে করেছেন, কমিউনিস্ট চীনের প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে যেকোনো রসিকতাই সীমা অতিক্রম করার শামিল। কেউ তাকে চীনা জনগণের ‘আধ্যাত্মিক স্তম্ভ’ বলেছেন, আবার কেউ দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিতর্কের আরেকটি দিক হলো, অনেক চীনা নাগরিক তখনো জানতে চাইছিলেন এমবাপ্পে আসলে কী বলেছিলেন। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটের সাহায্য নিলেও সেন্সরশিপের কারণে সেখান থেকে উত্তর পাননি। কেউ কেউ মাওয়ের নাম এড়িয়ে তাকে ‘১০০ ইউয়ানের নোটে থাকা ব্যক্তি’ কিংবা ‘শিক্ষক’ বলে উল্লেখ করেছেন। মিম ও সাক্ষাৎকারের স্ক্রিনশট ছড়ালেও সেখানে এমবাপ্পের মুখ ও ‘একনায়ক’ শব্দটি ঝাপসা করে দেয়া হয়েছিল।
১৯৭৬ সালে মারা যাওয়া মাও সে তুং চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে গৃহযুদ্ধে জয়ী করে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার শাসনামলে গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো ঘটনাগুলোয় দুর্ভিক্ষে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু এবং ব্যাপক দমন-পীড়ন ঘটে। তা সত্ত্বেও চীনে তিনি এখনো সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে মাও-এর বিশাল প্রতিকৃতি রয়েছে। সেখানে সংরক্ষিত তার মরদেহ দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যান। চীনের ইতিহাসের পাঠ্যবইয়েও তার শাসনামলের বিপর্যয়গুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে, চীনের বাইরে মাওকে বিপ্লবী ও একনায়ক—দুই পরিচয়েই দেখা হয়। ফলে প্রবাসী চীনা ও ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কেউ এমবাপ্পের পক্ষ নিয়ে লিখেছেন, তার ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং চীনা কমিউনিস্ট পার্টিরই জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
এদিকে চীনে নিষিদ্ধ এক্স ও থ্রেডসে বিতর্কটি নতুন মাত্রা পায়। সেখানে মাওয়ের পাশাপাশি বর্তমান চীনা নেতা শি চিনপিংয়ের ছবিতেও এমবাপ্পের মুখ বসিয়ে মিম তৈরি করা হয়। অন্যদিকে, রিয়াল মাদ্রিদের ক্ষমা প্রার্থনার নিচে ইনস্টাগ্রামে একজন মন্তব্য করেন, একজন একনায়ককে একনায়ক বলার কারণে এত ক্ষোভ কেন?
বিবিসি অবলম্বনে













