অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোফিজুর রহমান। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য (মনোনীত)। তিনি এর আগে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য ও উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি তিনি উচ্চ শিক্ষার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে

শিক্ষার মানে উপমহাদেশের অনেক দেশ থেকে আমরা পিছিয়ে। ওয়ার্ল্ড রÅvংকিংয়েও অনেক পিছিয়ে। আপনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আপনার কী মনে হয় বিষয়টি নিয়ে? 

কোয়ালিটি এডুকেশনে আমাদের সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি। আমাদের ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রদের যে জ্ঞান নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা উচিত, সেটি তাদের নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আর কতটাই ভালো করতে পারবে! তার পরও কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এখন ভালো করছে। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর পরই নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড রÅvংকিংয়ে আছে। একেবারেই ভালো করছে না, সে রকমটা নয়। টাইমস হায়ার এডুকেশন ও কিউএস রÅvংকিংয়ে আমরা আসছি। আমি মনে করি, শিক্ষা নিয়ে এত এক্সপেরিমেন্টের প্রয়োজন ছিল না। একবার সৃজনশীল করেছি আর এখন গ্রেড সিস্টেম তুলে দিয়েছি। আবার বলা হচ্ছে, নবম দশম শ্রেণীতে সায়েন্স, কমার্স ও আর্টস থাকবে না, সবার এক রকম কারিকুলাম থাকবে। তাহলে তো আমরা আরো শেষ করে দিচ্ছি। এগুলোর প্রয়োজন ছিল না। শিক্ষার ক্ষেত্রে পাশের দেশ ভারত অনেক অগ্রগামী, আমরা তাদের দেখতে পারতাম। কারণ ভারতের আইআইটি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ইউএনডিপি ও আমেরিকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভারতের অধ্যাপকরা। আমরা ফিনল্যান্ড ও জাপানকে কেন দেখব! ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকেই দেখতে পারতাম। যতটুকু জানি, ভারতে এখনো সনাতন শিক্ষা ব্যবস্থাই চলছে।

প্রত্যেকটি দেশে যখন নতুন কোনো কারিকুলাম বা সাবজেক্ট খোলা হয়, তখন দেখা হয় সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানগুলোয় কতজন প্রয়োজন। সে অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েট বের করা হয়। বাংলাদেশে সে ব্যবস্থা নেই। এ সমস্যা থেকে উত্তোরনের জন্য কোন ধরনের পলিসি দরকার?

কোনো একটা সেক্টরে যখন লোক তৈরি করা হতে থাকে, এমন একটা পর্যায়ে আমরা চলে যাই, ওই ফিল্ডটা শেষ করে ফেলি। যেমন বিবিএ পড়া নিয়ে। একসময় লাখ লাখ মানুষ বের হবে বিবিএ থেকে। দেখা যাবে, বিবিএ দিয়ে আর কিছু হবে না। দেশটা যেহেতু এভাবে কাজ করে না, কমপক্ষে বাইরের চাহিদা অনুযায়ী আমরা যেন লোকবল তৈরি করতে পারি, সেদিকে চোখ রাখা জরুরি। কারণ সেটা আমাদের জন্য বেটার।

নব্বইয়ের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবস্থান ছিল বাংলাদেশের, তার সঙ্গে যদি বর্তমানের অবস্থা তুলনা করেন। চিত্রটা আসলে কেমন? 

তখন তো আসলে সবই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। মাত্র দুটি বা তিনটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। নব্বইয়ের দিকে আমি যতদূর জানি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইউবিএটি ছিল। আর ছিল কাজী জাফরুল্লাহর গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা যখন এইচএসসি পাস করেছি, এইচএসসির সময় তৎকালীন পাসের হার খুব কম ছিল। আমাদের সময় খুব সম্ভবত ৩৫ শতাংশ পাস করেছিল এইচএসসিতে। তখন আসলে ৫০ শতাংশের ওপরে পাসের হার খুব কম ছিল। এখন তো প্রায় ৯০ শতাংশ পাসের হার। আমরা বোধহয় মানের চেয়ে সংখ্যার দিকে মনোযোগী হয়ে পড়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা নিয়ে কিছু বলুন।

মোটা দাগে বলতে গেলে খুব একটা গবেষণা হয় না আসলে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ও ভিসি বানানো হয় দল করেন কিনা তার ওপর ভিত্তি করে। সে কত ভালো গবেষণা করে, সেগুলো বিবেচনা করে না। এমন পরিস্থিতিতে আমি যদি প্রফেসর হতে চাই, তাহলে আমি দল করব। কষ্ট করে গবেষণা কেন করব। যারা রাজনীতি করে না, তারা গবেষণার চেষ্টা করে। 

গত অর্থবছরে বাজেটে গবেষণায় যত বরাদ্দ ছিল তার ১ টাকাও খরচ করতে পারেনি বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়। এর কারণ কী?

করতে পারেনি, তা না। করেনি। এটা একটা কালচার। অনেক দিন ধরেই করা হয় না। আমাদের সরকার জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করেন। অথচ ইউনেস্কো বলে কোনো দেশের কমপক্ষে ৬ শতাংশ খরচ করতে হবে শিক্ষা বাবদ। ১ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যেও আবার নানা রকমের ফাঁকি আছে। সত্যিকার হার আরো কম। আপনি বলবেন শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, আর এখানে খরচ করবেন না, এটা তো হবে না। তার পরও ১ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে কত টাকা আর গবেষণায় যায়? অধিকাংশই তো যায় টিচারদের বেতন দিতে। রিসার্চের জন্য তো টাকাও দরকার।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো প্রকার সংস্কার নিয়ে আপনার পরামর্শ থাকলে বলুন।

যদি শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড মনে করি, তাহলে শিক্ষককে ভালো রাখতে হবে। আমরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছি। কিন্তু কেউ কি আসলে স্কুলের শিক্ষক হতে চায়? শিক্ষককে হয়তো সমাজে এখনো কিছুটা সম্মান করে, কিন্তু তাদের সে বেতন দিয়ে জীবন চালানোই কষ্টকর। এজন্য ভার্সিটির সবচেয়ে ভালো ছাত্ররা এদিকটা এড়িয়ে যেতে চায়। যারা ব্যাকবেঞ্চার ও জীবনে কিছু করার নেই। তারা হয়তো এদিকটায় যায় নিতান্ত বাধ্য হয়ে। তাহলে আপনি ছাত্রদের কীভাবে তৈরি করেন? এজন্য আমরা ভারতের দিকেও তাকাতে পারতাম। গ্রামের ইস্কুলের হেডমাস্টারেরও পিএইচডি আছে আর তার বেতন হলো ৭৫ হাজার টাকা। ভারতে শিক্ষকদের আলাদা বেতন কাঠামো, এটা সাধারণ স্কেলের থেকে অনেক বেশি। আমি যদি স্কুল-কলেজের টিচারদের উন্নত জীবন দিতে পারতাম, তাহলে ভালো ছাত্ররা ওদিকে যেত। আর যদি ভালো ছাত্ররা শিক্ষকতায় আসে, শিক্ষার মান ভালো করা সম্ভব। সোজা কথায়, আমরা যদি শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলি, তাহলে শিক্ষককে সেভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। আর আমি যদি স্কুল কলেজ পর্যন্ত খুব শক্তিশালী করতে পারি, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ইউনিভার্সিটি ভালো হবে। বুয়েটের ছাত্রদের মতো ছাত্রদের যদি নেয়া যেত, তাহলে কি আউটপুট ভালো হতো না? আউটপুট ভালো পেতে হলে টিচারদের ভালো রাখতে হবে। বিনিয়োগ ভালো করেন, সুফল পাবেন। মুখের কথা বললে তো হবে না।