অধ্যাপক মুজিব খান। বিকল্প ধারার এক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সফল কারিগর। তিনি স্কুল অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (সোডা), কলেজ অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (কোডা) ও ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের (ইউডা) প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তার ভাবনার কথা শুনেছেন শফিকুল ইসলাম

স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শিক্ষা নিয়ে ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। আপনার কাছে শিক্ষার পূর্ণ অর্থ কী?

যখন স্কুল কলেজ ও ইউনিভার্সিটি ছিল না, তখনো শিক্ষা ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক ও পুথিগত শিক্ষার অভাব ছিল হয়তো, কিন্তু তারা শিক্ষিত ছিল সামাজিক ও মানবিক শিক্ষার দিক থেকে। ফলে শিক্ষার সামাজিক ও মানবিক একটি ধারা আর অন্যটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। দুটিকে একত্র করা হয়নি। আমাদের প্রচেষ্টা হচ্ছে দুটিকে একত্র করার। ভালো মানুষের পাশাপাশি জ্ঞানী মানুষ তৈরি করা। যদি দুটিকে একসঙ্গে জীবনের প্রথম থেকেই নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে একজন সম্পূর্ণ মানুষ হবে। বর্তমানে রাজনৈতিক বলয়ে নানা জন নানা ধরনের অপকর্ম করছে। এটা তো শিক্ষিতরাই করছে, অশিক্ষিতরা না। কৃষক ও শ্রমিকরা কেবল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হলেই খুশি। তাছাড়া তাদের মধ্যেও জ্ঞানবুদ্ধি আছে। যদিও কৃষকরা পুথিগত শিক্ষা ঠিকমতো পায় না; কিন্তু তারা ফসল নিয়ে গবেষণা করে। আগের তুলনায় বেশি ফসল উৎপাদনের চিন্তা তাদের মাথা থেকেই আসে। কৃষিতে যারা অনার্স করছে, তারা কিন্তু সবাই কৃষিতে কন্ট্রিবিউট করতে পারছে না। অর্থাৎ সমন্বয় নেই। শুধু এটাই শেষ কথা না। নতুন মিনিস্ট্রি হলো এখানে কোন ব্যাকগ্রাউন্ড বিবেচনায় নেয়া হয়েছে? এজন্য আনা হয়েছে এ মন্ত্রী এ মিনিস্ট্রিতে থাকলে দেশের উপকার হবে? নেয়া হয়নি। দুয়েকজন থাকতে পারে এমন। বরং বিবেচনা নেয়া হয়েছে, এতে দলের উপকার হবে। তাহলে দেশের ও জনগণের উপকার কোথায়? সব পেশায়ই সমন্বয় জরুরি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করবে অর্জিত পুথিগত বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে। আর সেটা রক্ষা করবে মানবিক গুণাবলি দিয়ে। মানবিক গুণাবলি থাকা জরুরি। মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ তৈরি করাই প্রথম লক্ষ্যমাত্রা। 

শিক্ষা নিয়ে অনেকগুলো কমিশন ও নীতিমালা তৈরির পরও শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা এখনো শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন। সমস্যাটা কোথায়?

ব্রিটিশ আমল থেকেই শিক্ষাটা রাজনৈতিকীরণের মাধ্যমেই বেশি প্রতিষ্ঠিত। যখন যারা ক্ষমতায় আসে, তাদের কিছু বুদ্ধিজীবী নিয়ে কমিশন করে এবং তাদের মতো করে রাজনৈতিক চিন্তা ওখানে প্রতিফলিত করে। আর রাজনৈতিক চিন্তাকে সামনে রেখে কোন পদ্ধতি তৈরি করলে সেটা জনগণমুখী হবে না। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, বই পরিবর্তন হয়েছে, পদ্ধতি পরিবর্তন হয়েছে। যদি মানবিক গুণাবলির বিকাশের জন্য শিক্ষা হয়, তাহলে একটা কমিশনেই এটা সম্ভব। রাজনীতি, মত ও ধর্মের প্রতিফলন দিতে গেলে তো আর শিক্ষা হবে না। শিক্ষাটা হলো মানবিক মানুষ গড়ে তোলার জন্য। আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন সুপ্ত অবস্থায়, তাকে বিকশিত করতে হবে। একেকটা কমিশন তৈরি হচ্ছে আর পরিবর্তন হচ্ছে। তাহলে শেষ কোথায়? তার জন্য গবেষণা দরকার। বাচ্চাদের গিনিপিগ বানিয়ে এটা করা উচিত না। শিক্ষা কেন দরকার, সেটাও বুঝতে হবে। শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় শুধু চাকরি, কাজের পারদর্শিতা অথবা সম্মান অর্জন, তাহলে মানবিক মূল্যবোধের কী হবে? চিকিৎসক হলে জনগণের লাভ তখনই হবে, যখন চিকিৎসক একজন ভালো মানুষ হবে। নাহলে একটা ক্লিনিক তৈরি করে হাত পা কাটবে, কিডনি চুরি করবে। এভাবে সবার জন্য সত্য। এক্ষেত্রে শিক্ষাকে কম্প্রোমাইজ করেনি, কম্প্রোমাইজ করেছে মানবিক মূল্যবোধকে। একজন ভালো মানুষ দরকার সবার আগে। তখন পুথিগত বিদ্যা থাকলে দেশ উপকৃত হবে। আমরা টিকে থাকতে পারব প্রতিযোগিতামুলক বিশ্বে। দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নেই বলেই সমাজটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মানুষটাকে মানুষ বানাতে না পারলে ডিগ্রি দিয়ে কাজ হবে না। বয়স অনুযায়ী তাকে মানবিক, সামাজিক ও পুথিগত শিক্ষা দিতে হবে। এ মানবিক শিক্ষা তো সাধারণত বাড়িতে দেয়া হয়। আমাদের ‘‌কম্পিলিট এডুকেশন ফর অল্টারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট’ কনসেপ্টে আমরা বলেছি, ইংরেজি, বাংলা ও অংক তিনটিকে ক্লাস এইট পর্যন্ত বেসিক সাবজেক্ট ধরে পারদর্শী করা উচিত। এটা হলে নাইন থেকে টুয়েলভ হবে পেশাগত শিক্ষার সহযোগী শিক্ষা। কেউ আইনজীবী হতে চাইলে ল’ ও রাষ্ট্রনীতির ওপরে শিক্ষা থাকতে হবে। অথবা ফার্মেসি পড়তে চাইলে তার প্রস্তুতি থাকবে। এতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে আসবে। এ সময় তাকে সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-আচরণ, চলাফেরা ও নানা ধরনের বিনোদনমূলক শিক্ষা দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদের জন্য ফিলোসফি, রাজনীতি, অর্থনীতি ধর্ম, সবকিছুর মধ্যে একটা সমন্বয় লাগবে। বর্তমানে তো ৯০ শতাংশ ছাত্রেরই রাজনীতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। 

প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। শিক্ষা খাতে সংস্কারের জন্য আপনার নিজস্ব ভাবনার কথা জানতে চাই।

বই কিংবা কনটেন্টে পরিবর্তনই শিক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন না। ভালো শিক্ষা সবাই যেন সমানভাবে পায়, সে নীতি আমরা নিইনি। ফলে বৈষম্য রয়ে গেছে।

সংস্কারের প্রস্তাব হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তুলে দিতে হবে। এলাকাভিত্তিক হাঁটাপথে পড়াশোনা করতে পারে, এমন ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের স্কুলে যাওয়া আসা নিয়ে টায়ার্ড থাকে। প্রেশার থাকে। গ্রামভিত্তিক প্রাইমারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক করলেই হবে। এরিয়াভিত্তিকই আছে। দুর্গম এলাকায় যেখানে নেই, সেখানে করতে হবে। কিন্তু শহরেও এলাকাভিত্তিক ভালো মানের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষায় সমতা হলে ছোটাছুটির দরকার নেই। শিক্ষকের গুণগত মান থাকতে হবে। এটা ক্লাস এইট পর্যন্ত। পরবর্তী পর্যায়ে ছাত্ররা কমবেশি দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে সক্ষম। তবে একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, আউটডোর গেমসের আর কোনো সুযোগ আমাদের নেই। ভবনগুলোও ব্যয়বহুল। প্রতিষ্ঠান করলে ভবন নিয়ে এত মাথা কেন? গবেষণা, কারিকুলাম দেখা হোক। জমি আর বিল্ডিং নিয়ে কঠোরতার চেয়ে এটা গুরুত্বপূর্ণ। তারপর হলো যোগ্য শিক্ষক। প্রফেশনাল শিক্ষা সম্পর্কে যোগ্য হতে হবে শিক্ষকদের। ভালো মানুষের অধীনে ছাত্ররা রাস্তায় থাকলেও ভালো হয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রয়োজন শিক্ষক আর অ্যাপ্রোপ্রিয়েট কারিকুলাম। প্রথমটা মানবিক উন্নয়নের জন্য মৌলিক শিক্ষা আর দ্বিতীয়টি পেশাগত প্রয়োজনীয়তা। এছাড়া আর সংস্কারের কোনো পরামর্শ নেই।