আমার অধ্যাপকের কাছ থেকে গতকাল একটি খুদে বার্তা পেলাম। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘তোমাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের গবেষণার মিটিংয়ে ধৈর্য নিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। ওরা মাত্র উচ্চ শিক্ষা শুরু করল, তাদের সামনে থেকে সব বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আমি তোমাকে সাধুবাদ জানাই।’

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি গবেষণা ও তাদের গোছানো শিক্ষাদান পদ্ধতি। আর এ পদ্ধতিতে শিক্ষক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা এমন সেতুবন্ধের কাজটুকু করেন তারা গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট। উচ্চ শিক্ষায় স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিতে থাকা শিক্ষার্থীরা এ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একদিকে যেমন শিক্ষকদের কাজকে সহজ করে, ঠিক তেমনিভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে গবেষণাসহ বিভাগের সামগ্রিক একাডেমিক সাফল্যে। তাই গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টদের বলা চলে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শিক্ষার ‘লাইফলাইন’। 

এ দায়িত্ব মোটেই স্বেচ্ছাসেবী কিছু নয়, বরং প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট একজন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী। সে নিয়োগ কখনো বিভাগ দেয়, কখনো নির্দিষ্ট অধ্যাপক দেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিভিন্ন সেশনে পিএইচডি বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তির আবেদনকারীদের মধ্যে মেধাবী, দক্ষ ও উদ্যমী শিক্ষার্থীদের অতীত সাফল্য, ফলাফল ও সামগ্রিক বৃত্তান্ত বিবেচনা করে পড়াশোনার পাশাপাশি, খণ্ডকালীন চাকরি হিসেবে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ করার শর্তে তাদের বিভাগে গবেষণা কিংবা পাঠদান সহকারী অর্থাৎ রিসার্চ বা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব দেয়া হয়। যার বিনিময়ে ওই শিক্ষার্থী প্রতি মাসে নির্দিষ্ট বেতন পান এবং তার টিউশন ফিও মওকুফ হয়ে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবীমার ব্যয়ও তখন আর শিক্ষার্থীকে বহন করতে হয় না। ফলে শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে হয় না বললেই চলে এবং মাসিক যে বেতন তিনি পান তা দিয়ে নিজের আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে পারেন। 

তাই বাংলাদেশসহ স্বল্প আয়ের অনেক দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উচ্চ শিক্ষা নেয়ার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয় এবং বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী বেশ সুনামের সঙ্গে এসব দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

গবেষণা সহকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকদের অধীনে কাজ করেন। তাদের নির্দেশনায় গবেষণা এগিয়ে নিয়ে যান। ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ফলাফল তৈরি ও বিভিন্ন সাময়িকী ও কনফারেন্সে এসব গবেষণা প্রকাশ ও প্রচারের কাজ করেন। ফলে এটি একদিকে যেমন প্রতিষ্ঠানের গবেষণার ক্ষমতা বাড়াতে অবদান রাখে, ঠিক তেমনি শিক্ষার্থীর দক্ষতা, জ্ঞানকে আরো পরিশীলিত করে, যা তারা তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারে প্রয়োগ করতে পারে।

অন্যদিকে পাঠদান সহকারীরা শিক্ষাগত প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তারা কোর্সের প্রস্তুতি, লেকচার প্রদান, টিউটোরিয়াল সেশন পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নে শিক্ষকদের সহায়তা করেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এ সরাসরি সম্পৃক্ততা শুধু তাদের শেখার অভিজ্ঞতাই সমৃদ্ধ করে না, বরং একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের শিক্ষক হওয়ার ভিত গড়ে দেয়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কাঠামোতে এ গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট সংস্কৃতিকে পরিচয় করানো হতে পারে একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এতে একদিকে যেমন মেধাবী শিক্ষার্থীরা মূল্যায়ন পাবেন এবং উপকৃত হবেন, ঠিক তেমনিভাবে দেশের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষক সংকটের ফলে শিখন ঘাটতির একটি অংশ লাঘব হবে। পাশাপাশি গবেষণার সুযোগ বিস্তৃত হবে। সেই সঙ্গে হাতে-কলমে পাঠদান ও গবেষণার অভিজ্ঞতা একাডেমিয়ার জন্য দক্ষ ও প্রস্তুত শিক্ষক সরবরাহেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

শাহরিয়ার খান নোবেল: গ্র‍্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট, স্কুল অব মিডিয়া অ্যান্ড স্ট্র‍্যাটেজিক কমিউনিকেশন, ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র