ফুটবল জাদুকর দিয়েগো আরমান্দো মারাডোনার ৬৬তম জন্মদিন আজ। ১৯৬০ সালের এই দিনে আর্জেন্টিনার লানুসে জন্মগ্রহণ করেন ক্ষণজন্মা এই ফুটবলার। ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর ৬০ বছর বয়সে ফুটবল বিশ্বকে কাঁদিয়ে অনন্তলোকের পথ ধরেন ফুটবলের এ মহানায়ক।
ম্যারাডোনা অমর হয়ে আছেন তার ফুটবল শৈলী আর অর্জন দিয়ে। ক্যারিয়ারের সেরা সব ড্রিবলিং, চোখধাঁধানো গোল আর আইকনিক মুহূর্তের জন্য ফুটবল বিশ্ব তাকে মনে রাখতে যুগ যুগান্তর।
ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর মধ্যে চিরভাস্বর হয়ে আছে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ম্যাচটি। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতেছিল ২-১ গোলে। দুটি গোলই করেছিলেন ম্যারাডোনা। এর একটি ছিল কুখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ (ঈশ্বরের হাত) গোল। তার ঠিক পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে ড্রিবলিং করে এগিয়ে যাওয়ার পর করা সেই কিংবদন্তিতুল্য গোল—যা ২০০২ সালে ভোটাভুটির মাধ্যমে শতাব্দীর সেরা বিশ্বকাপ গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
বুয়েনস আইরেসের এক দরিদ্র বস্তিতে মারাডোনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ম্যারাডোনার। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তার ফুটবল প্রতিভার কারণে আর্জেন্টিনার যুব দলে জায়গা করে নেন। তার সময় লস সেবোলিতাস (লিটল অনিয়নস) নামে পরিচিত দলটি টানা ১৩৬টি ম্যাচে অপরাজিত থাকার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ে। এই সময়েই তরুণ ম্যারাডোনা ‘এল পিবে দে ওরো’ বা ‘স্বর্ণালী বালক’ উপাধি পান। ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে মাত্র ১৫ বছর বয়সে লিগ ফুটবলে তার অভিষেক হয় এবং দ্রুতই নিজের অনন্য প্রতিভার জানান দেন তিনি। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে তিনি আর্জেন্টিনার মেট্রোপলিটানো ও ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে টানা পাঁচবার সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
পেশাদার ফুটবলে অভিষেকের মাত্র চার মাস পর ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে মারাডোনার অভিষেক হয়। ভেনেজুয়েলায় অনুষ্ঠিত ১৯৭৭ সালের সাউথ আমেরিকান যুব চ্যাম্পিয়নশিপ খেলার এক বছর পর নিজ দেশে অনুষ্ঠিত ১৯৭৮ সালের ফিফা বিশ্বকাপের মূল দল থেকে বাদ পড়ায় তার স্বপ্নভঙ্গ হয়। প্রাথমিক দলে থাকলেও তৎকালীন কোচ সিজার মেনোত্তি একদম শেষ মুহূর্তে তাকে বাদ দেন। মারাডোনা নিজেই স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘দল থেকে বাদ পড়ার পর আমি অঝোরে কেঁদেছিলাম।’
তবে এর পরের বছরই, ১৯৭৯ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করে মারাডোনা বিশ্বমঞ্চে নিজেকে তুলে ধরেন এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ পান। ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে তিনি আর্জেন্টিনা ও দক্ষিণ আমেরিকার সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালের মধ্যে তিনি তার বাবার প্রিয় ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে যোগ দেন এবং ১৯৮২ সালের গ্রীষ্মে আর্জেন্টিনা দলের সঙ্গে স্পেনে ফিফা বিশ্বকাপ খেলতে যান। তবে সেবার দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বে ইতালি ও ব্রাজিলের কাছে হেরে আর্জেন্টিনা বিদায় নেয়।
বিশ্বকাপের পর মারাডোনা যোগ দেন স্পেনের বার্সেলোনায়। সেখানে ৩৬ ম্যাচে ২২ গোল করলেও স্পেনে তিনি কখনই সুখী ছিলেন না। ক্লাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে নানা সমস্যা এবং প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের মারমুখী ফাউলের শিকার হতে হতো তাকে। ১৯৮৪ সালের কাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর স্পেনের রাজা হুয়ান কার্লোসের সামনেই হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার পর তাকে ইতালির ক্লাব নাপোলির কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।
নাপোলিতেই ক্লাব ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ সময় পার করেন মারাডোনা। প্রথম মৌসুমটি সাদামাটা কাটলেও ১৯৮৫/৮৬ মৌসুমে তার নেতৃত্বে নাপোলি লিগে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। এর ঠিক এক বছর পর তিনি নাপোলিকে তাদের ক্লাব ইতিহাসের প্রথম সিরি-আ চ্যাম্পিয়নশিপ এবং একইসঙ্গে কোপ্পা ইতালিয়ার শিরোপা জেতান। ১৯৮৯/৯০ মৌসুমে এই প্লে-মেকারের ওপর ভর করেই নাপোলি দ্বিতীয়বারের মতো সিরি-আ জয় করে। ১৯৮৯ সালের গ্রীষ্মে তারা উয়েফা কাপ জয় করে, যা ক্লাবটির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত একমাত্র আন্তর্জাতিক শিরোপা।
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত সুপারস্টার, যার অসামান্য পারফরম্যান্সে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ঐতিহাসিক দুই গোলের পর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৩-২ গোলের জয়ে দলের তিনটি গোলেই তার অবদান ছিল। অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে অধিনায়ক হিসেবে তিনি বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন। এর এক সপ্তাহ পর আমেরিকার বিখ্যাত ‘স্পোর্টস ইলাস্ট্রেটেড’ সাময়িকী তাকে ‘কিং অব সকার’ বা ‘ফুটবল সম্রাট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে।
ম্যারাডোনা সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে এবং বিষয়টি আর্জেন্টিনার আদালতে বিচারাধীন। তবে এটা ঠিক, মামলার রায় যাই হোক না কেন, তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। তিনি এমন এক ঠিকানায় পাড়ি জমিয়েছেন যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। তাইতো ২০২২ সালে লিওনেল মেসিদের বিশ্বকাপ জয়ের উদযাপনেও শামিল হতে পারেননি আর্জেন্টাইনদের কাছে ‘ফুটবল ঈশ্বর’ ম্যারাডোনা। হয়তো স্বর্গে বসেই দেখেছেন মেসি, ডি মারিয়া, মার্তিনেজদের উদযাপন।









