১৯৭০ সালের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিকাশ লাভ করেছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) মূলত দুটি মৌলিক ক্ষেত্রকে একীভূতকরণের মাধ্যমে জন্মলাভ করে। যার মধ্যে রয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানেজমেন্ট। আইপিই অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের তুলনায় বেশ ভিন্নধর্মী ও বিস্তৃত একটি বিষয়। আইপিই মূলত প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন করে এবং কলকারখানার বিভিন্ন সেক্টরের মধ্যে সেতুবন্ধ স্থাপন করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্প বিপ্লবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী দৃশ্যমান। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে আইপিই উন্নত প্রযুক্তি যেমন ইন্টারনেট অব থিংস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিগ ডেটা অ্যানালিটিকসকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। পঞ্চম শিল্প বিপ্লবে আইপিই রোবোটিকস প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানব সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং উন্নত, টেকসই ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করে। 

বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে চাকরির ক্ষেত্রে আইপিইর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যেহেতু এর কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রডাক্ট ডিজাইন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা। বিশেষত, বাংলাদেশের শিল্প খাতে উন্নয়ন ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা সমানুপাতিক হারে বাড়ছে। আইপিই ইঞ্জিনিয়াররা শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলোয়ই নয়, বরং ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের পাশাপাশি ম্যানেজমেন্টেও দক্ষতা অর্জন করে।

বাংলাদেশে পরিচালিত প্রায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কোম্পানিতে আইপিই ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির সুযোগ রয়েছে। একজন আইপিই ইঞ্জিনিয়ারকে একটি শিল্প-কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য উৎপাদন এবং তার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, একটি কারখানার লে-আউট তৈরি, কম রিসোর্সের বিনিময়ে বেশি উৎপাদনের কৌশল নির্ধারণ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল তৈরি ও তাদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, আধুনিক যন্ত্রপাতির সমন্বয় সাধন, পণ্য বাজারজাত, বিপণন পরিকল্পনা এবং যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা ও মানোন্নয়ন। 

দেশের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আইপিই নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আইপিইতে ভর্তির জন্য আবেদনের যোগ্যতা রাখে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভর্তির যোগ্যতা ও নিয়ম ভিন্ন হতে পারে। যেহেতু আইপিই ইঞ্জিনিয়াররা কর্মক্ষেত্রে যন্ত্রপাতিনির্ভর, তাই হাতে-কলমে যন্ত্রপাতির ব্যবহার শেখা ও দক্ষতা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুগোপযোগী ল্যাব ফ্যাসিলিটি প্রদানে বদ্ধপরিকর, যা শিক্ষার্থীদের আধুনিক যন্ত্রপাতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে। এছাড়া উৎপাদন প্রকৌশল বিষয়ে পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনের পাশাপাশি পণ্যের ডিজাইন ও মানোন্নয়ন, পণ্য বাছাই, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে অভিযোজন এবং পরিকল্পনা ব্যবস্থাপনা প্রণয়নবিষয়ক জ্ঞান দান করা হয়। 

আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে পড়াশোনা ও যন্ত্রপাতি বিষয়ে দক্ষতার পাশাপাশি ক্যাড/ক্যাম, সলিডওয়ার্কস, কিংবা এবাকাসের মতো সফটওয়্যার পরিচালনায় পারদর্শিতা থাকলে আইপিই ইঞ্জিনিয়াররা তাদের পেশাগত জীবনে সহজেই সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হতে পারেন। এছাড়া বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য আইপিইর চাহিদা অত্যধিক। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে প্রায় সব দেশেই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। 

আইপিইর কর্মক্ষেত্র চারটি প্রধান সেক্টরে বিভক্ত। প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর, ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং, সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং ও সাপ্লাইন চেইন ম্যানেজমেন্ট। প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টর মূলত পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন, কার্যকারিতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন, উৎপাদন খরচ ও কম সময়ে অধিক পণ্য উৎপাদন ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। এছাড়া প্রোডাকশন লাইন, অ্যাসেম্বলি লাইন ইত্যাদির তত্ত্বাবধান করাও একজন প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারের মূল কাজ।

আপাতদৃষ্টিতে প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং এক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তাদের মধ্যে কিছু ভিন্নতা লক্ষণীয়। একটি পণ্য উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল বাছাই থেকে শুরু করে পণ্য বাজারজাত ও ভোক্তাকে পণ্য ক্রয়-পরবর্তী সেবা প্রদান—সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াই ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। একটি পণ্যের জন্য সঠিক মানের কাঁচামাল ক্রয়, পণ্য ডিজাইন, উৎপাদন খরচের পরিপ্রেক্ষিতে মূল্য নির্ধারণ সবকিছুই একজন ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ার করেন।

আর সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং হলো একটি ট্রান্সডিসিপ্লিনারি ও ইন্টিগ্রেটিভ পন্থা, যা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত নীতি ব্যবহারের মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ারড সিস্টেমগুলোর সফল বাস্তবায়ন ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে। একজন সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারকে একটি কারখানার আধুনিকায়নের জন্য বিভিন্ন জটিল সফটওয়্যার ব্যবহার থেকে শুরু করে বৃহৎ আকারের হার্ডওয়্যার কনফিগারেশন পর্যন্ত সবকিছুই তত্ত্বাবধান করতে হয়, যা প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ডিজাইনিং, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করে। 

সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ব্যবসা প্রশাসনের একটি বিশেষ শাখা হলেও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এর গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ কোনো একটি পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে পণ্যের বাজারজাত পর্যন্ত সব ধাপেই সুষ্ঠু সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন। একটি কারখানায় একজন সাপ্লাই চেইন ম্যানেজার মূলত পণ্য উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল ক্রয়, পণ্য মজুদকরণ, বিপণন কার্যক্রম, পণ্য সংগ্রহের সুষ্ঠু পরিকল্পনা, পণ্য শ্রেণীবদ্ধকরণ, পণ্য সরবরাহ ও বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান ইত্যাদি কাজ করেন। 

আইপিই ইঞ্জিনিয়ারিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান ক্ষেত্র, যা উৎপাদন শিল্পের প্রায় প্রতিটি ধাপেই প্রভাব ফেলে। দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আইপিই ইঞ্জিনিয়াররা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম। তাই বাংলাদেশে শিল্প খাতের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আইপিই ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা ও গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। যারা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আগ্রহী, তাদের জন্য আইপিই হতে পারে একটি অন্যতম পছন্দের বিষয়।

ড. মো. এহসানুল হক

বিভাগীয় প্রধান, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, 

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ