অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ। নর্দান এডুকেশন গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক। তিনি একাধারে একজন শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক এবং একই সঙ্গে একজন সফল উদ্যোক্তা। দেশের উচ্চশিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে
একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান কেমন বলে আপনি মনে করেন?
স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষায় আমরা অনেক উন্নতি করেছি। শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক উন্নতির তুলনায় আমাদের শিক্ষার অবস্থা খুব বেশি ভালো যে নয়, সেটি স্বীকার করতে আমার আপত্তি নেই। কোয়ালিটি শিক্ষায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। আমার দেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় খুব ভালো করতে পারছে না। এটা আমাদের শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ অবস্থার উন্নতি না হলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে খুব বেশি আশা করার কিছু নেই। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশাল বলয়। বর্তমান ভিসিরি নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়টি বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ভালো করবে বলেই আমার বিশ্বাস। শিক্ষার পরিবেশ ফেরাতে, শিক্ষকদের গবেষণামুখী করতে বর্তমান ভিসি সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেবেন বলে আমি আশাবাদী।
শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে বাধা কোথায় বলে আপনি মনে করেন।
শিক্ষার মানোন্নয়ন একটি সমন্বিত প্রয়াস। এখানে সরকারের ভূমিকা যেমন আছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতাও আছে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে।
শিক্ষায় বিনিয়োগ আরেকটি বড় কারণ। আমার মতে, সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ হলো শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ। শ্রেষ্ঠ মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষায়, গবেষণায় বিনিয়োগও শ্রেষ্ঠ হতে হবে। অথচ এদেশে শিক্ষায় বরাদ্দ ভয়াবহভাবে কম। আন্তর্জাতিক মান অনুসারে, একটি দেশের শিক্ষা বাজেট মোট বাজেটের ন্যূনতম ১৫-২০ শতাংশ অথবা জাতীয় আয়ের ৪-৬ শতাংশ হতে হবে। পরিসংখ্যান বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যয় সবচেয়ে কম। জিডিপির বিবেচনায় শিক্ষা খাতে ভুটানে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ, ভারতে ৪ দশমিক ৪, নেপালে ৪ দশমিক ১ ও পাকিস্তানে ২ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়ানো আফগানিস্তানও শিক্ষা বরাদ্দে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো করছে। বাংলাদেশের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ দেয়ার পরামর্শ ইউনেস্কোর, যা প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি।
বিনিয়োগের বাইরে শিক্ষার উন্নয়নে সবচেয়ে অভাব হলো পলিসিতে। গুটিকয়েক সরকারি আমলা শিক্ষা পলিসি নিয়ন্ত্রণ করলে যথাযথ উন্নয়ন আসবে না। এ জায়গায় সরকারকে উদারতা দেখাতে হবে। দেশের খ্যাতিমান বিজ্ঞ শিক্ষাবিদ-গবেষকদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় শিক্ষা উন্নয়ন কমিটি করতে হবে।
উচ্চশিক্ষার জন্য যারা বিদেশ গমন করছে তাদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
এটাকে আমরা এককথায় মেধা পাচার বলব। মেধাবীরাই বাইরের দেশের জন্য বৃত্তি পায়। এরা পড়াশোনা শেষ করে সেদেশেই সেটেল্ড হয়। অথচ এদেশেও খুব ভালো মানের চাকরির পদ আছে। এ পদগুলো আবার পাশের দেশের মেধাবীরা এসে দখল করছে।
মেধাবীদের ধরে রাখতে না পারাটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই না। দেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা গেলে বিশেষ করে বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ওপরের দিকে আরোহণ করতে পারলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বিদেশ গমনের কোনো যৌক্তিক কারণ থাকবে না। দেশের ছেলেরা দেশের উচ্চপদগুলোয় আসীন হলে তাদের কাজের প্রতি লায়াবিলিটি ভিন দেশের কর্মকর্তাদের তুলনায় বেশি থাকবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিদেশে যদি পড়ালেখার জন্য যেতেই হয় সেটাও হতে হবে সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। দেশের মানবসম্পদ তৈরিতে বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে বিশেষজ্ঞ তৈরিতে সরকার প্ল্যান করে শিক্ষার্থীদের উন্নত দেশগুলোয় পাঠাবে। পড়ালেখা শেষ করে তারা যেন দেশে ফিরে আসে তার ব্যবস্থাও সরকারকে করতে হবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
মাত্র তিন দশক আগে যাত্রা শুরু দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার। দেশের ক্রমবর্ধমান জনশক্তিকে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে প্রস্তুত করতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে সেক্টরটি। একসময় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন সংকটে দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ না পেয়ে দেশের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিদেশে পাড়ি জমাত। এতে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল উল্লেখ করার মতো। গত এক দশকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি আস্থা রাখতে দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসছে বাংলাদেশে। বর্তমানে দেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পড়ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়। গবেষণা খাতেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কিউএস, টিএইচইসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র্যাংকিংয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দারুণ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছাড়িয়েও যেতে দেখছি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে।
করপোরেট চাকরি-সংক্রান্ত সম্প্রতি একটি পরিসংখ্যান বলছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের করপোরেট চাকরিতে অংশগ্রহণ অনেক বেশি। বৈশ্বিক অনেক প্রতিযোগিতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অর্জনও উল্লেখ করার মতো। এদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুগল, মাইক্রোসফট, ফেসবুক, অ্যামাজনের মতো বিশ্ববিখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোয় সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। কাজ করছে মহাজাগতিক গবেষণা সংস্থা নাসায়ও। আন্তর্জাতিক কোলাবরেশন, শিক্ষায় আধুনিক উপায়-উপকরণের সন্নিবেশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে দারুণ উন্নতি করেছে ক্ষেত্রটি। তাই বলাই যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান অনস্বীকার্য।









