প্রকৃতি নিয়মনির্ভর। এই নিয়ম আবিষ্কার করা বিজ্ঞানের কাজ। আর সে জ্ঞান চর্চা ও ছড়িয়ে যায় শিক্ষার মাধ্যমে। গাছ থেকে ফল মাটিতে পড়ে। কেন? মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জন্য। এটি তত্ত্ব বা বিজ্ঞান। এটি জানা হচ্ছে শিক্ষা। আর এই তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে প্রকৃতিকে বদলানো হচ্ছে বিজ্ঞানের তত্ত্বের প্রয়োগ। কী দরকার এই প্রয়োগের? আমাদের জীবনকে নিরাপদ ও আয়েশি করা। এমন না হলে অন্য প্রাণীদের মতো খাবার সংগ্রহ করেই আমাদের জীবন কাটত। সভ্য হওয়া আর হতো না।

আমাদের সমাজ আর অর্থনীতি পরিবর্তনের মূল কারণ বিজ্ঞানের আবিষ্কার ও এর প্রয়োগে প্রযুক্তির ব্যবহার। এটা না হলে সমাজের অগ্রগমন হয় না। মানুষের ফ্যাশন হচ্ছে তার লাইফস্টাইল বা জীবনাচারে ব্যবহৃত অবজেক্ট যা তাকে প্রাণিজগৎ থেকে আলাদা করেছে আর এসব অবজেক্ট প্রযুক্তির আবিষ্কার ও ব্যবহারের ফল। আমাদের খাবার-দাবার, পরিধেয় পোশাক, ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রী সবই ফ্যাশনের অন্তর্গত বিষয়। কিন্তু প্রযুক্তি না থাকলে কোনো ফ্যাশনই সম্ভব হত না। এককথায় লাইফস্টাইল, সভ্যতার অনুগামী। সমাজ পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় অর্থনীতি আর এর মূল কারণ প্রযুক্তির আবিষ্কার ও প্রয়োগ। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সংস্রব রাখতে পারলে, অর্থনীতি সচল হয়, লাইফস্টাইল হয় আধুনিক। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পরিবর্তন শিক্ষা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই এগুলো আজ দুনিয়াজুড়ে শিক্ষাব্যবস্থায় জায়গা করে নিয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাতের একটি হলো তৈরি পোশাক। এই পোশাক জীবনাচার বা লাইফস্টাইল বা ফ্যাশন পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত। আর এই পরিবর্তন প্রযুক্তি ও আর্থিক সামর্থ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের আকার বাড়ছে, ফলে জীবনাচার ও ফ্যাশনের প্রভাবও বাড়ছে। আসলে সব মানুষকেই ফ্যাশন করতে হয়, তবে ফ্যাশনের দ্রব্য-সামগ্রী ক্রয় করার সামর্থ্য মূলত ফ্যাশনের বাণিজ্যিক প্রসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পোশাক ও পোশাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে ক্রেতার রুচি ও আর্থিক সামর্থ্য নজরে রেখে পণ্যের ডিজাইন করতে হয়। পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও এর ব্যবহার জানা না থাকলে এ ডিজাইন সম্ভব নয়। এখানেই প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট জ্ঞান, প্রশিক্ষণ যা শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। 

পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ বাংলাদেশে এরকম শিক্ষার অভাববোধ থেকে পোশাক শিল্পের পরিবর্তিত প্রযুক্তির প্রয়োগের ও এই প্রযুক্তি পরিচয়ে দক্ষ এক গোষ্ঠী গড়ে তুলতে চান যা আসলে মানবসম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা ভোক্তা হিসেবে দক্ষ শ্রমিকের উৎপাদনের প্রয়োজনে পোশাক শিল্পনির্ভর প্রযুক্তির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধিষ্ঠান চান এবং ফ্যাশননির্ভর ক্রেতার কাছে তারা পণ্য বিক্রয়ে আবার পণ্যের উৎপাদক ও জোগানদারও বটে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারলে তাদের শিল্পের প্রসার ও দেশের উন্নয়নে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারবে—এই বোধকে অবলম্বন করে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে আছে চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের শর্ত অনুযায়ী, তিনটি ফ্যাকাল্টিসমেত ছয়টি ডিপার্টমেন্ট নিয়ে যাত্রা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের। টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্লদিং টেকনোলজি, ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি, ফ্যাশন ডিজাইন, অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট। ল্যাব ফ্যাসিলিটি যথাযথ পূর্ণ করে খুব শিগগির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ভর্তি শুরু হবে। এরই মধ্যে উল্লিখিত প্রথম চারটি বিভাগে ভর্তি ও পাঠদানের দুই ব্যাচ শেষ হয়েছে। বাংলাদেশে সময়ের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের একটি নমুনা এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। 

যদিও সমাজ তৈরি হয়েছে প্রযুক্তির উদ্ভাবনের ও প্রয়োগের ফলে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক নির্মাণে আইন-কানুন, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ইত্যাদি সামাজিক বিষয়গুলো সামাজিক সংহতি না আনলে প্রযুক্তির অস্তিত্ব থাকলেও সমাজের অগ্রগমন সংহতির অভাবে অর্জন সম্ভব হবে না। মনে রাখা দরকার, বিজ্ঞান ও মানবিক চর্চা হাত ধরাধরি করে চলে। প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে মানবিক ও সামাজিক বিষয়গুলোও সিবিইউএফটিতে ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে খোলা হবে। 

বলা হয় ‘Commerce and business activities are the lifeblood of all other social activities’, মোদ্দাকথা মানুষ অর্থনৈতিক প্রাণী, সে উৎপাদন ও বিনিময় করে। এর মাধ্যমে সে গড়ে তোলে সামাজিক সম্পর্ক, এই সম্পর্কের প্রতিষ্ঠায় পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সংঘ, সমিতি, রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। সামাজিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণে নর্ম, মূল্যবোধ, আইন-কানুন ইত্যাদি গড়ে। আন্তর্জাতিক আইন ব্যবসার প্রতিকূলে গেলে অর্থনীতিতে একটা ধাক্কা লাগে। ফলে ব্যবসাকে অবলম্বন করেই তো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ, সেই দিকটিও অবশ্যই আমাদের নজরে আছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন অনুযায়ী এই শিক্ষার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হবে।

এ উচ্চ শিক্ষায়তনের উদ্যোক্তা যারা, তারা একাধারে যেমন শিল্পপতি, দক্ষ শ্রমিকের উৎপাদক, আবার এই জনবলের দক্ষতার ভোক্তা, ফলে এমন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্মিত ব্র্যান্ডেড পণ্য তথা দক্ষ শ্রম ও মেধাশক্তির বেকার থাকার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। বিকাশমান এই শিল্প, জনবলের চাহিদা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। চাহিদার ক্রমমানে অন্নর পরই বস্ত্র। অন্নও এখন ডিজাইন করে বা সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়; বস্ত্র বা অ্যাপারেল সামগ্রী তো বটেই, এই বিষয়ের নির্মিত পণ্যের চাহিদা পূরণে বাজার দখল খুবই প্রয়োজন। তাই এটা খুবই স্পষ্ট যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্থনীতির ও প্রযুক্তির বিকাশকে আমলে নিয়ে যে ধরণের বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন তার অভাব পূরণে ভূমিকা রাখছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের অর্থনীতি ও কর্মশক্তিকে বিকশিত করতে বিভিন্ন খাতেই এমন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এখন যুগের চাহিদা। 

জাতিসংঘের Sustainable Development Goal এ যুবকদের সংখ্যা বাড়ানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছে। যাকে একাডেমিক ভাষায় Demographic Dividend বা Population Bonusও বলা হয়ে থাকে। বলাবাহুল্য যুবকদের সংখ্যা বাড়লেই হবে না, এদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। আমার মনে হয়, এ বিষয়টিও বিজিএমইএ নেতাদের বেশ গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করতে পেরেছেন। আজকের বাংলাদেশের উন্নয়নে পোশাক শিল্পের যে ভূমিকা এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, দক্ষ জনবল গঠন করে, শিল্পের প্রসার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে যথাযথ ভূমিকা রাখবে, আশা করা যায়।

লেখক: উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি