মো. আলী আহসান খান। আরলা ফুডস বাংলাদেশ লিমিটেডের হেড অব এইচআর। আরলা ফুডস ইউরোপের প্রায় আট হাজার দুগ্ধ খামারির মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক ডেইরি প্রতিষ্ঠান। এর স্থানীয় অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আরলা ফুডস বাংলাদেশ লি. বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুধের ব্র্যান্ড ডানোর প্রস্তুতকারক। ডানো পাওয়ার, ডানো ডেইল পুষ্টি, ডানো ডিলাইট এবং ডানো রেডির মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশের লাখো মানুষ দুধের পুষ্টি গ্রহণ করতে পারছে। ডানো টানা নয় বছর ‘ বেস্ট মিল্ক ব্র্যান্ড’-এর সম্মাননা লাভ করেছে। প্রায় তিন দশকের এইচআর অভিজ্ঞতাসহ এ পেশার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম
চাকরি হিসেবে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কেমন? কেন এখানে ক্যারিয়ার গড়া উচিত?
যেকোনো প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগ হৃৎপিণ্ডের মতো কাজ করে। প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা বজায় রেখে কাজের গতিশীলতা ধরে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এ বিভাগ। যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি করে তুলতে বিশ্বব্যাপী মানবসম্পদ বিভাগকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। ১৯৯০-এর পর থেকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে পরিচালন বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও এ বিভাগের কর্মপরিধির বিস্তার এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া শুরু করল এবং ক্রমান্বয়ে প্রয়োগও করা শুরু করল। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম আরো যত সংঘবদ্ধ হবে, মানবসম্পদ বিভাগের প্রয়োজনীয়তাও তত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আর সেক্ষেত্রে প্রয়োজন এ খাতে দক্ষ ও নিষ্ঠাবান জনবলের। চাকরির ক্ষেত্রে নতুন আগ্রহীদের জন্য এ পেশা হয়ে উঠতে পারে বেশ সম্ভাবনাময়।
কাজের ধরন কী কী?
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ বিভাগের কর্মপরিধি কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাই এবং বেতন-ভাতা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে ধারণা পাল্টাতে শুরু করে এবং কাজের পরিধিও বিস্তার লাভ করা শুরু করে। বলা যেতে পারে যে পরিধির দিক থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ বিশ্বব্যাপী মানদণ্ডের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে মানবসম্পদ বিভাগের কাজের আওতায় রয়েছে সংগঠন ও পরিকল্পনা, শ্রম আইন ও নিয়মাবলি প্রয়োগ, জটিল পরিস্থিতিতে সমাধান বের করা এবং আলোচনার মাধ্যমে যথাযথ মধ্যস্থতা করা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতা উন্নয়ন, কর্মী নিয়োগ ও চাকরির আগ্রহ সৃষ্টি ও বজায় রাখা, বেতন কাঠামো নির্ধারণ ও কর নিরূপণ প্রভৃতি।
কী কী দক্ষতা ও জ্ঞান থাকতে হবে?
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে হলে যে এ বিষয়েই পড়াশোনা করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে, তা একেবারেই আবশ্যক নয়। তবে এ বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকলে চাকরি প্রার্থিতায় প্রাধান্য পাওয়া যেতে পারে এবং কর্মক্ষেত্রের প্রাথমিক পর্যায়ে কাজের বিভিন্ন ধারণা বুঝতে সহায়ক হবে। তবে এ খাতে ভালো কাজ করতে হলে যেটা আবশ্যক সেটা হলো মানুষকে ঠিকমতো বুঝতে শেখা, সবার সঙ্গে ঠিকমতো মিশতে শেখা এবং সবার প্রতি সহমর্মী হওয়া। কারো সঙ্গে বা কোনো কাজে কোনোভাবেই অধৈর্য হওয়া যাবে না। কারো কথা শুনতে বা বুঝতে অধৈর্য হলে অথবা ঠিকমতো যোগাযোগ না করলে, কথোপকথন না করলে কোনোভাবেই এ কাজে ভালো করা সম্ভব নয়। এছাড়া শ্রম আইন, কর্মচারীদের অধিকার ও নিয়মাবলি সম্পর্কে ভালো ধারণা অর্জন করতে হবে। আর থাকতে হবে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য বিভাগের কাজ সম্পর্কে ধারণা। না হলে অন্যান্য বিভাগের কর্মীদের কাজের সহায়ক হয়ে ওঠা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আরলা ফুডসে এসব ব্যাপারে আমরা প্রাধান্য দিয়ে থাকি।
দেশে-বিদেশে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ রয়েছে?
আধুনিক যুগে পৃথিবীর প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই এইচআর বা মানবসম্পদ বিভাগের গুরুত্ব অপরিসীম। যেহেতু এ বিভাগের প্রধান কাজ কর্মীদের অর্থাৎ মানুষদের নিয়ে, সেহেতু কার্যপরিধি ও কার্যপন্থায় খুব একটা তারতম্য হয় না। এ কাজে বা বিভাগে দক্ষ কর্মীদের পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় কাজ করার সুযোগ থাকে। এটিকে ট্রান্সফারেবল স্কিল বা প্রতিস্থাপনযোগ্য দক্ষতা বলে। একটি উদাহরণ দিলে হয়তো ব্যাপারটি বুঝতে আরো সহজ হবে। পৃথিবীর অন্যান্য আরো অনেক দেশের মতো মধ্যপ্রাচ্যের
বিভিন্ন দেশেও আরলা ফুডসের কার্যক্রম রয়েছে। আর আরলা বৈশ্বিক ব্যবসার প্রয়োজনীয়তায় এ দেশগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক বছর ধরে আরলা ফুডস বাংলাদেশের মানবসম্পদ বিভাগ আরলা ফুডসের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মানবসম্পদ বিভাগকে সহায়তা করছে ট্যালেন্ট অ্যাকুইজেশনে। আরলা ফুডস বাংলাদেশের কর্মরত মানবসম্পদ বিভাগের কর্মীদের দক্ষতারও একটি পরিচায়ক এটি।
বেতন কাঠামো কেমন?
মানবসম্পদ বিভাগের বেতন কাঠামো কোনো প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য যেকোনো বিভাগের মতোই হওয়া উচিত। বেতন কাঠামোটি আরো নির্ভর করে নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের ওপর। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি এখন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রারম্ভিক পদগুলোয় প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামোতে লোকবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া এনজিও ও স্টার্টআপগুলোয় মানবসম্পদ বিভাগের চাকরি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ কোথায় কোথায়?
ব্যবসায় শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর বা বিবিএ ও এমবিএ শিক্ষা কার্যক্রম রয়েছে এমন প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবসম্পদ নিয়ে বিশেষায়িত কোর্স নিয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
আপনার দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে যদি কিছু বলতে চান।
আমার কর্মজীবনের শুরু থেকেই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কাজ করছি। তিনটি প্রতিষ্ঠানে সর্বমোট ২৭ বছর। কর্মজীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হলো যেকোনো প্রতিষ্ঠান সফল হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষগুলো। একক দক্ষতা, নিষ্ঠা ও সততা সামষ্টিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেই একটি প্রতিষ্ঠান সফল হয়। এজন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানে সুস্থ একটি কর্মসংস্কৃতি বা ওয়ার্ক কালচার প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। আর এজন্য প্রয়োজন মানুষকে যথাযথ সম্মান দেয়া এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। বিশ্বব্যাপী তথা বাংলাদেশে আরলা ফুডসে এ মূল্যবোধগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। আমার ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আমার কাজ আরো সহজ হয়েছে এজন্য। সম্প্রতি বাংলাদেশে দুগ্ধ খাতের আরো আধুনিকায়ন হচ্ছে। এ খাতেও আগ্রহীরা দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারে।










