অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. হুমায়ুন কবীর। উপাচার্য, প্রাইম ইউনিভার্সিটি। তিনি জার্মানির ড্রেসডেনের ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের সামগ্রিক চিত্র নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে
উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পাঠদানের জন্য আউটকাম বেজড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলামের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ঢেলে সাজানোর কথা বলা হচ্ছে। ওবিই উচ্চশিক্ষায় কী বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারবে?
প্রথমে যদি বলি তাহলে এটা বলা দরকার যে বর্তমান সরকারের কাজের একটা ধারাবাহিকতা আছে। তবে এর আগের সরকারের মধ্যে ছিল না। আমরা যদি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেখি তাহলে ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের পরই কিন্তু পটপরিবর্তন হলো। এরপর এল সামরিক শাসন। তারপর রাজনৈতিক পরিবর্তন। এসব মিলিয়ে কিন্তু ধারাবাহিকতার অভাব ছিল। এখন এ সরকার শিক্ষা নিয়ে যেসব পরিকল্পনা করেছে সেটা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। বিশেষ করে মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য আমি যদি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলি তাহলে বলব আউটকাম বেজড এডুকেশনের মধ্যে আছি। আর আউটকাম বেজড এডুকেশনের জন্য আমাদের আউটকাম বেজড কারিকুলাম দরকার। আমরা কিন্তু সে কারিকুলাম নিয়েই কাজ করছি এবং আমরা এটার এক্সিকিউশন লেভেলে আছি। আর আউটকাম বেজড এডুকেশনের ফলাফল আমরা এত তাড়াতাড়ি পাব না, হয়তো কিছুটা সময় লাগবে। হয়তো ৫-১০ বছরের মধ্যে কিছুটা হলেও পরিবর্তন দেখা যাবে। আগের এডুকেশন সিস্টেম এবং এখনকার আউটকাম বেজড এডুকেশনের মধ্যে যদি তফাত দেখি তাহলে বলা যায়, আগের শিক্ষকরা তাদের মতো করে পড়াতেন। যেমন তারা যদি ভাবতেন যে আজ আমি একটা চ্যাপ্টার পড়াব তাহলে কোনো প্রিপারেশন ছাড়াই একটা ক্লাস নিয়ে চলে যেতেন। তবে এখনকার আউটকাম বেজড এডুকেশনে কিন্তু সেটা করা যাবে না। এখন কিন্তু কোর্সের আউটলাইন আছে এবং উনি কী পড়াবেন সে টপিক নির্ধারণ করা আছে। আর যে টপিক পড়ানো হবে তার একটা আউটকাম থাকবে। যেমন উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, আমি যদি ইইইর একজন শিক্ষক হয়ে ভিএলএসআই নিয়ে পড়াই তাহলে ভিএলএসআই কেন পড়বে, সেটা প্রথমেই বলা হয়। আগে কিন্তু শিক্ষকরা বিভিন্ন টপিক নিয়ে কেবল পড়িয়ে যেতেন কিন্তু এখন তাকে শুরুতেই ওই বিষয়ে একটা সূচনা বলতে হবে। সূচনার পর তাদের টপিকের বিভিন্ন কনটেন্ট নিয়ে পড়াতে হবে এবং শেষে সেটার একটা আউটকাম বলতে হবে। যেমন ভিএলএসআই নিয়ে যদি বলি তাহলে সেটার আউটকাম নিয়ে আমাকে পড়াতে হবে। আমি যদি শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারি যে তোমরা যদি এটা নিয়ে পড়ো তাহলে কী ধরনের চাকরির সুবিধা পাবে। দিনশেষে একজন শিক্ষার্থী কিন্তু কাজ করতে চায়, তাই এ শিক্ষা তার জব মার্কেটে কেমন ভূমিকা রাখবে সেটা জানানোও আউটকাম এডুকেশনের অংশ। এটা কিন্তু শিক্ষার্থীদের আরো আগ্রহী করবে। আমাদের এডুকেশন সিস্টেমে পরিবর্তন আসবে আউটকাম বেজড এডুকেশনের মধ্য দিয়ে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের নতুন কারিকুলাম কীভাবে দেখছেন?
এখন নতুন শিক্ষাক্রম নেয়া হয়েছে, এটার অনেক ইতিবাচক দিক আছে। দেশের বাইরে পড়াশোনা করার সুবাদে আমার বাচ্চারা ওখানকার কিন্ডারগার্টেনে পড়েছে। দেশের বাইরে কিন্ডারগার্টেনে কিন্তু কোনো পড়াশোনা নেই। বাচ্চারা স্কুলে যেত, খেলাধুলা করত এবং এর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় হাতে-কলমে শিখত। যেমন তাদের রাস্তায় নিয়ে যেত। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কোন দিকে তাকাতে হবে, ট্রাফিক সিগন্যালে কী করা উচিত এটাও শেখার বিষয়। কিন্তু আমার স্কুলজীবনে কিন্তু এসব স্কুল থেকে শেখানো হয়নি। একজন বাচ্চার জন্য প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুলের সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটা বাচ্চা বড় হয়ে কেমন মানুষ হবে, সে দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে কিনা সেই শিক্ষা ছোট থেকেই তাদের দিতে হবে। পড়াশোনার মূল উদ্দেশ্য তো একটা ভালো সময় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়া। এসব বিষয় যদি আমরা শিক্ষাক্রমের মধ্যে নিয়ে আসতে পারি তাহলে মানবিক বিষয়গুলো গড়ে উঠবে।
আমাদের দেশের সেরা শিক্ষাবিদরাই এডুকেশন কারিকুলাম থেকে শুরু করে শিক্ষানীতি তৈরি করেছেন। উন্নত দেশের মতো দেশের শিক্ষা কাঠামো গড়ে উঠেছে বলে আপনি মনে করেন?
সমস্যা হচ্ছে আমরা ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ওইভাবে গড়ে তুলিনি। যেমন অনেক প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে, যেখানকার অনেক ডিপার্টমেন্টের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর বা একজন লেকচারার। মানবসম্পদের যে উন্নয়ন সেটা তো আমাদের হয়নি। উদাহরণ হিসেবে জার্মানির কথা যদি বলি। আমার মনে আছে, জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সের একটা নতুন প্রোগ্রাম তারা শুরু করবে। আর তার জন্য তারা একটা স্টাডি করেছে। স্টাডি করে তারা ঠিক করেছে প্রতি সেমিস্টারে তারা ৫০ জন করে নেবে। এই ৫০ জন কোথায় চাকরি নেবে এবং পরবর্তী ১০ থেকে ৩০ বছরে সেটা কোথায় যাবে সে হিসাব করেছে, অর্থাৎ পুরোটাই নিড বেজড। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, এটা কিন্তু কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এই যে প্রতি বছর, বিবিএ, বাংলা ও ইংরেজি গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে কিন্তু তাদের জব প্লেসমেন্ট কোথায় হবে সেটার স্টাডি নেই। এখন আমরা বলছি স্মার্ট বাংলাদেশের কথা। আমাদের দেশ সেদিকেই যাচ্ছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা স্মার্ট বাংলাদেশকে ফোকাস করে হতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তৃতিকে কীভাবে দেখেন?
ভালো প্রশ্ন। এক কথায় যদি বলি, দরকার আছে। আমরা যদি কোয়ালিটি এডুকেশন দিতে পারি তাহলে সেটা খুবই ভালো ফল দেবে।
কিন্তু অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ালিটি এডুকেশন নেই—এ রকম একটি বিতর্ক রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
কোয়ালিটি এডুকেশন একদিনে হবে না। নেই মানেই যে কখনো হবে না এমন তো না। অনেকগুলো ফ্যাক্টর সেখানে কাজ করে। আমার তো দক্ষ জনশক্তি লাগবে। কোয়ালিটি ফ্যাকাল্টি মেম্বার লাগবে। বাংলাদেশে অনেক কলেজ, ভোকেশনাল কলেজ আছে। ডিপ্লোমা থেকে বিএসসি হলো। কিন্তু সেখানে শিক্ষকের উন্নতি হয়নি। যারা ডিপ্লোমা কোর্সে পড়াতেন তারাই এখন বিএসসির জন্য পড়ান। হায়ার এডুকেশন ছাড়া তো সেই মানের শিক্ষক হবে না। তবে আমি আশাবাদী। কিউএস বা টাইমস হায়ার এডুকেশন রÅvংকিংয়ে বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে থাকবে। এরই মধ্যে এখনই আছে কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়। আমি মনে করি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে তারা বাংলাদেশের হার্ভার্ড বা বোস্টন হবে তাদের পক্ষে তা সম্ভব।









