একজন সাইক্লিস্ট হিসেবে ফিটনেস প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে দৌড় শুরু করেছিলেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থী তানিম আল জিসান। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো অংশ নেন ২১ কিলোমিটারের হাফ ম্যারাথন দৌড়ে। এক বছরের মাথায় তানিমের অর্জনের ঝুলিতে জাতীয় পর্যায়ে তিনটি চ্যাম্পিয়ন মেডেল, দশটি রানার্সআপ। গত বছর মার্চ থেকে শুরু করে চলতি বছরে অংশ নেয়া ৮০টি দৌড় প্রতিযোগিতায় ৪৫টিতে ছিলেন শীর্ষ পাঁচে। পড়াশোনার পাশাপাশি শারীরিক কসরতের এমন কঠিন কাজটি সহজ করেছেন তানিমের বাবা-মা ও বড় ভাই। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে বড় ভাইয়ের উৎসাহে প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে অংশ নেয়া। সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছেন মা-বাবা।
তানিমের শৈশব কেটেছে দ্বীপজেলা ভোলায়। ঢাকার গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি ও মার্টিন লুথার কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে বর্তমানে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারে পড়ছেন।
এ বছর আয়োজিত ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দৌড় প্রতিযোগিতা অক্সফাম রান-২০২৪, ট্রেইল ব্রেক, জেনজি রানার্স—এ তিন প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়ন তানিম। এছাড়া শহীদ শেখ রাসেল হাফ ম্যারাথন ২০২৪-এর প্রথম রানার্সআপ, ইউসিআর ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটারে সেকেন্ড এডিশনের প্রথম রানার্সআপ, ইউসিআর হাফ ম্যারাথন এডিশন দুই-এর সেকেন্ড রানার্সআপ, ইউসিআর ১০ কিলোমিটার সেকেন্ড রানার্সআপ, হাতিরঝিল রানার্স ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার তৃতীয় রানার্সআপ, ঢাকা ২৫ কিলোমিটারে পঞ্চম, ইউসিআর ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটারে ফার্স্ট এডিশনে পঞ্চম, মেগাসিটি ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটারে তৃতীয় রানার্সআপসহ বিভিন্ন দৌড় প্রতিযোগিতায় তানিমের রয়েছে প্রায় অর্ধশত সেরা পাঁচে অবস্থান। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় সর্বনিম্ন ৭০০ থেকে ২ হাজার অংশগ্রহণকারীকে পেছনে ফেলেই তার এ অর্জন। ছিলেন বিদেশী প্রতিযোগীও। এতসব অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস শেষে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে আবার নিজেকে ট্রেনিংয়ের জন্য প্রস্তুত করতে হয়েছে তানিমকে। মানসিক শক্তির জোরেই নিজের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে নানা প্রতিবন্ধকতা জয় করেছেন তিনি।
তানিম বলেন, ‘আমার দ্বিতীয় হাফ ম্যারাথন ইভেন্টে বাম পায়ের ইনজুরিতে পড়ি। এ অবস্থা থেকে ফিরতে দীর্ঘদিন স্ট্রাগল করতে হয়েছে। দৌড়ের জন্য প্রয়োজনীয় অরিজিনাল সরঞ্জাম বেশ ব্যয়বহুল এবং আমাদের দেশে সহজলভ্য নয়। প্রয়োজনীয় জুতা জোগাড় করতে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। আমাদের সোসাইটিতে এখনো ম্যারাথন বা লং ডিসট্যান্স দৌড় প্রতিযোগিতার সে রকম গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়ে ওঠেনি। মাঝেমধ্যেই অনুশীলনের সময় এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে যে—ভাই, দৌড়াচ্ছেন কেন আপনার ডায়াবেটিস আছে নাকি?’ দৌড় প্রতিযোগিতাগুলোয় রেজিস্ট্রেশন ফি অনেক বেশি, তাই সব ইভেন্টে অংশগ্রহণ করতে পারেন না তানিম। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অনুশীলন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ আরো সহজ হতো বলে জানান তিনি।
তবে এত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও থেমে থাকেননি তানিম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সিনিয়র ও জুনিয়ররা সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন তাকে। পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে ফ্রি অনুশীলনের সুযোগ। সবসময় গাইডলাইন দিয়েছেন প্রশিক্ষকরা। নিজেকে দেশসেরা একজন অ্যামেচার দৌড়বিদ হিসেবে দেখতে চান তিনি। একজন দৌড়বিদ হিসেবে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চান তানিম।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে জানিয়ে বিইউএফটির প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. ইঞ্জিনিয়ার আইয়ুব নবী খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্রীড়ার জন্য আমাদের আলাদা প্রশিক্ষক রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ, জিমনেশিয়াম ও সুইমিংপুলও রয়েছে। ত্রীড়াঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা শিক্ষার্থীদের আমরা নানাভাবে সহায়তা করে থাকি। জাতীয় প্রতিযোগিতায় যারা অংশ নেয় তাদের জন্য টিউশন ফি ওয়েভার দেয়া হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি সহপাঠ কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি সুস্থ ও সুন্দর জীবন উপহার দেয়ার জন্য আমরা সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি।’










