অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান। উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক। তিনি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। সম্প্রতি তিনি উচ্চ শিক্ষার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শফিকুল ইসলাম

স্বাধীনতার ৫৩ বছর চলছে। এ সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছতে পেরেছে কিনা? 

আন্তর্জাতিক শিক্ষার মান নিয়ে বলার আগে বলতে হবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে। এখান থেকে বহুলাংশে শিক্ষার্থীরা বিদেশে চলে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে আমাদের শিক্ষার মানে ঘাটতি আছে। এখানে প্রয়োজন ডাইভারসিফায়েড এডুকেশন। ডাইভারসিফায়েড এডুকেশন হলো বিভিন্ন মত গ্রহণ করার জন্য আমাদের মানসিকতাকে শিক্ষার মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে। ডাইভারসিফায়েড শিক্ষারই একটি অংশ হলো কোন শিক্ষা ব্যবস্থায় সমাজের জন্য উন্নতি অথবা খারাপ হবে সেটি জানা। জায়গাটিতে আমরা পেরে উঠতে পারছি না।

ইউনেস্কো প্রতি বছর ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন ডে ২৪ জানুয়ারি পালন করে বেশ গুরুত্বসহকারেই। এখানে তাদের একটি টাইটেল হচ্ছে ‘‌লার্নিং ফর লাস্টিং পিস’। শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। আমরা কেবল শিক্ষা গ্রহণ করছি কিন্তু শিক্ষার যে মূল বিষয় সেটি গ্রহণ করছি না। বাংলাদেশে সুষম শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। গ্রামে অনেক সুন্দর সুন্দর স্কুল আছে কিন্তু মানুষ গ্রামের স্কুল ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে, কারণ গ্রামের শিক্ষা কাঠামো নিয়ে ভরসা পাচ্ছে না। বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় ভৌগোলিকভাবে একটি বিরাট ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয় আমরা যদি একটি সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে পারি, তাহলে অবশ্যই তা পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য হিসেবে আমি খুবই উদ্বিগ্ন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার আগে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি আছে। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারিতে যদি শিক্ষা কাঠামো উন্নত না হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা কোয়ালিটি স্টুডেন্ট বা ছাত্রছাত্রীদের জন্য যে কোয়ালিটি এডুকেশনের পরিকল্পনা করেছি তা বারবার ব্যাহত হবে। 

তাই এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করলে আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ২০২৪ কে সামনে রেখে আমাদের একটাই স্লোগান হওয়া উচিত-‘‌সর্বস্তরে একটি সুষম শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের গড়ে তোলা উচিত।’

বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিগুণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ গবেষণা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি ও গবেষণার সে সুযোগ নেই। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন।

এটা একদম যুগোপযোগী প্রশ্ন। এটাই আসলে এখনকার প্রধান স্লোগান। আমাদের পিএইচডি প্রোগাম চালু করার সুযোগ দেয়া হোক। আমরা এখন বিষয়টি নিয়ে তৎপর। ইউজিসি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অ্যাক্রিডেটেড কাউন্সিলের সঙ্গে ঘন ঘন বসছি। আমাদের পিএইচডি প্রোগ্রাম দরকার। বিদেশী শিক্ষক আসবেন ও কাজ করবেন। কিন্তু একজন শিক্ষক কীভাবে শিক্ষক হবেন, যদি তিনি গবেষণারই সুযোগ না পান? গবেষণার সবচেয়ে বড় সুযোগ পিএইচডি প্রোগ্রাম। শিক্ষককে সে সুযোগ দেয়া দরকার। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করেছে ১৯৯২ সালে। প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমারা এসেছি ১৯৯৬ সালে। প্রথম দিকের যে বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, তাদের সঙ্গে শেষ দিকে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য আছে। মানগত দিক থেকেই তফাত ব্যাপক। বিদেশেই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ২০০ বছর আর যার বয়স ১০০ বছর, তাদের মধ্যেই পার্থক্য বিপুল। সে পার্থক্য গুণগত ও সক্ষমতার দিক থেকে। আরেকটা বিষয় বলা দরকার, সেটা হলো সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সার্টিফিকেট কারখানায় নেই। এখন অনেকেই শিক্ষার মান নিয়ে চিন্তিত। তারা গবেষণা করতে চায়। তাদের এ অপবাদ থেকে তাদের মুক্তি দিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমি বলতে পারি, প্রথম ১০-১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়কে এ কাতারে ফেলা যাবে না। রÅvংকিংয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থান করে নিচ্ছে। এ গুণগত পরিবর্তন আরো গতিশীল হবে, যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পিএইচডি করার সুযোগ দেয়া হয়।

আমরা যখন একটা আন্ডারগ্রেড কিংবা মাস্টার্সের মতো নতুন প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনা নিই, তখন সে কোর্সের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছে জমা দিই। সক্ষমতা ও অবকাঠামোর কথা জানাই। শিক্ষকের অবস্থার কথা বলি। আমাদের এ সক্ষমতা আছে, কোর্সটি চালু করার অনুমোদন দেন। মাস্টার্সের বেলায়ও একই। ডিপার্টমেন্ট দেখুক, কতজন অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক আছে, ল্যাবের ক্যাপাসিটি কেমন কিংবা বিদেশীদের সঙ্গে কীভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছি, সেটাও বিবেচনা করুক। এগুলো দেখে ও বিবেচনা করে সে ডিপার্টমেন্টের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হোক, তারা পিএইচডি চালুর যোগ্যতা অর্জন করেছ কিনা। আমি এখনো বিশ্বাস করি, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়া ঠিক হবে না। কারণ একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ডিপার্টমেন্টের দক্ষতা এক রকম না। এ সক্ষমতায় পার্থক্য আছে। পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর ব্যাপারেও পার্থক্য থাকবে।

বিদেশে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটা কোলাবরেশন থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে জায়গাটায় ঘাটতি আছে। ইন্ডাস্ট্রিতে তারা বিদেশ থেকে হায়ার করে আনে। প্রয়োজনীয় টেকনোলজির জন্য  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আসে না। এ কোলাবরেশনে ঘাটতি থাকার কারণ কী?

গেইন (GAIN) বলে একটা শব্দ আছে। গেইন হলো গ্র্যাজুয়েট একাডেমি ইন্ডাস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্ক। এখানে তিনটা পার্টই আছে। প্রথমটি ছাত্র, দ্বিতীয়টি ফ্যাকাল্টি ও তৃতীয়টি ইন্ডাস্ট্রি। এ তিনের সমন্বয়ে একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। বিদেশের তুলনায় এটা আমাদের দেশে এখনো শিশু অবস্থায়। কিন্তু কৃষিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খেয়াল করে দেখলেই পার্থক্য বোঝা যায়। কৃষি খাতে একটা বিপ্লব সম্পন্ন হয়ে গেছে আমাদের। শস্য, মাছ, মাংস ও খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ব্যাপক। পাশাপাশি রয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো। এরা আসলে সবাই নিবিড়ভাবে গবেষণা করছে। ফলে খাতটি খুবই সফল। অন্য দিকটা কিন্তু পিছিয়ে। আমি বিভিন্ন ফোরামে যাচ্ছি। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, আপনাদের শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যা থেকে বের হতে পারছে না। এখানে প্রায়োগিক শিক্ষা দরকার। এখানে দুই পক্ষেরই বসতে হবে। বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিকে তাদের উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর জন্যই শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারে। ছাত্রদের যেখানেই পাঠানো হোক না কেন, তারা যেন দক্ষ জনশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আমি কী জানি, এটা বড় বিষয় না। বড় বিষয় হলো আমি কী পারি। বাইরের সব বড় বড় প্রতিষ্ঠানের রিসার্চ ল্যাব ইউনিভার্সিটিতে। আমরাও সেটা চাই। ডিপিডিসির সঙ্গে গত নভেম্বরে আমাদের আলোচনা হয়েছে স্মার্ট গ্রিড নিয়ে। কিন্তু আগে এটা কল্পনাও করা যেত না। আমাদের মনোভাবেও পরিবর্তন এসেছে। আমরা ওদিকে মনোনিবেশ করছি সর্বক্ষেত্রেই।