আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনাময় রফতানিজাত পণ্য হিসেবে বাংলাদেশের আসবাবপত্র বা ফার্নিচার শিল্প ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দেশের জিডিপিতে পণ্যটির অবদান প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্বের ৬১টি দেশে বাংলাদেশের ফার্নিচার রফতানি হচ্ছে। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলসের পর এ খাতেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ পণ্যের রফতানি বাজার কমতে শুরু করেছে। এ শিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রেও রফতানির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। অর্থনীতি বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন উচ্চ শুল্ক, কাঁচামালের স্বল্পতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব থাকায় সম্ভাবনাময়ী এ শিল্পের রফতানি বাজার কমে যাচ্ছে।

তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে আসবাবপত্র রফতানি খাতকে অগ্রাধিকার শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফার্নিচার রফতানি হচ্ছে। সম্প্রতি বছরগুলোতে বিদেশে ফার্নিচার রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১০ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ডলার ফার্নিচার রফতানি করা হয়েছে, যা তার আগের অর্থবছর থেকে ৩৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। ২০২২-২৩ অর্থবছরের টার্গেট ধরা হয়েছে ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জুলাই থেকে অক্টোবর এ চার মাসের টার্গেট ধরা হয়েছে ৩৯ দশমিক শূন্য ৪ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু অর্জিত হয়েছে ২৩ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলার। সম্ভাবনাময়ী এ শিল্পের চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর প্রান্তিকের রফতানি তুলনামূলকভাবে কমেছে। গত বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আয় হয়েছিল ২৯ দশমিক ১৫ ডলার। কিন্তু গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের এ প্রান্তিকে ৩৯ দশমিক ৪২ শতাংশ ফার্নিচার কম রফতানি হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের ফার্নিচার রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো।

২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে সারা বিশ্বের ৬১টি দেশে ফার্নিচার রফতানি হয়েছে। আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতের মোট রফতানি আয়ের ৫০ শতাংশেরও অধিক এসেছে এ দেশ থেকে। এছাড়া জাপান ১৬, ফ্রান্স ৯, ভারত ৪, দক্ষিণ কোরিয়া ৩, কানাডা ২, সৌদি আরব ২, স্পেন ১ ও অন্যান্য দেশ ৯ শতাংশ আসবাবপত্র বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে।

বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতি বলছে, বিশ্ববাজারে আসবাবপত্র বাণিজ্যের পরিমাণ ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের অধিক। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে এ শিল্পের রফতানির অনেক সুযোগ রয়েছে। যথাযথ সহায়তা পেলে এ বাণিজ্য ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন শিল্প মালিকরা। এ খাতে এরই মধ্যে ২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর পরিধি বাড়লে দেশে বড় কর্মক্ষেত্রেরও ব্যবস্থা হবে।

আসবাবপত্র রফতানির যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে হ্রাস পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির চেয়ারম্যান সেলিম এইচ রহমান বলেন, আসবাবপত্র শিল্পের একটি বড় সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানে বাণিজ্যিক পরিধিটা কমে যাচ্ছে। এর মূল কারণ স্বল্প মজুরির শ্রমিক পর্যাপ্ত থাকলেও আমাদের কাঁচামাল অধিকাংশ বাইরে থেকে আসে। কিন্তু তা উচ্চ শুল্ক দিয়ে আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও মানের সমন্বয় ঘটাতে হয়। অধিক শুল্কের কারণে বাজারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব পড়ছে শিল্পের মোট রফতানিতে। সরকার উদ্যোগী হলে আমাদের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বে এ পণ্যের আধিপত্য বিস্তার করতে পারব।

এদিকে ফার্নিচার শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি দেশের বাইরেও রফতানি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ১৬ বছর ধরে ফার্নিচার মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ বছর ১৭তম মেলার আয়োজিত করা হয়েছে। মেলায় দেশের নামকরা ৩৪টি ফার্নিচার প্রতিষ্ঠানের ১৮২টি স্টল বসে। রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার গুলনকশা হলে ৬-১০ অক্টোবর পর্যন্ত এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।