খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উৎস যত বেশি বৈচিত্র্যময় হবে, যেকোনো সংকটে একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা তত বেশি সুরক্ষিত থাকতে পারে। সম্প্রতি ৮৭টি দেশের ওপর করা এক বৈশ্বিক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, চরম আবহাওয়া, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট বা মহামারির মতো ধাক্কা সামলাতে খাদ্যের বিকল্প উৎস থাকাটা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ (পিএনএএস)-এ এ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, যেসব দেশে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, খাদ্য মজুদ ও আমদানির মতো একাধিক উৎসের বৈচিত্র্য রয়েছে, তারা সংকটের সময় খাদ্যনিরাপত্তা ধরে রাখতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম।

আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যালায়েন্স অব বায়োভার্সিটি ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিআইএটির প্রধান বিজ্ঞানী ও গবেষণার প্রধান লেখক ক্রিস্টোফ বেনে জানান, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বলতে কেবল কৃষিতে খাদ্য উৎপাদন বা ফসল ফলানোকেই বোঝায় না। এর মধ্যে প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ, বণ্টন ও ভোগের পাশাপাশি এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান ও বাজারও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

গবেষণায় ২০১১-২০১৯ সাল পর্যন্ত ৮৭টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২৭ জন গবেষক এতে যুক্ত ছিলেন। গবেষণায় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা সংকট সামলাতে সক্ষম, তা বোঝার জন্য ১১টি বিশেষ দিক পর্যালোচনা করা হয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে কম মজুদ রাখা বা অল্প কয়েকজন সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করা খরচ কমানোর জন্য কার্যকর হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ খরা, বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ কিংবা বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে এ ধরনের ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো একটি উৎস থেকে খাদ্য পাওয়া বন্ধ হলে বিকল্প উৎসের অভাবে বাজারে সংকট তৈরি হতে পারে।

খাদ্যের বিকল্প উৎসের সক্ষমতা পরিমাপ করতে গবেষকেরা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘ডায়েটারি সোর্সিং ফ্লেক্সিবিলিটি ইনডেক্স’ ব্যবহার করেছেন। গবেষণার ফলাফল বলছে, খাদ্যের একাধিক উৎস থাকা সংকটের সময় এক ধরনের বীমার মতো কাজ করতে পারে। একটি উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য উৎস থেকে খাদ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

গবেষণায় খাদ্যনিরাপত্তা ধরে রাখার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো হলো উচ্চ মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি), সরকারের কার্যকারিতা এবং খাদ্য সরবরাহের বৈচিত্র্য। এর পাশাপাশি সামাজিক আস্থা ও পারস্পরিক সহযোগিতাও দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করে।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো দেশে বড় ধরনের সংকট হলেই খাদ্যনিরাপত্তার অবনতি বেশি হবে, এমন নয়। ১০৫টি দেশের ওপর করা আরেকটি বিশ্লেষণে গবেষকেরা দেখেছেন, কিছু দেশ বড় ধরনের সংকটের মধ্যেও খাদ্যনিরাপত্তা ধরে রাখতে পেরেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের উদাহরণ টেনে গবেষকেরা জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও খাদ্য সরবরাহের বৈচিত্র্য বজায় রেখে দেশগুলো খাদ্যনিরাপত্তায় ভালো উন্নতি করেছে।

গবেষকদের মতে, যেকোনো একটি খাদ্য উৎস বা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো দরকার। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা সংকটের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রস্তুতি নিতে পারে।

এর প্রভাব বিশেষায়িত কৃষি খাতেও দেখা যেতে পারে। যেমন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলপাই তেল উৎপাদন ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে উৎপাদন ও সরবরাহের বিকল্প উৎস রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে গবেষকেরা শুধু বেশি মজুদ বা একই ব্যবস্থার একাধিক বিকল্প তৈরির পরামর্শ দেননি। তাদের মূল বক্তব্য হলো, খাদ্যের একটি মাত্র উৎস বা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। কারণ স্বাভাবিক সময়ে অতিরিক্ত মনে হওয়া কোনো বিকল্প উৎস সংকটের সময় গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে।