বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক ঘাটতি এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জামের ওপর সব ধরনের শুল্ক তুলে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বিশেষ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে গতকাল তিন দিনব্যাপী ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। ‘একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তর’ প্রতিপাদ্যে যৌথভাবে এ মেলার আয়োজন করেছে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, বুয়েট, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) এবং বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি)।
উদ্বোধনী বক্তব্যে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘বেশি দামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে এ খাতে বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’ এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইকবাল হাসান মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আলোচনা হলেও আগের কোনো সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই বর্তমান সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে।’ জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে বিশেষ জ্বালানি আইন উত্থাপন করা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসে থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেনা ও জ্বালানি সরবরাহেও সমস্যা রয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভবিষ্যতে দেশের গ্রিডে পারমাণবিক, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক ও নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। তবে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) এখনো এজন্য প্রস্তুত নয়। এ কারণে সরকার গ্রিড আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেছে।’
জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘কাতারের ওপর নির্ভরশীল থাকার সময় বোমা হামলার কারণে দেশটি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তখন প্রতি ইউনিট ১০-১২ ডলারের এলএনজি ৩০ ডলারে কিনতে হয়েছে।’
দেশের ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানে আগের সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দেশের ভূগর্ভে বিপুল সম্পদ রয়েছে। কিন্তু গত ১৭ বছরে একটি কূপও খনন করা হয়নি।’ অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে দেশকে আরো ৫০-৬০ বছর ভুগতে হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি-বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ সরকারি খাতে রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে গত ১৭ বছরে সেই পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ বেসরকারি খাতে। সরকারি উদ্যোগে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হলেও কয়েকটি যৌথভাবে নির্মাণ করা হয়েছে।’
গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অনেক গ্রামে যাতায়াতের রাস্তা নেই। কোথাও বিদ্যুতের ত্রুটি দেখা দিলে তা শনাক্ত করতেই দুই-তিনদিন লেগে যায়। এ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলে লোডশেডিং হয়। কিন্তু মানুষ এসব বাস্তবতা বুঝতে চায় না। এমনকি ডেপুটি স্পিকারও বিষয়টি নিয়ে ছাড় দেননি।’
অনুষ্ঠানে বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক বলেন, ‘দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এখন সন্ধিক্ষণে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।’ বর্তমান পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশেই জ্বালানি নিয়ে নতুন গবেষণার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৯৬ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এর বেশির ভাগই আমদানিনির্ভর। ফলে এ খাত বিভিন্ন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।’










