আদানিকাণ্ডের পরও তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যেভাবে ক্ষমতাকে ধরে রাখতে পেরেছে এবং নিজে কিংবা সহযোগীদের সঙ্গে ক্ষমতার অংশভাক হতে পেরেছে তা বিস্ময়কর বটে। ২ মার্চ উপনির্বাচনের ফলাফলে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। যখন মনে করা হচ্ছিল আদানিকাণ্ডের পর ভেতরে ভেতরে লেজেগোবরে অবস্থায় পড়েছে বিজেপি, তখন ভোটের ফলাফল জানান দিল—ওই ধারণা অমূলক ও হালে পানি পাওয়ার মতো নয়। প্রশ্ন হলো, কোন মন্ত্রবলে বিজেপি অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলছে? সেটা জাতীয়তাবাদ। কিন্তু তাদের জাতীয়তাবাদে তো রয়েছে গৌর রঙ, তার পরও কেন ভোটাররা হচ্ছেন মোহাবিষ্ট? এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের নিমিত্তেই এ লেখা।
জাতীয়তাবাদ যেকোনো দেশ ও জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক প্রপঞ্চ, যা সেই ভূগোলের মানুষকে দেয় দাঁড়াবার শক্তি। জোগায় তার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানকে এক সূত্রে নিয়ে আসার প্রেম ও প্রণোদনা। দেশপ্রেম-জাতিপ্রেমজনিত আবেগের আঁতুড়ঘর হলো জাতীয়তাবাদ। কিন্তু সেই জাতীয়তাবাদেরও রয়েছে এপিঠ-ওপিঠ। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কট্টর চিন্তা ভাবনা, কর্ম-আদর্শ যুক্ত হলে সেটা হয়ে ওঠে ভয়ংকর। তখন জাতীয়তাবাদ পরিগণিত হয়ে স্রেফ আফিমে। জাতীয়তাবাদের নেশায় বুঁদ করে সেই জাতিকে অন্ধকারে রাখার সব ছলাকলা জারি রাখা হয়। এ কারণে জাতীয়তাবাদের নির্মোহ পাঠ জরুরি। কেবল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নয়, সব ধরনের শিক্ষায় জাতীয়তাবাদের পঠন-পাঠন বাধ্যতামূলক হওয়া দরকার। জাতীয়তাবাদ অনেকাংশে কিংবা সর্বাংশে স্বাস্থ্যের মতো। স্বাস্থ্যই যেমন সকল সুখের মূল। তেমনি জাতীয়তাবাদই জাতি গঠনে-দেশপ্রেমের প্রশ্নে মৌল এক আধারবিশেষ। এ সত্য অস্বীকার, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা কিংবা এড়িয়ে হয়তো যাওয়া যায় চাইলেই কিংবা সহজেই। কিন্তু এতে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে করণীয় কী—সেই প্রশ্নের ফয়সালা হয় না।
জাতীয়তাবাদ কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং একটা জাতির জন্য চাবিকাঠি বিশেষ, তা পরিষ্কার করে বুঝতে হলে আমাদের উন্নত বিশ্বের দিকে গভীরভাবে খেয়াল করতে হবে। বিশেষ করে যে দেশগুলো পৃথিবী নামক গ্রহের মোড়লিপনার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে তাদের দিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জার্মানি, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর দিকে লক্ষ করলে এবং তাদের ভেতরে-বাইরের পথ ও পন্থা কী সেটা বুঝলেই বিষয়টি স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়। চীনের কথাই ধরা যাক, চীনের একটা সমাজতান্ত্রিক পরিচয় কাঠামো দাঁড় করানো হলেও কিংবা একদা সেটা দাঁড়িয়ে গেলেও চীন প্রকৃতার্থে জাতীয়তাবাদের শক্তিতে বলিয়ান এক দেশ। চীনে যদি সমাজতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও কিছুটা থাকে সেটা হলো তার জাতীয়তাবাদী সমাজতন্ত্র বৈ অন্য কিছু নয়।
বিশ্বে আধিপত্যে সবার ওপরে থাকা দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যে দেশটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা বেড়েছে কয়েক গুণ। এবং গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে একক আধিপত্যের অধিকারী হয়েছে। সেই দেশটি আজকের এ পর্যায়ে এসেছে তার জাতীয়তাবাদ শক্তির জোরে। ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতালাভের পর তারা সেই ব্রিটেনকে কেবল ছাড়িয়ে যায়নি। পুরো বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হয়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদের শক্তি এতটাই শিকড়সন্ধানী ও সর্বপ্লাবী ছিল যে তারা ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর সবকিছুতেই তাদের থেকে ভিন্ন বা নতুন কিছু প্রতিষ্ঠা করেছিল। যেখানে যেখানে আলাদা হওয়া সম্ভব, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করা যায় সেখানে সেখানে তারা নিজস্বতা তৈরি করেছিল। এই যে আমরা একই ইংরেজি শব্দের দুই রকমের বানান রীতি দেখি, সেটা হয়েছে কেবল মার্কিন জাতীয়তাবাদের শক্তির জোরে। উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও এ সত্য প্রযোজ্য।
দুঃখজনক হলেও সত্য, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের জীবনকর্মে ও যাপনে জাতীয়তাবাদের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারেনি। তারা আন্দোলন, সংগ্রাম, লড়াইয়ে জাতীয়তাবাদকে কাজে লাগাতে সক্ষম হলেও স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তির যুদ্ধে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে পুঁজি করে এবং সেখান থেকে শক্তি আহরণের মধ্য দিয়ে বিজয়ী হলেও স্বাধীনতা লাভের পর যে চ্যালেঞ্জের পথে পা বাড়ানোর কথা সেখানে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে যতটা জাতীয়তাবাদ উচ্চারিত হয়, সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে জাতীয়তাবাদের মন্ত্র উচ্চারণ করে, সেভাবে জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে না। যেমনটা উন্মোচিত হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতায়। এরও আগে বিষয়টা পরিষ্কারভাবে ধরা পড়েছে কভিড-১৯ মহামারীর সময়ে। তখন আমরা দেখেছি টিকার জাতীয়তাবাদ। এখন দেখছি খাদ্য জাতীয়তাবাদ। এসবকে উড়িয়ে দেয়া যায় না, যৌক্তিক নয়, সম্ভবও হবে না কখনো। জাতীয়তাবাদের এ বাস্তবতাকে যারা বুঝতে অপারগ হয়েছে কিংবা গায়ের জোরে এড়িয়ে গেছে তাদের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি হয়ে দেখা দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকা। হালে নাম লিখিয়েছে পাকিস্তান। অন্যরা এখনো শ্রীলংকার মতো আইসিইউর বাসিন্দা না হলেও হাসপাতালমুখী অবস্থায় রয়েছে।
স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। এটা যে কেবল কথার কথা নয়, রুঢ় এক সত্য তার বোঝাবুঝির পুরোটাই নির্ভর করে কোনো দেশ ও তার পরিচালন প্রতিষ্ঠান এবং পরিচালকরা জাতীয়তাবাদের শক্তিকে কতটা দৃশ্যমান করতে পারল; কথায় নয়, কাজে রূপান্তর ঘটাল। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছে অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার প্রশ্ন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে না পারলে জাতীয়তাবাদ ফিকে হয়ে যায়। জাতীয়তাবাদের নামে তখন পয়দা হতে থাকে নানা কিছু। জাতীয়তাবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যত উপায় আছে তার সবটার জন্ম দেয়া হয় কিংবা দেদারছে করা হয় আমদানি। এ কারণে জাতীয়তাবাদের অগ্নিপরীক্ষায় পরাধীন দেশের যতটা সহজে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব, স্বাধীন দেশের ততটাই কঠিন। তবে অসম্ভব নয় মোটেই।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার প্রশ্নে যতটা সফল ও সার্থক হবে, তাদের জাতীয়তাবাদের প্রকৃতিও ততটাই নান্দনিক ও অর্থবহ হয়ে উঠবে। করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতায় এটা স্পষ্ট যে জাতীয়তাবাদের শক্তিকে প্রত্যাশিত মাত্রায় নিয়ে যেতে পারেনি অনেকেই। কিংবা অনেক দেশের পক্ষ থেকে চেষ্টাও হয়নি সেভাবে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অভ্যন্তরীণ সমস্যার জট খুলতেই নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি ক্ষয় করে চলেছে। তারা নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জাতির সম্মিলিত স্বরে রূপান্তর করতে পারেনি। কিংবা সেই চেষ্টাও করার সুযোগ পায়নি অথবা কসরত করেনি। বরং নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ জিইয়ে রাখতে তারা দেশের মধ্যে নানা বিভেদ ও বিভক্তির জন্ম দিচ্ছে। এ কারণে ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেক কিছুর পরিবর্তন হয় কিংবা নতুন করে শুরু হয়। তাদের এ স্বরূপকে অনেকাংশে চড়ুইভাতি খেলার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
অর্থনীতিতে আদানিকাণ্ডের মতো ভয়ংকর ব্যাপার সংঘটিত হওয়ার পরও ভারতে রাজনৈতিক দল বিজেপি যেভাবে ক্ষমতার মসনদে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করে তুলছে, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
আগামী বছরের শেষাশেষি ভারতের লোকসভা নির্বাচন। বড়জোর সময় আছে ১৫ মাস। এ বছর বেশ কয়েকটি প্রদেশে রয়েছে বিধানসভা নির্বাচন। যাকে বলা যেতে পারে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সবার জন্য লোকসভা নির্বাচনের ‘ড্রেস রিহার্সেল’।
বছরের প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজেপির সাফল্যকে চোখ ধাঁধানো বলা যায়। ২ মার্চ তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে ফলাফলের চিত্র—ত্রিপুরা, মেঘালয় ও নাগাল্যান্ডে ক্ষমতায় ফিরেছে বা আবারো ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি ও তার মিত্ররাই। পাশাপাশি চারটি উপনির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপনির্বাচনগুলোয় বিজেপি ও কংগ্রেস প্রায় সমান শক্তি নিয়ে লড়াই করেছে। এ নির্বাচন এমন একটা সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে যখন আদানিকাণ্ডে একের পর এক অভিযোগের তীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জেরবার অবস্থা। প্রায় এক মাস কিংবা তারও একটু বেশি সময় আগে থেকে আদানির বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে অর্থনৈতিক অসততার অভিযোগ উঠেছে। কংগ্রেসসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল মনে করে, এ অসততার পেছনে মোদির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। গুজরাটি ব্যবসায়ী আদানির এ উত্থানে মোদি নেড়েছে নেপথ্যের কলকাঠি। শুধু ভারতে নয়, ভারতের বাইরেও আদানি গ্রুপকে প্রতিষ্ঠার পেছনে মোদি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রতিদিনই একের পর এক দাবি এসেছে এ ব্যাপারে মোদির অবস্থান পরিষ্কার করার। কিন্তু মোদি কিছুই বলেননি। কঠিন এক নীরবতার মধ্যে নিজেকে নিয়ে গেছেন।
বিস্ময়কর হলো, এ বাস্তবতার মধ্যেও তিনটি বিধানসভার নির্বাচনে বিজেপি ভালো করেছে। তাহলে কি যে জাতীয়তাবাদ হাজির করেছে মোদি ও তার দল বিজেপি, তার প্রতি ভোটারদের রয়েছে বিশেষ কোনো পক্ষপাত? তা না হলে আদানিকাণ্ডের এ অবস্থার পরও কেন তাদের প্রতি ভোটাররা বিরূপ নয়। বিরোধী দলের ব্যর্থতাই কি তাদের বিজয়কে সুনিশ্চিত করেছে নাকি অন্য কোনো কারণ আছে। বিরোধী দল যে জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে, বহির্বিশ্ব যে জাতীয়তাবাদের আলোয় ভারতকে চেনে বা জানে কিংবা তাদের দীর্ঘদিনের বোঝাপড়ায় রয়েছে যার সমূহ অস্তিত্ব, সেই জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিরোধীদলীয় অপারগতাই কি বিজেপিকে বিজয়ের সুফল দিয়ে যাচ্ছে, তার উত্তর অন্বেষণ করা প্রয়োজন।
বিজেপি আদানিকাণ্ডকে তাদের পক্ষে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে বলেই কংগ্রেস বা বিরোধী দলের প্রচার-প্রচারণা ও হিনডেনবার্গ রিপোর্টকেও ভোটাররা আমলে নেননি। ভেতরে ভেতরে হয়তো জাগিয়ে দেয়া হয়েছে সেই জাতীয়তাবাদ, যা আদানিকাণ্ডকে তাদের পক্ষে ব্যবহারের মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠেছে। হিনডেনবার্গ রিপোর্টের আগে পর্যন্ত আদানি গ্রুপের গৌতম আদানি ছিলেন বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ধনী ও এশিয়ায় সবার সেরা। রিপোর্ট প্রকাশের পর এ অবস্থান নিম্নমুখী হতে থাকে। আদানির অবস্থান ক’দিনের ব্যবধানে বিশের নিচে নেমে যায়। তারপর নামে ত্রিশে। আরো নিচে নামলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে নতুন কিছু বিনিয়োগ পাওয়ায় আদানির বর্তমান অবস্থান বাইশে (৯ মার্চ ২০২৩)।
আদানির উত্থান পর্বকে এখন এ রকমভাবেও দেখা যেতে পারে, ভারত চাচ্ছিল তার দেশের একজন বিশ্বের শীর্ষ ধনী হয়ে উঠুক। বিজেপির মনোবাঞ্ছাও এমন। একজন সাধারণ ভারতীয় যাদের সংখ্যা শতকরা ৯০ শতাংশ, তারা যদি বিজেপির মনোবাঞ্ছা ও চাওয়াকে এক যুক্তিতে মেনে নেয়, তারপর আমলে নেয়। তাহলে তাদের দোষারোপ করার খুব বেশি সুযোগ রয়েছে কি? জাতীয়তাবাদের ভিত্তিটা হয়তো সেভাবেই প্রোথিত করেছে বিজেপি!
হোসেন শহীদ মজনু: বার্তা সম্পাদক, বণিক বার্তা










