সেদিন এক আত্মীয়া বলছিলেন, শাড়ি কেনা তার শখ। হতেই পারে, মানুষের শখের তো সীমা নেই। তাই সেটা দোষনীয় নয়। তবে আমি বুঝতে চেষ্টা করলাম—এর পেছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে কিনা? আলাপের এক পর্যায়ে জানলাম, কোনো শাড়ি পরে ফেসবুকে একবার ছবি দেয়ার পর সেটা আর পরতে ইচ্ছা হয় না! শাড়িটা হাতে নিলেই নিজেকে ‘গরিব গরিব’ মনে হয়। তাই এমন হীনম্মন্যতার হাত থেকে রক্ষা পেতেই তিনি নতুন শাড়ির প্রতি ঝুঁকেছেন! প্রিয় পাঠক, এটা কি সত্যিই তার নিজের নাকি সমাজের চাহিদা পূরণের চেষ্টা?
শিশুকে ব্যয়বহুল স্কুলে পড়ানো, অভিজাত এলাকায় বাসা নেয়া, প্রায়ই নামিদামি রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া, মাঝেমধ্যে গাড়ির মডেল বদলানো, আইফোনের নতুন ভার্সন জোগাড় করা, ব্যয়বহুল জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকীর অনুষ্ঠান করা, চেকআপের উদ্দেশ্যে বিদেশে ঘুরতে যাওয়া... এমনকি বেগম পাড়ায় বাড়ি কেনা। এ কাজগুলোর ঠিক কতটা আমরা নিজের প্রশান্তির জন্য করি আর কতটা সমাজে ‘মুখ রক্ষা’র জন্য?
এমন প্রবণতা শুধু উচ্চমধ্যবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং কিছুদিন আগে জানলাম আমাদের ভার্সিটি গেটের এক রিকশাওয়ালা তার ছোট ভাইকে ঢাকার এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেছেন। সে ‘মেধাবী’ ছাত্র। দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি। তাই বলে তার লেখাপড়া হবে না? এখন প্রতি মাসে সেই বড় ভাই-পরিচিতজনদের কাছে হাওলাত করছেন। মাঝেমধ্যে সাহায্য চাওয়ার কথাও শোনা যায়!
আবার এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাপ্রহরী তার ছেলেকে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করার পর আমার কাছে দোয়া চাইলেন। সংসার কীভাবে চলবে—এমন জিজ্ঞাসার জবাবে বললেন, এখন থেকে এক শিফটের পরিবর্তে তিনি দুই শিফট ডিউটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন! আকস্মিক চাকরি চলে গেলে বা তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তখন কী হবে—সেই প্রশ্ন করার সাহস পেলাম না।
আমার পরিচিত এক ব্যক্তির সন্তানকে অলরাউন্ডার বানানোর ফিরিস্তি শুনেই আমি ক্লান্ত বোধ করি। একান্ত আলাপে জানতে চাইলাম— ছোটবেলা আপনি মনেপ্রাণে কী হতে চাইতেন? তিনি বললেন, একজন ভালো ছাত্র হওয়া ছিল আমার চাওয়া। স্কুলে ও এলাকায় সবাই আমাকে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হিসেবে চিনবে—সেটাই ছিল আমার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। তখন জানতে চাইলাম, তার বাইরে খেলাধুলা বা গান-বাজনা কিছু করতেন? তিনি বললেন, করতাম তবে সেগুলো নিতান্তই মজা পাওয়ার জন্য। কখনো সিরিয়াসলি ট্রাই করিনি।
তখন বললাম, তাহলে আপনার ছেলেটাকে ‘অলরাউন্ডার’ বানানোর এ অসম্ভব মিশনে নেমেছেন কেন? তাকে ক্লাসে ফার্স্ট, ক্রিকেটে সেরা, কারাতে ব্ল্যাক বেল্ট, কম্পিউটার কোডিং, চিত্রাঙ্কনে পুরস্কার পেতেই হবে কেন? আসলে সে কি এর কোনোটাই পছন্দ করে, কাজটা করতে ভালোবাসে? তিনি বললেন, সে তো আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গেমস খেলতে চায়! তাহলে সেই সন্তানের পেছনে প্রতি মাসে এতগুলো টাকা খরচ করছেন কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বললেন, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের চাপে চাইলেও সেগুলো বাদ দিতে পারছেন না! বহু পরিবার ঋণদেনা করে হলেও এমন খাতে ‘বিনিয়োগ’ অব্যাহত রেখেছেন!
আমাদের শৈশবে মানুষ ছিল সঞ্চয়মুখী। আমাদের বাড়িতে একটা ঘরে সারা বছরের জন্য দরকারি ধান, গম, ডাল মজুদ থাকত। একবার জিজ্ঞাসা করলে আব্বা বলেছিলেন, কোনো বিপদ-আপদে পরিবারের সদস্যদের খাওয়া নিয়ে যেন দুশ্চিন্তায় পড়তে না হয় সেজন্য ওই ব্যবস্থা। তখন মানুষ নিজেদের আয় থেকে অতি সামান্য হলেও সঞ্চয় করতেন। হঠাৎ এক প্রজন্মের ব্যবধানে আমরা এতই আধুনিক হয়ে গেলাম যে নির্ধারিত আয় দিয়ে আর মাস চলছে না। যাদের সুযোগ আছে তারা উপরি আয়ের ধান্ধা করছে। তা বৈধ নাকি অবৈধ তাও ভাবার সুযোগ পাচ্ছে না। আর যাদের তেমনটা সুযোগ নেই তারা ঋণের ভারে হচ্ছে জর্জরিত!
এমন চক্করে পড়ে আজীবন সৎ বলে জানা অনেক মানুষকে লোকজন হঠাৎ আবিষ্কার করছেন চরম ‘অসৎ’ বলে। আজকাল আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে সৎ মানুষ খুব দুর্লভ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি হতাশা থেকে রেহাই পেতে মাদকাসক্তি বা অনলাইনে জুয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কাজে নিজেকে জড়াচ্ছে। সুদিন থাকতে বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব হয় না। কিন্তু দুঃসময়ে কেউ তার পাশে দাঁড়ায় না। চরম হতাশ ব্যক্তিটি একসময় নিজে অথবা সপরিবারে আত্মাহুতির পথ বেছে নেয়! অথচ তার ব্যয়ের অনেকগুলো খাতই হয়তো জীবনের জন্য অপরিহার্য ছিল না।
শহুরে শিক্ষিত বহু মানুষ ইদানীং সাবলীলভাবে ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া’র পথে হাঁটছে। নানা সংকটে তাদের অনেকের আয় কমছে। ফলে ক্রমশ ঋণের বোঝা বাড়ছে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের সেগুলো জানাতে সংকোচ বোধ করে। তারাও বাস্তবতা আঁচ করতে পারে না। তারা ভাবে সবকিছু আগের মতোই চলছে। এছাড়া সমস্যা হলে পরিবারের কর্তাব্যক্তি ঠিকই ম্যানেজ করতে পারবে, সেই ‘ম্যাজিক’ তার জানা আছে! কিন্তু ম্যাজিকম্যানের নিজের হতাশার কথা বলার মতো মানুষ খুব একটা অবশিষ্ট থাকে না!
অথচ তিনি এখনো নিজের সবটা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমস্যাগুলো মেটাতে তৎপর রয়েছেন। প্রতিনিয়ত সবকিছু ঠিকঠাক থাকার ‘অভিনয়’ করছেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, অনেকে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। কেউ কেউ বিনা নোটিসে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের অজুহাতে পরপারে পাড়ি জমাচ্ছেন। অথচ সংকটের সূচনালগ্ন থেকে যদি তারা আয় বুঝে ব্যায়ের পথে হাঁটতেন, পরিবারের সদস্যদের বাস্তবতা বুঝিয়ে তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অভ্যস্ত করতেন, তবে হয়তো পরিবারে এমন দুঃসময় আসত না।
যিনি একসময় অন্যদের ব্যাকডেটেড ভেবে নিজের পরিবারকে অগ্রসরদের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন, এখন দেখছেন অন্যরা এগিয়ে গেলেও তিনি যেন চোরাবালিতে আটকে গেছেন! বলতে পারেন, সবাই কি তেমনভাবে খেই হারায়? না, তবে যারা আর্থিক গ্যাঁড়াকলে পড়েন না তাদেরও কোথায় যেন ছন্দপতন ঘটে। যা অর্জনের জন্য জীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করেন, শেষমেশ অনেকেরই হিসাবটা মেলে না! পরিচিতজন কিংবা আত্মীয়-স্বজন ভাবে তিনি সফল হয়ে পিরামিডের চূড়ায় বসে আছেন। কিন্তু তারা জানে না যে সেই ব্যক্তিটি পিরামিড উল্টে নিজের মাথায় বয়ে চলেছেন! এ ভার কতক্ষণ বয়ে নেয়া সম্ভব তা কেউ জানে না; এমনকি সেই ভিক্টিমও নয়!
এ যেন গল্পের সেই মা কাঁকড়ার দশা। সন্তানরা নিজেদের ক্ষুধা নিবৃত্তি ও শারীরিক বৃদ্ধির জন্য মায়ের শরীর ভেতর থেকে খাওয়া শুরু করে। একপর্যায়ে তারা স্বাবলম্বী হয়। তখন হেঁটে নিজ নিজ আহার খুঁজতে বেরোয়। মায়ের কঙ্কাল সেখানেই পড়ে থাকে! আমাদের চারপাশে এমন কত কঙ্কাল যে বিচরণ করছে তা খোদাই মালুম। এভাবে কত মানুষ যে তথাকথিত ‘সামাজিক সনদ’-এর আশায় নিজের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে ফেলছে—কে তার হিসাব রাখে? লক্ষণীয় ব্যাপার হলো ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষকে দেখার পরও আমরা অহরহ তেমন প্রতিযোগিতায় নাম লেখাচ্ছি, তাই না?
আসলে চাহিদা বিষয়টা কী? আপনার কোনো বস্তু পেতে ইচ্ছা হলেই কি তার চাহিদা রয়েছে বলে ধরা হবে? না, বরং সেটা কেনার সামর্থ্য থাকতে হবে। সেই সামর্থ্য আবার অস্তিত্ব বিলীন করে নয়। যেমন হমায়ূন আহমেদ তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন: একবার তার বাবা পুরো মাসের বেতনের টাকা দিয়ে একটা ঘোড়া কিনে বাড়ি ফিরলেন। সেটা দেখে সন্তানরা মহাখুশি। কিন্তু তাদের মা ছিলেন ভীষণ চিন্তিত। কারণ তিনি ভাবছিলেন, পুরো মাস চলবে কেমন করে?
যারা আমাদের নিত্যদিন নানা পণ্য ভোগের মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করার প্রলোভন দেখায় এটা ভাবা কিন্তু তাদের দায়িত্ব নয়। এমনকি অর্থ না থাকলে সাময়িক বাকি দিয়ে হলেও তারা আপনাকে পণ্যটি ভোগ করাতে চায়। কারণ এর মধ্যে তাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এখন আপনার অর্থের জোগান কীভাবে হবে সেটা আপনাকেই ভাবতে হবে। সামগ্রিক কল্যাণের বিষয়টি একান্তই আপনার, তাই না?
বলতে পারেন জীবনে বড় কিছু করতে হলে ঝুঁকি তো নিতেই হবে। কথা ঠিক আছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে ওয়ারেন বাফেটের সেই উপদেশটি স্মর্তব্য—Never test the depth of the river with both the feet. কারণ উল্লিখিত ঝুঁকি নেয়ার পর অনেকেই আকস্মিক দুর্ঘটনায় পড়েছেন, পরিবারে কারো জটিল রোগ হয়েছে, মামলায় জড়িয়েছেন, কর্মরত প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা তার নিজের চাকরি হারিয়েছেন... এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মুখ লুকানোর পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।
খুব ছোটবেলায় শোনা এক গল্প দিয়ে শেষ করি। সে বহুকাল আগের কথা। তখন গ্রাম্য কিশোরীদের বোধবুদ্ধি হওয়ার আগেই বিয়ে হতো। এমন এক বালিকা শুধু গামছা পরে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলছিল। হঠাৎ বয়স্ক এক লোককে সেদিকে আসতে দেখে তার দাদি বলল, এই তোর শ্বশুর আসছে। সে তখনো শ্বশুর বিষয়টা বুঝত না। তাই কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। তখন দাদি বলল, তাড়াতাড়ি মাথায় কাপড় দে। তার পরনে ছিলই একটা মাত্র গামছা। তড়িঘড়ি করে সেটা খুলে মাথায় (ঘোমটা) দিল!
আশপাশের সবাই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কিন্তু সে বুঝতে পারছে না—সমস্যাটা কোথায়? আমরা অনেকেই তেমন অন্যের কথায় ভালো থাকতে গিয়ে, সমাজের প্রত্যাশামাফিক চলতে গিয়ে কখন যে বেইজ্জত হয়ে যাচ্ছি তা ঠাহর করতে পারছি না! তাই সময় থাকতে সাধু সাবধান।
ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘সুখের অসুখ’ বইয়ের লেখক





