অনেক দিন আগের কথা। ট্রেনে টিটিই টিকিট চেক করছেন। কারো টিকিট না থাকলে তাকে বড় জরিমানা করছেন। এ অবস্থা দেখে এক ধূর্ত লোক পকেট থেকে এক ডাকটিকিট বের করে থুথু দিয়ে সেটা নিজের কপালে লাগিয়ে নিলেন। বাবু এসে টিকিট চাইলে কপালের দিকে ইঙ্গিত করলেন। তখন টিকিট চেকার বললেন, এটা তো চিঠি যাওয়ার টিকিট! এটা দিয়ে আমি কী করব?
তখন সেই যাত্রী খুব জ্ঞানীর মতো ভাব করে বলল, এ টিকিটে একটা চিঠি যদি দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে পারে তাহলে আমি কেন মাত্র দুটো স্টেশন যেতে পারব না? এমন লোককে কীভাবে শিক্ষা দেয়া যায় তা ভাবতে ভাবতে টিটিই পাশের জনের কাছে টিকিট চাইল। সে খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল—বাবু আমি বেয়ারিং (অর্থাৎ চিঠি গ্রহণকারী ডাকমাশুল পরিশোধ করবে)!
এমন পরিস্থিতিতে টিটিই পা থেকে জুতা খুলে সেটার গোড়ালি দিয়ে ওই দুই যাত্রীর কপালে জোরে জোরে কয়েক ঘা লাগিয়ে দিলেন! তারা তখন চীৎকার করে বলতে থাকলো—বাবু করেন কী, করেন কী? তিনি খুব শান্তভাবে বললেন, পোস্ট অফিসের সিল না দিলে চিঠি যাবে কেমন করে? তাই তোমাদের সিল মেরে দিলাম! একেই বুঝি বলে, যেমন বুনো ওল তেমনি বাঘা তেঁতুল!
শিরোনামের সঙ্গে গল্প মিলছে না, তাই তো? আসলে আমার প্রশ্নটা অন্যখানে। সেটা হলো—এ গল্প পড়ে আপনি যেমন মজা পেলেন, এখনকার কোনো কিশোরও কি সেটা পাবে? অবশ্যই না। কারণ চিঠি, ডাকটিকিট, বেয়ারিং এ শব্দগুলো তাদের কাছে প্রায় অপরিচিত। কিন্তু আমাদের শৈশবে এগুলো ছিল হরহামেশা শোনা ও জানা বিষয়। একেকটা চিঠি লেখা ও পড়ার যে গভীরতা ছিল তা এখন ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। তাহলে কে মাত্র এক প্রজন্মের ব্যবধানে এ বিষয়গুলোকে ‘অচল’ করে ফেলল?
আসলে শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রির) যতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে তাদের অন্যতম হলো ধ্বংসাত্মক সৃষ্টি! অর্থাৎ নতুন কিছু সৃষ্টির মাধ্যমে জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে আমরা অনেক কিছু ধ্বংসও করে ফেলি। বোঝার সুবিধার্থে বর্তমানে আধুনিক জীবনের অপরিহার্য উপাদান স্মার্টফোনের কথাই ধরি। এ বস্তুটা যতই উন্নত হচ্ছে আমাদের চারপাশের অসংখ্য শিল্পকে ততই তছনছ করে ফেলছে! যাদের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি বা তারও বেশি তারা পার্থক্যটা খুব ভালো ধরতে পারবেন।
তাহলে যার বস্তুগত খাত ধ্বংস করার ক্ষমতা এত বেশি তা কি ব্যক্তির জন্য শুধুই কল্যাণকর? অনেকের মতে, এ বস্তুটির মানুষের ক্ষতি করার ক্ষমতা আরো বহুগুণ বেশি। এত শক্তিশালী বস্তু এখন সবার হাতে হাতে—শিশু-বৃদ্ধ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, গ্রাম-শহরে বাস করা ব্যক্তি নির্বিচারে। ফলে তা থেকে এর ব্যবহারকারী সমৃদ্ধ হবে নাকি ক্ষতিগ্রস্ত তার পুরোটাই নির্ভর করছে এর ব্যবহারের ধরনের ওপর।
এরই মধ্যে তথাকথিত স্মার্টফোন বিপুলসংখ্যক মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে (ধ্যান-জ্ঞান-সাধনার বস্তুতে) পরিণত হয়েছে। আশপাশের মানুষ, চলমান মিটিং, নাওয়া-খাওয়া-ঘুম সবকিছুর থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে হাতের ওই যন্ত্রটি। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, তা থেকে ঠিক কী অর্জনের জন্য এত নিবিড় মনোযোগ?
সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। তবুও তার সান্নিধ্যে থাকতে মরিয়া। কাছে না পেলে অস্থির এমনকি ক্রেজি হয়ে উঠছে। শুধু কোয়ালিটি ঘুমের অভাবে কত মানুষ যে অসুস্থ হয়ে পড়ছে তা অনুমান করাও মুশকিল। তার পরও প্রতি রাতেই ঘুমাতে দেরি হয়ে যায়। ঠিক কী অর্জনের জন্য সেই রাতজাগা তা ব্যবহারকারী বা আশপাশের মানুষগুলোর কাছে মোটেই স্পষ্ট নয়।
জীবনকে বলা হয় সময়ের সমষ্টি। তাহলে এ যন্ত্রটি প্রতিদিন আমাদের বিপুল পরিমাণ সময় নষ্ট করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আমাদের জীবনকেই ধ্বংস করছে। অনেকটা স্লো পয়জনের মতো। আমাদের শরীর ও মনের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা রোধ করা যাচ্ছে না। উঠতি প্রজন্মের ওপর এর প্রভাব আরো ভয়াবহ। রাস্তায় যে কিশোরদের ঘুরতে দেখি তাদের সিংহভাগের চুল কাটা টিকটক ও লাইকি স্টারদের মতো!
অর্থাৎ তারা মা-বাবার পছন্দকে উপেক্ষা করে আজ টিকটকারদের মতো করে চুল কাটছে। কাল বিশেষ আদর্শ বা বস্তুতে আসক্ত হবে। পরশু লাইফ পার্টনার নিয়ে বাসায় আসবে। এভাবে সামাজিক প্রথা ও রীতিগুলো তো আগেই শিথিল (বহুলাংশে অকার্যকর) হয়েছে। এখন পরিবারগুলোও হুমকির মুখে পড়ছে। এক যন্ত্রের দাপটে নানা পক্ষ অসহায় হয়ে পড়ছে।
সহজে যোগাযোগ করার ক্ষমতা অনেককে রীতিমতো ‘ক্রেজি’ করে তুলছে। অপ্রয়োজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যদের সঙ্গে কথা বলছে। অচেনা-অজানা মানুষের পাতা ফাঁদ বা খপ্পরে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ফোনে পরিচয় হওয়া মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রতারিত বা জিম্মি হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। অনেকে নানা রকম হয়রানির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঘটনাও গণমাধ্যমে আসছে!
আসলে অতি ক্ষমতাসম্পন্ন কোনো প্রযুক্তি কারো হাতে দেয়ার আগে সেটা পরিচালনা, তার অপব্যবহারে ক্ষতির সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। নইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেমন অবাধে অস্ত্র কেনার সুযোগ তার অপব্যবহার বাড়াচ্ছে, নিরীহ মানুষ ক্ষতির শিকার হচ্ছে...আমাদের ক্ষেত্রেও তেমনটা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই যেমন রিকশার কথাই ধরা যাক। সেটা তৈরি হয়েছে মানুষের পা দিয়ে চালানোর জন্য। এখন অন্য সব বৈশিষ্ট্য একই রেখে তাতে শুধু মেশিন যুক্ত করলে যে গতিতে সেটা চলে তা ধারণ করার জন্য এর যন্ত্রপাতি কি আদৌ প্রস্তুত? না, মোটেই তা নয়। ফলে ইদানীং রিকশায় দুর্ঘটনার হার ও ক্ষতির মাত্রা বেড়েছে। আজকাল অত্যাধুনিক অধিকাংশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটছে।
একসময় টেলিভিশনকে বলা হতো শয়তানের বাক্স। টেলিভিশনের শুধু একটা যোগ্যতা ছিল। সেটা হলো ছবি ও শব্দকে দূরবর্তী স্থানে পাঠানো। সেই তুলনায় স্মার্টফোনকে কী বলা যায়? তা প্রকাশের মতো জুতসই শব্দ বুঝি এখনো ডিকশনারিতে যুক্ত হয়নি, তাই না? এখানে শুধু একটা প্রযুক্তিপণ্য নিয়ে কথা হলো। তাহলে স্মার্টওয়াচ, স্মার্টটিভি, জীবাণু অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র এমনকি পরমাণবিক বোমার মতো সৃষ্টিগুলো কী মাত্রায় ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নিয়ে বসে আছে তা ভাবা যায়?
ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘সুখের অসুখ’ বইয়ের লেখক





