খুব সম্ভবত ১৯৯৮ সালের কথা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির জার্নাল সেকশনে বসে একটি অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করছিলাম। হঠাৎ একটা আর্টিকেল খুব ভালো লাগল। সংগ্রহে রাখার লক্ষ্যে সেটা ফটোকপি করলাম। পরে আমার এক সহপাঠীকে সে প্রসঙ্গে বলতেই সে লেখকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল। সঙ্গে আরো জানাল—হাতেগোনা যে ক’জন সিএসপি অফিসার মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মুজিবনগর সরকারকে শক্তিশালী করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম। তাছাড়া তিনি বেশকিছু বই লিখেছেন যেগুলো তথ্যবহুল ও সুখপাঠ্য। আমার বন্ধু এত কিছু জানে অথচ আমি আজ (সেদিন) তার নাম প্রথম জানলাম! বিষয়টাতে খুব অবাক হলাম। তখন বন্ধু কিবরিয়া জানাল, সে লেখক ও ডাকসাইটে আমলার বাড়ি তারই (ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর) উপজেলায়।

প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই এরই মধ্যে বুঝে গেছেন, খ্যাতিমান আমলা ও জনপ্রিয় নন-ফিকশন লেখক ড. আকবর আলি খানের কথা বলছি। সে ঘটনার পর থেকে তার বই, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সাক্ষাত্কার, টক শো ইত্যাদিতে মনোযোগী হতে চেষ্টা করেছি। এক্ষেত্রে আরেকটি কারণ বিদ্যমান। সেটা হলো—আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, আমি বাংলা সাহিত্যের কোন লেখক ধারা বিশেষভাবে অনুসরণ করতে চেষ্টা করি কিনা? সেক্ষেত্রে আমার জবাব হলো—সৈয়দ মুজতবা আলী ও আকবর আলি খানের কাছ থেকে লেখার ধরন বুঝতে চেষ্টা করি। তার পর নিজের মতো করে সেগুলো উপস্থাপনে সচেষ্ট হই।

ফলে আকবর আলি খানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ পড়ার আগ্রহ প্রবল হবে সেটাই স্বাভাবিক। সাধারণত পছন্দের বইগুলো যখন যেখানে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি। তার পর নিজের মতো ক্রম তৈরি করে সেগুলো পড়তে থাকি। সে ধারাবাহিকতায় বেশ আগে কেনা দুটি বই সম্প্রতি পড়া শেষ করেছি। তার একটি হলো সদ্যপ্রয়াত, সাবেক নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার রচিত ‘আমলার আমলনামা’ এবং আলোচ্য লেখকের আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ড ‘পুরানো সেই দিনের কথা।’ আজকের নিবন্ধে পরের বইটির পাঠক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চেষ্টা করছি।

যদি জানতে চান—বইটি পড়তে কেমন লাগল? এক কথায় জবাব দেয়া মুশকিল। কারণ তার মতো কুশলী লেখকের হাতে যেকোনো লেখাই প্রাণ পায়। সেখানে বিষয়বস্তু যদি নিজের সমগ্র জীবনের সঞ্চিত আবেগ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা হয়, তবে প্রশংসা ছাড়া অন্য কোনো কথা বলার সুযোগ খুব একটা থাকে না। তবে পুরো বইয়ে কোথায় যেন একটা ‘কিন্তু’ রয়ে গেছে! ফলে সত্যি কথা বলতে কী— আমার অনুভূতি ছিল মিশ্র। এক কথায় অনন্য বা অভাবনীয় বলাটা আমার জন্য একটু কঠিন। কেন এমনটা মনে হলো?

আচ্ছা, আপনার কি জানা আছে কোনো পণ্য থেকে একজন ক্রেতা ঠিক কতটা সন্তুষ্ট হবেন তা কিসের ওপর নির্ভর করে? পণ্যের গুণগত মান, তাই না? না, সেটা খুব আপেক্ষিক ব্যাপার। কারণ সদ্য দেখা একটা মুভি সম্পর্কে আপনি ও আপনার বন্ধু ঠিক বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন। একই পণ্য উপভোগ করে দু’জনের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হলো কেন? মার্কেটিংয়ের ব্যাখ্যা হলো—সন্তুষ্টি মূলত নির্ভর করে সেই পণ্যের কাছে ‘সংশ্লিষ্ট ক্রেতার প্রত্যাশা’র ওপর। আমরা কোনো পণ্য ভোগের আগে বা ভোগকালে অসংখ্য ফ্যাক্টর আমাদের প্রত্যাশার পারদ ওঠানামা করায়। ফলে শেষ পর্যন্ত তা সন্তুষ্টি দিয়ে শেষ হবে কিনা তা নির্ভর করে সর্বোপরি আশাতীত কিছু পেলাম কিনা, তার ওপর।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে—বইটি পড়ার শুরুতে আমার প্রত্যাশা কেমন ছিল? তা তিনটি তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করি। প্রথমত, নীরস বিষয়কেও যে সাবলীল ও সহজবোধ্য উপস্থাপন করা যায় এ ব্যাপারে আলোচ্য লেখকের মুনশিয়ানা সর্বজনবিদিত। দ্বিতীয়ত, প্রথমা প্রকাশন এরই মধ্যে বেশ কিছু সাহসী কাজ করেছে। ফলে অন্য প্রকাশকেরা যা প্রকাশ করতে দশবার ভাবে, প্রথমা তা অনায়াসে ছাপার অক্ষরে পাঠকের সামনে হাজির করতে পারে।

তৃতীয়ত, লেখক ভূমিকায় যখন জানালেন, তার আত্মজীবনী তিনি দুই খণ্ডে লিখেছেন। প্রথম খণ্ড (১৯৪৪—১৯৭৪) এখন প্রকাশ করলেও দ্বিতীয় খণ্ডটি ঠিক কখন প্রকাশিত হবে তা তিনি সংশ্লিষ্টদের বলে যাবেন! এক্ষেত্রে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’-এর রেফারেন্স টেনে তিনি পাঠকের প্রত্যাশা আরেক ধাপ উঁচুতে নিয়ে গেছেন। তাছাড়া এ খণ্ডে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সর্বোপরি—তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন। বরং এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছেন। ফলে তার লেখায় এমন কিছু থাকবে যা বারবার পাঠককে ভাবাবে, চিন্তার খোরাক জোগাবে, এমন সব ভাবনা নিয়েই বইটি পড়তে শুরু করি।

পড়া শেষে প্রত্যাশা কতটা পূরণ হলো, তাই তো? প্রথমত, আমি খুব কনফিউজড হয়েছি এ পাণ্ডুলিপিটি ঠিক কোন সময়ে রচিত সে ব্যাপারে। যদিও তিনি ভূমিকায় ইঙ্গিত দিয়েছেন হাল আমলে কাজটি করার। কারণ নিজ হাতে লেখা বা টাইপ করার সমস্যা তুলে ধরে বলেছেন, প্রথমার এক সার্বক্ষণিক সহযোগী তাকে এ কাজে সাহায্য করেছেন। যদি তাই হয় তবু বিষয়টাকে আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে! এমনকি আমার এক সহকর্মীর সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করলে তিনি বলেন, হয়তো তিনি বহু আগ থেকে বিস্তারিত ডায়েরি লিখতেন। না হলে এত বিস্তৃত তথ্য স্মৃতি থেকে লেখা অসম্ভব! এমনকি সেখানে এমন অসংখ্য তথ্য রয়েছে, যা এখন চাইলেও সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। ফলে ধারণা করছি, তিনি গত চার-পাঁচ দশক এ বইয়ের বিষয়বস্তু সংগ্রহ করেছেন, নোটস রেখেছেন।

এখন কথা হলো তিনি এত কষ্ট করে যে তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন তা আকবর আলি খানের পাঠক হিসেবে আমাকে কতটা আলোকিত, পুলকিত বা সমৃদ্ধ করেছে? দুঃখিত, খুব বেশি নয়। কারণ তিনি জীবনের কোন স্তরে প্রশিক্ষণের সময় সহপাঠী কারা ছিলেন, প্রশিক্ষক কারা ছিলেন, তাদের বিস্তারিত তথ্য জানার ব্যাপারে খুব সংগত কারণেই আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। তাছাড়া আমি যাদের চিনি না তাদের বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ পড়াকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। একজন ‘অজ্ঞাত’ ব্যক্তি কোন সময় চাকরিতে প্রবেশ করেছেন, একাডেমিক রেজাল্ট কেমন ছিল, কোথায় পিএইচডি করেছেন ইত্যাদি বিষয়ে পাঠকের খুব বেশি আগ্রহ থাকার কথা নয়।

তবে হ্যাঁ, তিনি ভবিষ্যৎ আমলাদের জন্য সে বিষয়গুলো দিকনির্দেশনা হিসেবে লিপিবদ্ধ করতে পারেন। একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার কাছে কিছু অধ্যায় তথ্যভারে জর্জরিত মনে হয়েছে। তার চেয়ে সেগুলোর সারমর্ম বলে নিজের অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণে বেশি জোর দিলে ভালো লাগত। কারণ তার চোখ দিয়ে দেখা ঘটনার শুধু দৃশ্যমান বর্ণনা আমরা শুনতে চাই না। বরং সে ঘটনা বা পরিস্থিতির মধ্যে যে শিক্ষাগুলো লুক্কায়িত ছিল তার নির্যাস লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল। কিছু ক্ষেত্রে তার ঘাটতি ছিল লক্ষণীয়। ফলে মাঝেমধ্যে পড়া অব্যাহত রাখা কষ্টকর হয়েছে।

অন্যদিকে কেন যেন মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন বর্ণনায় আরো গভীরে যাওয়ার সুযোগ ছিল। খুব সম্ভবত তিনি ইচ্ছা করেই অনেক কিছু এড়িয়ে গেছেন। এর অন্যতম কারণ হতে পারে, যারা তার বর্ণনায় উঠে আসতে পারত তারা অনেকেই এখনো জীবিত রয়েছেন। ফলে সে পর্যায়ে তিনি একান্তই নিজের ও ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্টদের বর্ণনা দিয়ে শেষ করেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের একজন দায়িত্বশীল পর্যবেক্ষক ও সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে সে সময়কালকে যেভাবে মোটের ওপর মূল্যায়ন ও উপস্থাপন করেছেন তাতে একজন অনুরাগী পাঠক হিসেবে তৃষ্ণা পুরোপুরি মেটেনি। হতে পারে তার প্রতি আমার মুগ্ধতা বা প্রত্যাশা বেশি থাকার কারণেই এমনটা হয়েছে। তাছাড়া সে সময়ের কিছু নগণ্য ঘটনাকেও ক্ষেত্রবিশেষে উল্লেখ করেছেন যেগুলো এড়িয়ে গেলে বোধ হয় ভালো হতো।

যাহোক, তার ব্যক্তি জীবনের একটি বিষয় আমাকে খুবই স্পর্শ করেছে। একই বছরে (২০১৬ সালে) অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি তার স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা নেহরীন খানকে হারিয়েছেন। তাদের শোক স্বভাবতই তাকে মূহ্যমান করার কথা। তার পরও তিনি লেখার ধারা সচল রেখেছিলেন। তিনি নিজ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার উজাড় করে ভবিষ্যতে আমাদের আরো সমৃদ্ধ করেছেন। তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে আমরা জ্ঞানের এক উৎসকে হারালাম।

 

ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘সুখের অসুখ’ বইয়ের লেখক