রুচি নিয়ে বিস্তর কথা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ‘ভার্চুয়াল’ বন্যা বয়ে যাচ্ছে এর পক্ষে-বিপক্ষে। বেদনার বিষয় হলো, এ বিতর্কে শামিল হয়ে আমরা নিজেরাও সুরুচির পরিচয় দিচ্ছি কি? রুচি কী? রুচি কীভাবে নির্মিত হয়? রুচিকে শক্তভিত্তির ওপর দাঁড় করায় কোন সে প্রপঞ্চ? রুচির সঙ্গে দুর্ভিক্ষের সম্পর্ক সুনিবিড় বলেই আমাদের যাপিত জীবনের সঙ্গে ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ কথাটি না চাইলেও জড়িয়ে যায়। আর বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে এসেও আমরা রুচির পরিচয় দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। সেক্ষেত্রে ‘সুরুচি’ তো রীতিমতো কল্পনাবিলাস—অন্ধের হাতি দেখার শামিল।
দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ দিয়েই আলাপ এগিয়ে নেয়া যাক। এই ভূগোলের মানুষের দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা দুটো। যা হয়েছিল অবিভক্ত ভারতবর্ষে, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায়। প্রথমটা ইংরেজ উপনিবেশের একেবারে শুরুর দিকে, দ্বিতীয়টা তাদের বিদায়ের একেবারে শেষাংশে। দুটো দুর্ভিক্ষকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে ‘ভিন্ন রঙ’ লাগানোর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের সত্য হচ্ছে, এর জন্য দায়ী ব্রিটিশ শাসনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অদক্ষতা, প্রশাসনিক অযোগ্যতা এবং শোষণমূলক নীতিগুলো।
প্রথম দুর্ভিক্ষ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ হিসেবে সব মহলে পরিচিত। ওই দুর্ভিক্ষে অবিভক্ত বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এর আগে বাংলায় কখনো এ রকম তো নয়ই, কোনো দুর্ভিক্ষই দেখা দেয়নি। তখনো বাংলার শাসনক্ষমতা ব্রিটেনের সরকারের হাতে যায়নি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে। সে সময় শুধু প্রশাসনিক শাসন ও শোষণের কারণে বাংলাজুড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়।
ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার শাসনক্ষমতার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে বাংলায় আবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময়ও শাসকদের চিরচেনা চেহারা প্রকাশ পায়। তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দুর্ভিক্ষের কারণ বলে চিহ্নিত করে। যখন কলকাতার রাস্তার অলি-গলিতে ভুখানাঙ্গা মানুষ একটু ভাতের ফেনের আশায় আহাজারি করে ফিরছে, ময়লা ফেলার ঝুড়ির মধ্যে মানুষ-কুকুর-শেয়াল-শকুন-কাক সামান্য খাবার খুঁজে পেতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। তখনো সরকারি গুদামগুলোয় খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুদ ছিল। সেগুলো জমিয়ে রাখা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্রিটিশ সৈনিকদের ভবিষ্যৎ খাবারের যেন সংকট দেখা না দেয়। শুধু উইনস্টন চার্চিলের ভুল নীতির কারণে অবিভক্ত বাংলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়।
চার্চিলকে বলা হয় সর্বকালের সেরা ব্রিটিশ, তিনি নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন। ব্রিটিশদের কাছে যিনি নায়ক হিসেবে বিবেচিত, বাংলার মানুষের কাছে আজও তিনি খলনায়ক হিসেবে পরিচিত। তিতাল্লিশের মন্বন্তরের ভয়াবহ দৃশ্য ধরা পড়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের রঙ-তুলিতেও।
দুর্ভিক্ষ নিয়ে গবেষণা করেছেন অমর্ত্য সেন। চিহ্নিত করেছেন দুর্ভিক্ষের কারণগুলো। ওই গবেষণায় তিনি সিদ্ধান্তে গিয়ে যে বিষয়টার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সেটা হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিশেষ করে মুক্ত গণমাধ্যম।
অমর্ত্য সেন মনে করেন, মুক্ত গণমাধ্যম থাকলে কোনো স্থানে, এলাকায়, অঞ্চলে বা দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না। তার যুক্তি হলো, দুর্ভিক্ষ হঠাৎ করে হয় না, রাতারাতি চাপিয়েও দেয়া যায় না। দুর্ভিক্ষের কিছু লক্ষণ থাকে। মুক্ত গণমাধ্যম থাকলে সে লক্ষণ দেখা দেয়া মাত্র ব্যাপারটা সবার নজরে চলে আসে। ফলে তৈরি হয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ। এমনকি শুধু স্থানীয় বা জাতীয় গণমাধ্যমের বদৌলতে বিষয়টা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বিষয়টা পুরো বিশ্ব জেনে যায়। আজকের বাস্তবতায় কোথাও ভূমিকম্প হলে যেমন মুহূর্তে সবাই জেনে যায় এবং নিজেদের সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়—ব্যাপারটা ঠিক তেমনই।
ভূমিকম্প যেহেতু হঠাৎ বা তাৎক্ষণিকভাবে সংঘটিত হয়। এর পেছনে মনুষ্যসৃষ্ট দায় থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে চালিয়ে দেয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দুর্ভিক্ষের পেছনে প্রকৃতির দায় থাকে না বললেই চলে। যতটুকু থাকে তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ওই দায় আপৎকালীন সময়ে গৃহীত জাতীয় ও আঞ্চলিক ব্যবস্থা দিয়েই প্রতিকার করা যায়। দুর্ভিক্ষের পেছনে থাকে মনুষ্যসৃষ্ট দায়। শাসক ও প্রশাসকদের ভুল নীতি, অদক্ষতা, অযোগ্যতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রিয়তা দুর্ভিক্ষকে অনিবার্য করে তোলে। যেমনটা হয়েছিল অষ্টাদশ শতকের শেষাশেষি ছিয়াত্তরে ও বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি তেতাল্লিশের মন্বন্তরে। অমর্ত্য সেন এ কারণে মুক্ত গণমাধ্যমের কথা বলেছেন সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে।
অমর্ত্য সেনের এ সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে নন্দিত ও প্রশংসিত হয়েছে। আমরাও যদি একটু গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে ব্যাপারটার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও গুরুত্ব বুঝতে পারব। ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে’ বাংলায় কোনো গণমাধ্যম ছিল না। ফলে সে দুর্ভিক্ষের বিপর্যয় ও সর্বনাশ ছিল ভয়াবহ, যা এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘তেতাল্লিশের মন্বন্তরে’ গণমাধ্যমের অস্তিত্ব থাকায় তার বিপর্যয় ভয়াবহ হলেও ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে’র মতো হয়নি। স্মরণ করা খুবই জরুরি যে সেই সময় গণমাধ্যম থাকলেও তা মুক্ত ছিল না। পরাধীন দেশ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে—এ অবস্থায় মুক্ত না হয়েও গণমাধ্যম যতটুকু অবদান রেখেছে তাতেই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতাকে ছিয়াত্তরের মতো সংঘটিত হতে দেয়নি। এ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি যে একটা দেশে মুক্ত গণমাধ্যম থাকা কতটা জরুরি ও অপরিহার্য।
মুক্ত গণমাধ্যম কেবল খাদ্যের অভাবজনিত দুর্ভিক্ষ রোধ বা প্রতিহত করে না। মুক্ত গণমাধ্যম আরো অনেক কিছু থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করে। এমনকি কোনো দেশে বা অঞ্চলে যদি দীর্ঘদিন ধরে মুক্ত গণমাধ্যম কার্যকর থাকে এবং স্বাধীনভাবে যা কিছু সত্য তা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয় তাহলে সে দেশে বা অঞ্চলে সুকুমার বৃত্তির প্রকাশ ও বিকাশ ঘটে এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়। সুষম উন্নয়নের সুফল মেলে এবং সাম্যাবস্থা বাস্তবায়ন করা যায়। মুক্ত গণমাধ্যম দুর্নীতি রোধ যেমন করতে পারে তেমনি দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক প্রশাসন ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কোনো দেশে বা অঞ্চলে যদি এসবের ব্যত্যয় বা ঘাটতি থাকে তাহলে বুঝতে হবে সেখানকার গণমাধ্যমের মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি।
রুচির দুর্ভিক্ষ নিয়ে অতি সম্প্রতি নাট্যজন মামুনুর রশীদ যে কথা বলেছেন এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে উদ্ধৃত করে যে প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন, তা যে কতটা গভীরতর সত্য সেটা বুঝতেও আমাদের সামর্থ্যে ‘চিড়’ ধরেছে। তিনি বলেছেন, ‘আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বলেছিলেন, দেশে একটা রুচির দুর্ভিক্ষ চলছে। আমরা সেই রুচির দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়ে গেছি। কী রকম? একদিকে মুক্তচিন্তা। মুক্তচিন্তার জন্য হুমায়ুন আজাদ প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের মিডিয়া মুক্ত হওয়ার ফলে আমরা একটা রুচির দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়ে গেছি। সেখান থেকে হিরো আলমের মতো একটা লোকের উত্থান হয়েছে।’ মামুনুর রশীদ অমূলক কিছু বলেছেন কি? বরং এ বিতর্কে যারা অংশ নিয়েছেন, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, তাদের অধিকাংশই রুচির কথা বলতে এসে নিজেরাই যে সুরুচির পরিচয় দিলেন না, তা পরিষ্কারভাবে উন্মোচিত হলো।
মামুনুর রশীদ ‘মিডিয়া মুক্ত’ প্রসঙ্গে যে ইঙ্গিত রেখেছেন, সেই মিডিয়া কিন্তু দেশের প্রচলিত মিডিয়া নয়। এই মিডিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা কেবল আক্ষরিক অর্থে মুক্ত নয়, একেবারে কোনো ধরনের প্রযত্ন ছাড়াই মুক্ত। সেখানে যে কেউ চাইলেই যা ইচ্ছা লিখতে পারেন, বলতে পারেন। কিন্তু তারও পরিমিতিবোধ থাকা জরুরি।
অন্যদিকে রেজিস্ট্রেশনধারী মিডিয়ারও কোনো কোনোটি চলে গেছে এমনতর মালিকানায়, যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক কিছু প্রত্যাশা করা বোকার স্বর্গবাসের শামিল। এর পরও মনে রাখা জরুরি—মিডিয়া বা গণমাধ্যম মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক একটা প্রতিষ্ঠান। গণমাধ্যমের জন্মও হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার লক্ষ্যে, যা রুচি তৈরি করবে, ইতিহাস-ঐতিহ্য নির্মাণ করে তার সঙ্গে জাতির চেতনার যোগসূত্র ঘটাবে, ন্যায্যতা-সমতা-সাম্য নিশ্চিত করবে, জাতিকে প্রগতির পথে নিয়ে যাবে এবং সব ধরনের ‘অপ’ থেকে জাতিকে রক্ষার বীজমন্ত্র প্রতিনিয়ত হাজির করবে। অবিভক্ত বাংলায় গণমাধ্যমের জন্মও হয়েছিল এ লক্ষ্যে। যদিও এর যাত্রা হয়েছিল বিজাতীয়-বিভাষীয়দের হাতে। কিন্তু তাদেরও লক্ষ্য ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা, প্রশাসন যন্ত্রে প্রশ্নের চর্চা জারি রাখা, রাজা ও প্রজার সঙ্গে হার্দিক সম্পর্কের সেতুবন্ধ রচনা করা।
প্রত্যাশা ছিল, পরাধীন দেশে গণমাধ্যম যে সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে মানুষবান্ধব চারিত্র্যের চর্চা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছে, স্বাধীন দেশে সেসব সীমাবদ্ধতা দূর হয়ে যাবে, গণমাধ্যমমুক্ত দেশে সদর্থক অর্থেই যে ‘মুক্ত’ প্রতিমুহূর্তে তার ছাপ রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু সেটা যে প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়ে ওঠেনি তার নজির প্রতিনিয়তই আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে।
হোসেন শহীদ মজনু: বার্তা সম্পাদক
বণিক বার্তা










