হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য নানা কসরত এবং অনুশীলন করানো হতো। আমাদের স্কুলজীবনের কথা বলছি। সে সময়ে বাংলা টাইপের বিষয়টা স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়নি। লেখার হাতের চেয়ে হাতের লেখার গুরুত্ব কম নয়। হাতের লেখা ভালো না হওয়ায় নানা দুর্ভোগে পড়ার গপ্প-কাহিনী শোনানো হতো। বিশেষ করে পরীক্ষায় নম্বর কম পাওয়ার আশঙ্কা থাকতই। তবে আজকাল অবস্থা অনেকটাই বদলে গেছে। আটপৌরে জীবনে হাতের লেখার চেয়ে টাইপই বোধহয় বেশি করতে হয়। পরীক্ষার খাতায় অবশ্য হাতে লেখার চল এখনো আছে।
আগে বলা হতো, কাগজ-কালি-মন লেখে তিনজন। বর্তমানে প্রাচীন এ প্রবচন বদলে দেয়ার সময় সমুপস্থিত। একে হালনাগাদ করে বলতে হবে কম্পিউটার-কি বোর্ড-মন লেখে তিনজন! আর এখন কম্পিউটারের জায়গায় মোবাইলও বসাতে পারেন। আগামীতে টাইপের ঝামেলাই হয়তো থাকবে না। ভাবনা করব আর ওটাই সরাসরি মুদ্রিত হয়ে যাবে। বিজ্ঞানভিত্তিক এক লেখায় পড়েছিলাম, সেন্সর বসানো থাকবে দুই বাহুতে। মগজের পাঠানো সংকেত সেখান থেকে ধারণ করে মুদ্রণ বা টাইপ করার কাজ বে-তারে চলবে। সেন্সর বাহুতে বসানোর কারণ হলো, আমরা, আমাদের মগজ টাইপ করার যে নির্দেশ স্নায়ুগুলোকে দেয়, তা এই পথেই আঙুলে যায়। তবে সেই সুদিন আসার আগ পর্যন্ত এই কি-বোর্ড নিয়ে কিছু সমস্যার আশু সমাধান দরকার। সুখের খবর হলো, বাংলা এখন ই-বুক প্রকাশের যুগে প্রবেশ করেছে। আর এ কারণেই কি-বোর্ড সমস্যার দিকে নজর দেয়ার বেশি দরকার দেখা দিয়েছে। বাড়ছে শুদ্ধ ভাষার চর্চাও। তাকে সহজতর করার জন্য প্রয়োজন আরামদায়ক কি-বোর্ড।
বাংলা টাইপকে সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কৃতিত্বের বড় অংশ—দাবি না করলেও—বর্তায় অভ্রের ওপর। বিনা মূল্যে হওয়ার কারণেই এমনটা সম্ভব হয়েছে বললে ঠিক হবেনা। বরং অভ্র হলো ব্যবহারবান্ধব। অভ্র যখন ইন্টারনেটের জগতে উঁকি দিচ্ছে, তখন সেখানে প্রবল প্রতাপে বিরাজ করছে বিজয়। বাংলা ভাষায় টাইপ করার কাজকে বিজয় এগিয়ে নিয়ে এসেছে বহুদূর। অভ্র বাংলা টাইপের সিংহদরজা সব মানুষের জন্য খুলে দিয়েছে।
ব্যবহারবান্ধবের দিক থেকে, সে সময়টায়, অভ্রের মতো হতে পারেনি কোনো টাইপ প্রোগ্রাম। সে সময়ে বিজয় এবং অভ্র ছাড়াও আরো দু-একটা বাংলা টাইপের প্রোগ্রাম ছিল। তারা ইউনিকোডভিত্তিক টাইপ করা নিয়ে নিজেদের মতো মাথা ঘামাতেন। তাদের প্রোগ্রাম দিয়ে টাইপ করতে হলে তাদের নিয়ম মেনেই কি-বোর্ডে আঙুল চালাতে হবে। ইউনিকোডের নিয়ম অনুসারে, পরে ‘’ে দিতে হবে, কারণ উচ্চারণ ওভাবেই করা হয়, আগে যে অক্ষরে এটা বসবে, তা লিখতে হবে। কিন্তু বিজয় থেকে অনেকেই শিখে এসেছেন আগে ‘’ে দিতে হবে, তারপর অক্ষর। একইভাবে টাইপ করতে হবে অন্যান্য স্বরচিহ্নও।
ইউনিকোডের এ নিয়মকে ছোট মনে হতে পারে কিন্তু যারা ফিক্সড কি-বোর্ডে টাইপ করেন তারা জানেন, এজন্য আঙুলের অভ্যাস বদলাতে হবে। যার সরল অর্থ হচ্ছে, নতুন করে আবার শিখতে হবে টাইপ! এমন এক প্রোগ্রাম প্রস্তুতকারককে পুরনো অভ্যাসের সুযোগ বজায় রাখার অনুরোধের জবাবে শুনতে হয়, তাদের প্রস্তুতকৃত ইউনি-বিজয়ই হলো ইউনিকোডভিত্তিক টাইপের সঠিক পদ্ধতি। তিনি যা বলেছিলেন, তা হুবহু মনে নেই। তবে ভাষায় এক ধরনের ‘মাস্টার মশাই’ ‘মাস্টার মশাই’ ভাব ছিল।
অভ্র কোনো মাস্টারির মধ্যে না গিয়ে কি-বোর্ড এডিট করার ব্যবস্থা রাখার সহজ ও সরল পথ বেছে নেয়। সমস্যা শেষ। এতে নিজের হাতের বা অভ্যাসের মতো কি-বোর্ড বানিয়ে নেয়ার অবকাশ রইল। সে সময়কার ওমিক্রনের ওয়েবসাইটাও ছিল চমত্কার। মেহেদী হাসানের নেতৃত্বাধীন উজ্জ্বল তরুণদের সে গোষ্ঠীর বাংলা ভাষার প্রতি সেবাদানের কোনো তুলনা নেই।
এল অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল। তার ‘অভ্র’ হয়ে গেল ‘রিদমিক’। অভ্র এবং রিদমিক উভয়ই তৈরি হয়েছে ব্যবসা-বুদ্ধিকে বর্জন করে। পুরাই সেবাদান। মাগনা।
প্রথমে অভ্রের যে চোখ ধাঁধানো উন্নতি নজরে পড়েছে, হালে তার গতি কমে এসেছে। ধরুন অভ্র এখনো ‘ভয়েস’ বা ‘শ্রুতি’ টাইপের সুযোগ যোগ করেনি। পিসি বা ল্যাপটপে কোনো বাংলা টাইপিং প্রোগ্রামে এ সুযোগ আছে কিনা, জানি না। সম্প্রতি ‘বর্ণ’ নামে একটা বাংলা টাইপিং প্রোগ্রামের উপস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। এতে বাংলা টাইপ করার কিছু বাড়তি সুযোগ দেয়া হয়েছে। সেখানেও শ্রুতি মুদ্রণ বা ভয়েস টাইপের সুযোগ নেই। বর্ণকে একটা ই-মেইল করেছিলাম, জবাবের জন্য এখনো অপেক্ষায় আছি।
অন্যদিকে ‘মোবাইল’ বা ‘ট্যাবে’ কি-বোর্ডের সংযোগ দিয়ে নিজ পছন্দের ফিক্সড কি-বোর্ড অনুযায়ী টাইপের সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি বাংলা ভাষায়। এটা করা গেলে ছোট একটা কি-বোর্ড সঙ্গে রাখলেই অনেক বড় সমস্যার সমাধান হতো। ল্যাপটপকে ঘাড়ে করে নেয়ার দরকারই পড়ত না। মনের সুখে যেকোনো জায়গায় বসে বাক্স বাজানো মানে টাইপ করা যেত। বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে টিপে টাইপ করা, থাম্ব টাইপিং অসুবিধার এক মহাবস্তু। গতিহীন সে টাইপ নিয়ে ছোটখাটো কাজ করা যায়। কিন্তু বড় লেখালেখি? ‘না, পায়ের ঘাম মাথায় উঠবে!’
ডা. মেহেদী হাসান খান দেশে নেই। উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে গিয়েছেন। শুনেছিলাম। অন্যদিকে রিফাত-উন-নবী, শাবাব মুস্তফা, নিপন, ‘কাল পুরুষ’ আর ‘সিয়াম রুপালি’ নামের দুটো চমত্কার ফন্ট নির্মাতা তানবিন ইসলাম সিয়াম কোথায় আছেন জানি না। তবে তারা যেখানেই থাকুন না কেন, চারপাশ উজ্জ্বল করে রেখেছেন নিজগুণে—এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে। অন্যদিকে সিয়াম কি জানেন, এখন সুন্দর সুন্দর ফন্ট তৈরি হচ্ছে এবং তা বিক্রিও হচ্ছে! অনেক তরুণ ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেছেন।
এছাড়া মেহদির স্ত্রী সুমাইয়া নাজমুনও দেড় লাখেরও বেশি শব্দের সম্পাদনা করেছেন অভ্রের ডিকশনারির জন্য। এখন দরকার ইন্টার অ্যাকটিভ ডিকশনারি। বদলে যাওয়া সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার জন্য দরকার অভ্রের কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সংযোজন।
বাংলাদেশের যুবশক্তির প্রতি সালাম সালাম হাজার সালাম জানিয়ে আশা করব, এখন একদল তরুণ জোর কদমে এগিয়ে আসবেন বা আবার জেগে উঠবে ওমিক্রমন ল্যাবের অতি উজ্জ্বল তরুণগোষ্ঠী। বাংলা টাইপের জগতে নতুন জোয়ার বইবে। ‘কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ!’
সৈয়দ মূসা রেজা: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, ছড়াকার ও আলোকচিত্রী





