চুরানব্বই বছরের এক দৃঢ় ও দৃপ্ত জীবন কাটিয়ে গেছেন বদরুদ্দীন উমর। চিন্তা ও ক্রিয়াশীলতার দিক থেকে আমৃত্যু তিনি ছিলেন সজীব ও সচল। বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পরিসরে সংগ্রামী সাধকের জীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। যার মধ্যে ছিল সততা, কষ্ট ও সাধনার অপূর্ব সমন্বয়। ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ধারাবাহিকভাবে নিরলস থেকে চিন্তাকে গবেষণা ও পাঠের মাধ্যমে কার্যকর রেখেছিলেন তিনি। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি তার বলা ও লেখা থামাননি, সমানতালে চালিয়ে গেছেন। তার এসব বলা ও লেখার মধ্যে একজন প্রাজ্ঞ পণ্ডিতকে ঋজু ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি আমরা। অনেকসময় প্রায় একা এবং আপসহীন। বুদ্ধিজীবী হিসাবে তিনি অর্গানিক ছিলেন। তার গবেষণা ও রচনার মান ছিল অ্যাকাডেমিক পরিসরে সুপঠিত ও গ্রহণযোগ্য। ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচিত গবেষণাগ্রন্থটিসহ শতাধিক গ্রন্থ রচনা করে গেছেন তিনি।
উমর অবিভক্ত পাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাশিমের সন্তান। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেছেন। রাজনৈতিক দল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাবার মুসলিম লীগ বা মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে অনেক দূরের মতাদর্শের রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ততার মধ্য দিয়ে শুরু। পরে নিজেই নিজের মতো করে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সংগঠন গড়ে তুলবার চেষ্টা করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি লেখকদের নিয়ে সংগঠন, কৃষক সংগঠন হয়ে অনেকগুলো সংগঠনের মোর্চা গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট করেছিলেন। সর্বশেষ তিনি জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল নামের সংগঠন গড়ে তোলেন, এবং আমৃত্যু এর সভাপতি ছিলেন।
দুই
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরের ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও বিচরণের জায়গাটিতে মোটা দাগে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদে’র ধ্বজাধারী শক্তিটি পরাজিত হয়েছে। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী’ বলে যে বর্গটি রাজনীতি করতে চান, তারা একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন। মূলত তারা পূর্বতন বাঙালী জাতীয়তাবাদী পক্ষটির বিরোধিতাকে নিজেদের শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কার্যকর রেখেছিলেন। নতুনভাবে নিজেদের নির্মাণকে দৃশ্যমান করে তুলতে পারেননি। ইসলামের নামে বেশ কিছু রাজনৈতিক দল তাদের ক্রিয়াশীলতা বজায় রেখেছেন। কিন্তু আধুনিক ও গণতান্ত্রিক দেশ গঠনে তাদের কর্মসূচি কি এবং তারা ক্ষমতা পেলে রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন হবে, তা তারা পরিষ্কারভাবে জনগণের সামনে হাজির করতে পারছেন না। সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিবৃত্তি ও রাজনীতির ধারাটি ক্ষীণ হতে হতে সমাজ থেকে প্রায় বিলীন।
এরকম হলো বাস্তবতা। এ বাস্তবতার মধ্যেও সমাজচিন্তার গবেষক হিসেবে উমর আমাদের সামনে উজ্জ্বল হয়ে আছেন। কিন্তু বদরুদ্দীন উমর ও তার দল কখনো তাদের রাজনীতিকে অন্যদের মতো দেশ পরিচালনার দিকে নিয়ে যেতে পারেননি। রাষ্ট্রক্ষমতা নিতে পারে, জনগণের মাঝে এরকম কোনো পার্টি-সংগঠন গড়ে তুলতে পারেননি। বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্য ও লেখা থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধৃত করলেও উপরে উল্লেখিত দেশের প্রধান ধারার রাজনীতির কেউই উমরকে ব্যাপক চর্চার বিষয় হিসেবে সামনে আনেননি। তাদের কর্মীরাও পঠন-পাঠনের জন্য উমরকে আমলযোগ্য মনে করেননি। এমনকি ভিন্নমত চর্চার জায়গা থেকেও না। প্রয়োজনে দুয়েকটি কোটেশন হয়তো, তারা উমরের বলা ও লেখা থেকে উদ্ধৃত করে থাকেন, যার যার সুবিধামতো। তবে, ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কিছু তরুণ ও ছোট রাজনৈতিক গ্রুপের কেউ কেউ মনোযোগ সহকারে উমর পাঠ করেন। এটা বোঝা যায়। এমনকি অনেক তরুণ বা মাঝবয়সী চিন্তককে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে উমরের চিন্তাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় সামনে নিয়ে আসতে দেখি। তার পঠনের মধ্যে মার্কসবাদকে জিইয়ে রাখছেন বটে। তবে- এটা যতটা না সংগঠন গড়ে তোলার কাজে, তার চাইতে বেশি আবেগে ও পঠন-পাঠনের জায়গা থেকে।
তিন
বদরুদ্দীন উমরের শক্তি তার রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নয়। উমরের শক্তি তার চিন্তা, প্রজ্ঞা ও নিবিড় সমাজপাঠ। আর তার চিন্তা ও প্রজ্ঞা- শক্তি নিয়ে হাজির হতে পেরেছে, এর কারণ তার ত্যাগের মানসিকতা, নির্মোহ ও নির্লোভ এক জীবন। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো বুদ্ধিজীবী হিসেবে ব্যক্তিজীবনের সততা, যা বিরল দৃষ্টান্ত। এক্ষেত্রে এটা বলা যায়, টেক্সটের সঙ্গে ব্যক্তিজীবন মিলিয়ে পাঠ করলে উমরকে স্যালুট না জানিয়ে আমাদের কোনো উপায় নেই।
বদরুদ্দীন উমর তার দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক জীবনে কোনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নেননি। কোনো পদ-পদবি গ্রহণ করেননি। কোনো পদক দিয়ে তার বলা ও লেখা আটকানো যায়নি। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে পদক-পুরস্কার দিতে চাইলেও তিনি গ্রহণ করেননি। নেননি সংবর্ধনা-সম্মাননাও। এক্ষেত্রে তিনি একেবারে নিরাপস ছিলেন। এটা ছিল তার আদর্শ ও দর্শনগত বিষয়। তিনি মনে করতেন, ‘পুরস্কার অনেক সময় লেখকের স্বাধীন চিন্তাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। রাষ্ট্র বা ধনিকশ্রেণী যখন পুরস্কার দেয়, তখন তার পেছনে থাকে লেখককে নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা। একবার পুরস্কার নিলে পরবর্তীতে আরো পুরস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়, যা লেখার স্বাধীনতা নষ্ট করে।’
চার
বদরুদ্দীন উমরকে যারা আদর্শস্থানীয় মানেন বলে প্রচার করেন, আমরা দেখেছি, তাদের কারো কারো মধ্যে বদরুদ্দীন উমরের বুদ্ধিবৃত্তির ছায়া রয়েছে। কিন্তু সততাটা ওই অর্থে তারা কার্যকর রাখতে পারেননি। চিন্তা ও চর্চার শক্তিকে হাজির রাখতে যে ব্যক্তিগত স্যাক্রিফাইস করতে হয়, তা তাদের মধ্যে নেই। নানা সরকারি-বেসরকারি পদ ও সুবিধা তাদের বৃদ্ধিবৃত্তিকে গ্রাস করেছে। উমর চেয়ার পরিত্যাগ করে মানুষের কাতারে নেমে এসেছিলেন। তার অনুসারী বলে যারা পরিচয় দেন, দেখা যায়, তারা উল্টো চেয়ারের পেছনে ছুটছেন। রাষ্ট্র ও সমাজের ছোটখাটো একটা চেয়ারে বসে আরাম ও সুবিধার জীবনে ঢুকে পড়ার জন্য তাদের কেউ কেউ গলদঘর্ম হয়ে যান। এমনকি হালুয়া-রুটির ভাগের জন্য চিপায়-চাপায় বুদ্ধিবৃত্তিক আপসকামিতা বজায় রাখেন। নিজেদের শক্তিকে ক্ষয় করে ফেলেন। অনেকটা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো বা বৃত্তের ম্যাজিক্যাল চেয়ারের মতোই।
পাঁচ
বদরুদ্দীন উমরের পিতা আবুল হাশিম ছিলেন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। মুসলিম লীগের রাজনীতি করেছেন। ছিলেন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। লেখালেখি করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। আবুল হাশিমের পিতা আবুল কাসেম সাহেবও রাজনীতিক ছিলেন। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের বিধায়ক। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রভাবশালী জাতীয় নেতা। আবুল কাসেমের সন্তান আবুল হাশিম। আবুল হাশিমের সন্তান বদরুদ্দীন উমর। তিনপুরুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ক্রিয়াশীলতা ছিল তাদের পরিবারে। বদরুদ্দীন উমর তার উত্তরাধিকার হিসেবে তিন সন্তান রেখে গেছেন বলে আমরা জানি। তারা দেশে-বিদেশে তাদের কর্মে নিয়োজিত আছেন। কিন্তু পারিবারিক রাজনৈতিক ধারার উত্তরাধিকার তারা বহন করেননি। সক্রিয় রাজনীতি বা কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে নেতৃত্ব দেয়ার কাজটিও তারা করেননি।
শেষ
দেখা যাচ্ছে যে, বদরুদ্দীন উমরের যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর, যে রাজনৈতিক দর্শন ও চর্চা, সততা ও নিষ্ঠার যে একাগ্রতা তিনি আমৃত্যু বহন করে গেছেন, সেরকম কোনো উত্তরাধিকারী তিনি রেখে যাননি। তার রাজনৈতিক দর্শন, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, সাহস ও ঋজুতা অন্য কারো মধ্যে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তার পরিবারের মধ্যেও তার বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা, কাজ রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার মতো কেউ নেই। যেমনটা ছিল উমরদের তিনপুরুষে।
আমাদের দেশে উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমে প্রয়াত পূর্বসূরীদের বিব্রত করে তোলার উদাহরণ কিন্তু কম নেই। দেখা গেছে, রাজনৈতিক পূর্বসূরীদের অনেক বড় অর্জনও উত্তরসূরীদের কারণে বেশ অমর্যাদায় পর্যবসিত হয়েছে। অপমান-লাঞ্জনার স্বীকার হয়েছে। নানান বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সেদিক থেকে ওই অর্থে বদরুদ্দীন উমরের উত্তরাধিকার না থাকাটাও ভালোই হলো বলা যায়। উত্তরসূরীদের কারণে তার জীবন ও কর্ম থেকে যাবে বিতর্কের বাইরে।
তবে, সবশেষে আমরা শুধু এটুকু বলতে পারি, উমরের উল্লেখযোগ্য উত্তরাধিকার তার গবেষণা ও আমাদের জন্য রেখে যাওয়া শতাধিক গ্রন্থ। যা যুগ যুগ ধরে আমাদেরকে ইতিহাসের নানা কালপর্ব দেখবার আলো দেবে, শক্তি দেবে। বুদ্ধিবৃত্তির আয়নায় রাষ্ট্র, সমাজ, সময় ও সম্পর্কের ভেতরের বিষয়গুলোকে বুঝবার দৃষ্টি দেবে।










