চারপাশে
পরিবর্তনের গতি বেশ প্রবল। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তির পরিবর্তন দৃশ্যমান। এর বাইরে দৃষ্টিভঙ্গি বা মনোভাব বদলের গতিও কম নয়। সেগুলোর কোনটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক তা নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। তবে পরিবর্তন যে উল্লেখ যোগ্যমাত্রায় হচ্ছে সে বিষয়ে আশা করি সবাই একমত হবেন।
আমরা পছন্দ করি বা না করি উল্লেখিত পরিবর্তনগুলোর রয়েছে অসংখ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সেগুলোর মোকাবেলায় শিল্পোন্নত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা বহুবিধ উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে তারা সমস্যা চিহ্নিত হওয়ার পরপরই তার সমাধানে উদ্যোগী হচ্ছে, কিন্তু আমরা পরিবর্তনের পালে হাওয়া দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা থেকে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর ব্যাপারে উদাসীন রয়ে যাচ্ছি। ফলে নানা জটিলতা ক্রমেই বাড়ছে। সেগুলোয় আলোকপাত করাই আজকের নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
মানুষ স্বভাবতই ‘আরেকটু ভালো’ থাকতে চায়। আপাতদৃষ্টিতে সেই আকাঙ্ক্ষা ও চেষ্টা দোষের কিছু নয়। হয়তো সে কারণে নগরজীবনে প্রায় সবাই সে লক্ষ্যে ছুটছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এ ছুটে চলার ফল কি প্রত্যাশা মাফিক হচ্ছে? অর্থাৎ আয়-ইনকাম বাড়ার পাশাপাশি কি জীবনে সুখ-শান্তিও সে মাত্রায় আসছে? নাকি সে অর্জনের বিনিময়ে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হচ্ছে? সে ত্যাগের ফল আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবনে কেমন হচ্ছে? সেগুলো মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতিই বা কেমন? তাছাড়া ব্যক্তি পর্যায়ের চেষ্টায় কি সেগুলো সামাল দেয়া সম্ভব?
আসলে এক বোতলের ছিপি (ঢাকনা) আরেক বোতলে লাগাতে গেলে যে বিপত্তি বাধে আমরা অনেকটা তেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ইউরোপ-আমেরিকার ব্যক্তি ও সমাজজীবন আমাদের থেকে বহুলাংশে ভিন্ন। ফলে তাদের জন্য যেটা কার্যকর সেটা অনুরূপভাবে আমরা চর্চা করলে উল্টোফলও হতে পারে! অথচ বহু ক্ষেত্রে আমরা হুজুগে তাদের নানা পদ্ধতি গ্রহণ ও চর্চা করছি। প্রাথমিকভাবে এগুলো ‘চমত্কার’ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর পরিণতি নিয়ে ভাবা দরকার।
বৈশিষ্ট্যগতভাবেই আমরা বহু ওক্ষত্রে উদাসীন। যেমন নানা সমস্যা বা অনিয়ম সম্পর্কে সবাই জানি। কেউ কথা বলি না, কিন্তু যখন কোনো একটা ইস্যু মিডিয়ায় ভাইরাল হয় তখন সবাই খুব সচেতনতা প্রদর্শন করি। ক’দিন পর আবার দিব্যি ভুলে যাই। ফলে ঝড় থামার পর সেই কার্যক্রম আগের মতোই চলতে থাকে। সিস্টেম বদলায় না। বদলানোর খুব একটা প্রয়োজনও অনুভব করি না।
তবে জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করার মতো অসংখ্য উপাদানের ক্ষেত্রেও কি এমন আচরণ কাম্য? যাদের মডেল অনুসরণ করে আমরা এগোচ্ছি তারা তো এরই মধ্যে সেগুলোর ব্যবস্থাপনায় মোটামুটি একটা সিস্টেম ডেভেলপ করেছে। অন্যদিকে আমরা তাদের সিস্টেম আংশিক অনুকরণ করলাম কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বা ব্যবস্থা নিলাম না! তাতে ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা কি রয়ে যায় না?
আমাদের শৈশবে বিদ্যালয়ে খুব যে পেটানো হতো—ব্যাপারটা তেমন নয়। কিন্তু আমরা জানতাম, পড়ালেখা না করলে বেত পিঠে পড়তে পারে। বিশেষত দুষ্টুমির জন্য হেডস্যারের রুমে ডাক পড়ার ভয়ে নিজেরা অনেক সংযত আচরণ করতাম, কিন্তু হঠাৎ করেই স্কুলে শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক ‘জনমত’ গড়ে ওঠে। শুনেছি উন্নত দেশগুলোয় স্কুলে শাসন করা হয় না। তাই আমাদেরও সেটা করা যাবে না। শুধু আদর-যত্ন দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। কাজ আদায় করে নিতে হবে।
খুব ভালো কথা। এক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর ব্যাকআপ সিস্টেম কেমন সেটাও তো বলতে হবে, তাই না? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সেভাবে প্রস্তুত করা, প্রয়োজনীয় গবেষণা ও উন্নয়ন, ক্লাস সাইজ ছোট রাখা, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পাঠ কার্যক্রম ও তার প্রতিক্রিয়া যথাযথ মনিটর করা ইত্যাদি বিষয়গুলোর দেখভাল করা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব সাপোর্ট দেয়া কি সেই সিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়?
আমাদের দেশে সেক্ষেত্রে অগ্রগতি কেমন? শিল্পোন্নত দেশগুলোর শিক্ষাপদ্ধতি, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দের সামান্যতম অংশও কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? সেগুলোর কোনো কিছু না করেই আমরা তাদের আদলে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ন্যূনতম শাসনের ব্যবস্থাও’ নিষ্ক্রিয় করে ফেললাম। এর ফল কি খুব ভালো হচ্ছে?
আজকাল পরিবারগুলোয় এমনিতেই এক বড় সংকট হয়েছে। আগে সন্তান সংখ্যা ছিল বেশি। ফলে মা-বাবা প্রত্যেককে আলাদাভাবে অনেক বেশি মনোযোগ দিতে পারতেন না। সবার সঙ্গে মিলেমিশে তারা মানুষ হয়ে উঠত। এখন অধিকাংশ পরিবারে সন্তান সংখ্যা এক বা দুই। ফলে মা-বাবার সব আদর-ভালোবাসা থাকছে তাদের প্রতি কেন্দ্রীভূত। এতে অনেক সময়ই শাসনের তীব্র প্রয়োজনীয়তা থাকলেও পিতৃ বা মাতৃস্নেহের কাছে তা হার মানছে।
আবার দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি, ফুফু-খালাদের সংস্পর্শও সেভাবে পাচ্ছে না। ফলে পরিবার থেকে নিজেকে সংযত রাখার শিক্ষার ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। বড় অন্যায় করেও তারা অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্কুল-কলেজও ‘অগ্রহণযোগ্য আচরণ’ সত্ত্বেও তাদের কিছু বলছে না। কর্তৃপক্ষ হাত গুটিয়ে রাখছে। কারণ সামান্য ঘটনায় ব্যাপক হইচই হচ্ছে। হয়তো অনেকে ভাবছেন, বাবা তোমার সন্তান গোল্লায় গেলে আমার কী? ফলে তারা হাল ছেড়ে দিচ্ছেন।
শৈশব-কৈশোরে পড়ালেখার চেয়ে অন্য কিছু ভালো লাগবে সেটাই তো স্বাভাবিক। ওই বয়সে ক্লাস ফাঁকি দেয়া, বিড়ি ফুঁকতে চেষ্টা করা, হূদয় মাঝে প্রেম-ভালোবাসা উঁকি-ঝুঁকি মারা, একটু মস্তানি করে এলাকায় পরিচিত হওয়া, টিকটক বা লাইকি স্টার হওয়া...এগুলো
‘বয়সের দোষ’ বলে গণ্য করা যায়। তাহলে সেগুলোকে সিস্টেমে রাখার দায়িত্ব কার? এ দায়িত্ব কেউ নিচ্ছে না। সবাই নিজের গা-বাঁচিয়ে চলতে চেষ্টা করছে। এর ফল কি ভালো হচ্ছে?
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। অল্প বয়সে নানা রকম মাদকে ঝুঁকছে। ইভ টিজিংকে সাধারণ ঘটনা মনে করছে। নানা পার্টিতে গিয়ে অসংযত আচরণ করছে। এক সঙ্গে কয়েকটা প্রেম করাকে খুব স্বাভাবিক মনে করছে! এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অনেকে আবার খুনোখুনির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এতে এক পক্ষ মারা পড়ছে। অন্য পক্ষ জেলে যাচ্ছে। আমরা মিডিয়ায় এগুলো দেখে ভাবছি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু এরা যখন বড় হবে। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেবে তখন পরিস্থিতি কেমন হবে—তা কি আমরা ভেবে দেখছি?
অন্যদিকে শিক্ষিত-সচেতন মানুষেরা সন্তানদের সফল করে বড় শহর কিংবা বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বাড়িতে রয়ে যাচ্ছেন তাদের সারাজীবন কষ্ট করে গড়ে তোলা মা-বাবা। তাদের বৃদ্ধ বয়সে নানা রোগ-শোক ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা আসবে সেটাই স্বাভাবিক। অথচ সফল সন্তানরা বছরে দুই একবার চোখের দেখারও সুযোগ পান না। অথচ বৃদ্ধ সেই মানুষগুলোর প্রতিনিয়ত সাপোর্ট দরকার। আজকাল ‘কাজের লোক’ও সেভাবে মিলছে না। অনেকে ভাবেন আমি তো টাকা দিচ্ছি! কিন্তু একজন বৃদ্ধ মানুষের টাকার চেয়ে অনেক বেশি দরকার অন্য মানুষের সঙ্গ ও শারীরিক সহযোগিতা। সেটা সন্তান বা আত্মীয়-স্বজন দিতে পারছে না।
আমরা শুধু সন্তানদের তথাকথিত সফল করার পদ্ধতি গ্রহণ করলেও তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে উদাসীন রয়ে যাচ্ছি। হয়তো সে কারণেই এমন বয়স্ক, নিঃসঙ্গ মানুষগুলোর জন্য তেমন একটা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। এমনকি সামাজিকভাবে ‘বৃদ্ধাশ্রম’কে চরম নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কিন্তু সেই বৃদ্ধ মানুষগুলোর দায়িত্ব কে নেবে? সারা জীবন কষ্ট করে অন্যদের সফল করা মানুষগুলোর শেষ দিনগুলো সুখময় করার যথেষ্ট উদ্যোগ কি নেয়া হচ্ছে?
বর্তমানে আরেকটা সংকট বেশ প্রবল আকার ধারণ করছে। তা হলো— শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের বিয়ের প্রতি অনীহা! কারণ শহরে বাস করা অধিকাংশ পরিবারের শিশুরা বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে দেখছে মা-বাবা নিত্যদিন ঝগড়া-ফ্যাসাদে লিপ্ত। তারা বুঝে উঠতে পারে না ঠিক কোন কারণে তাদের সংসারে এত গণ্ডগোল হয়। ফলে আগে পরিবার বলতে যে ‘শান্তির নীড়’ মনে করা হতো তার বড় অংশ এরই মধ্যে অশান্তির ফ্যাক্টরিতে পরিণত হয়েছে। বহু পরিবারে সারাদিন বাইরে কঠোর পরিশ্রম করে ঘরে ফিরে আবার সংঘাতে জড়ানো রুটিনে পরিণত হয়েছে।
হয়তো সে কারণেই তরুণ-তরুণীদের মনে প্রশ্ন জাগছে—এমন অশান্তি সৃষ্টি করার জন্যই কি বিয়ে করতে হবে? বরং অন্য পন্থায় জীবনকে উপভোগ করাকে তারা শ্রেয় মনে করছে। কিন্তু তারও যে ভয়ংকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে সেগুলো খেয়াল করছে না।
আমাদের পূর্বপুরুষদের চর্চা করা জীবনে তেমন আর্থিক সমৃদ্ধি ছিল না। কিন্তু পবিত্র ও মায়াময় এক পরিবেশ ছিল। পরিবার ছিল সর্বোত্তম আশ্রয়স্থল। কিন্তু কখন যেন আমরা পথ হারিয়েছি! আবার নিজেদের বাস্তবতা বুঝে সেগুলোর সমাধানও খুঁজে বের করছি না। অসংখ্য বিষয়ের মতো ‘আল্লাহর ওয়াস্তে’ ছেড়ে দিয়ে বসে আছি।
আমরা এখনো বস্তুগত অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কিন্তু জীবনে বস্তুই সব নয়। এর বাইরে মানবিক দিকের প্রভাব অনেক শক্তিশালী। তাই তো একজন মানুষ আপাতদৃষ্টিতে সফলতার শীর্ষে বসে, বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়ার পরও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কারণ সম্পদ বা সফলতা তাদের মনকে শান্ত করতে পারছে না। জীবনের একটা পর্যায়ে যেসব অভাব তীব্র হয় তা শুধু বাহ্যিক সম্পদ দিয়ে পূরণ করা যায় না। তাই আশা করি সংশ্লিষ্টরা বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন।
ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘সুখের অসুখ’ বইয়ের লেখক





