ভাষার মাসের প্রথম দিনে বেশকিছু রায় ও আদেশ বাংলায় দেয়া হয়েছে। বিষয়টা আদালত পাড়ায় তো বটেই গণমাধ্যমের কল্যাণে সব শ্রেণীর পাঠকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এ ঘটনা আমাদের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু প্রশ্ন হলো—হঠাৎ হঠাৎ কিংবা ভাষার মাসে বাংলায় এভাবে রায় ও আদেশ দেয়ার ঘটনায় কোনো স্বস্তির বার্তা রয়েছে কি? নাকি এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা যে এখনো সর্বত্রগামী হয়ে ওঠেনি, সেই চিত্রই প্রকাশিত হয় উৎসবের আমেজে, আবেগ ও শ্রদ্ধার নিরিখে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের পেছনে ফেরা দরকার, বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রসঙ্গে চোখ রাখতে পারি আমরা।
‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লেখেন দৈনিক আজাদ পত্রিকায়, যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের ৩০ জুলাই। এতে তিনি বলেন, ‘কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দির অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশ্চাদগমনই হইবে। ইংরেজি ভাষার বিরুদ্ধে একমাত্র যুক্তি এই যে, ইহা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোনো প্রদেশের অধিবাসীরই মাতৃভাষা নয়। উর্দুর বিপক্ষেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজি ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোনো যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোনো রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করতে হয়, তবে উর্দু ভাষার দাবি বিবেচনা করা কর্তব্য। ড. জিয়াউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার সপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র নিন্দা জানাইতেছি।’
উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দীন আহমদ হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশের অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন।
স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, রাষ্ট্রগঠনের অভিজ্ঞতার একেবারে শুরুতেই বাংলা ভাষাকে পেরোতে হয়েছে কঠিন পথ। এসবের ধারাবাহিকতাতেই অনিবার্য হয়ে ওঠে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন। অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ’৪৭-এর দেশভাগে বিপর্যস্ত বাঙালির নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের অভিজ্ঞতা ৫০ পেরোলেও তার ভাষা বাংলার অবস্থা যে খুব বেশি সুখের তেমনটা বলা যাবে না হলফ করে, মায়ের ভাষায় ‘কসম’ কেটে। কেননা উচ্চ আদালত ও উচ্চশিক্ষায় যেমন বাংলা ভাষার প্রচলন বাধ্যতামূলক করা যায়নি, তেমনি বাংলা মুলুকেই বাংলা ভাষা আজও হয়নি সর্বত্রগামী। এ কারণে আয়োজন করে মাঝে মাঝে এমন কিছু করতে হয়, যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় আমাদের মাতৃভাষা-প্রেম উপলক্ষ বিশেষ। যেমনটা হয়তো ঘটেছে গত ১ ফেব্রুয়ারি।
সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের রায় কখনো কখনো বাংলা ও ইংরেজিতে দেয়া হলেও একদিনে ১৪৮টি রায় ও আদেশ বাংলায় দেয়ার ঘটনা প্রথমবারের মতো ঘটল ১ ফেব্রুয়ারি। প্রসঙ্গত, উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় ও আদেশ দেয়া শুরু হয় নব্বই দশকে। যুগান্তকারী এ ঘটনার সূচনা করেন প্রয়াত বিচারপতি এআরএম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলায় বেশ কয়েকটি রায় দেন সাবেক বিচারপতিদের মধ্যে কাজী এবাদুল হক, বিচারপতি হামিদুল হক, বিচারপতি আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
শুধু রায় ও আদেশ নয় দিনটিকে দেয়া হয়েছে উৎসবের আমেজ। বাংলা ভাষার প্রতি, ভাষাশহীদদের প্রতি তাদের এ আবেগ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি বাংলা ভাষার চর্চা, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সমৃদ্ধতর বিকাশে মাইলফলক এক ভূমিকা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।
বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ ‘মো. আক্কাস আলী বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায় বাংলায় দেয়ার সময় বলেন, ‘আজ ১ ফেব্রুয়ারি। ভাষার মাস আজ থেকে শুরু। ভাষাশহীদদের আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রতি সম্মান জানিয়ে আজকের প্রথম রায়টি বাংলায় ঘোষণা করছি। বিশ্বের সব বাংলা ভাষাভাষীর প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলায় এ রায় ঘোষণা করছি।’ অন্যরাও এ রকম ভূমিকা দিয়েছেন, যারা দেননি তাদের উদ্দেশ্যও যে এমনই, এ ব্যাপারে কোনো রকম বিতর্কের অবকাশ নেই।
বিষয়টা শুধু আদালত পাড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গণমাধ্যমের সুবাদে সারা দেশেই আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টিকে সবাই ইতিবাচক হিসেবে নিলেও কতিপয় প্রশ্ন উপস্থাপিত হয়েছে। এগুলো হলো—
এক. একটা জাতির সবচেয়ে শ্রদ্ধা ও আবেগের জায়গাটাকে একটা দিনের মধ্যে আবদ্ধ করে কিংবা দিন-তারিখে আটকে দিয়ে সেটাকে পালনের চেষ্টা করা হলে তা কি জাতির জন্য খুব বেশি আশা জাগাতে পারে?
দুই. আদালতের সব রায়-আদেশ কেন বাংলায় দেয়া হচ্ছে না। সেটা করার দায়বোধই কেন জাগ্রত হচ্ছে না, বাধাটা কোথায়?
তিন. বাংলাদেশ একটা ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র। একুশের চেতনা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চাবিকাঠি। বাঙালির একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। অথচ বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে এখনো বাংলা ভাষা চর্চা পুরোদমে নেই। সব রায় ও আদেশ বাংলায় ঘোষিত হয় না, সেটা হতে আমাদের আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে।
বাংলা ভাষাকে সদর্থকভাবে যদি আমরা মর্যাদার আসনে দেখতে চাই এবং এর বহতাকে রাখতে চাই স্রোতস্বিনী নদীর মতো, তাহলে কেবল কথার মোড়কে নয়, কেবল বিশেষ কোনো দিন কিংবা মাসে নয়, সারা বছরই এ ভাষার উৎকর্ষ বাড়ানোর জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর জন্য প্রথমেই কয়েকটি কাজ করা জরুরি—
এক. আদালতের রায়, আদেশসহ যাবতীয় কাজে বাংলাভাষা যেন ব্যবহৃত হয় তার জন্য বাধ্যতামূলক আদেশ জারি করতে হবে। একটি কমিটি গঠন করে কাজটা সর্বত্র হচ্ছে কিনা তার জন্য তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখা জরুরি। প্রয়োজনে এ আদেশ লঙ্ঘিত হলে দণ্ড ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
দুই. বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে যে বিষয়টা সর্বাগ্রে হাজির করা হয় সেটি হলো—এর শব্দভাণ্ডারের অপ্রতুলতা এবং কিছু বিদেশী শব্দের বাংলাকরণের জটিলতা। এর সহজ উপায় হলো, একটা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের মাধ্যমে কিছু শব্দ নির্দিষ্ট করে দেয়া। এর আগে আমরা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় আইনকোষ পেয়েছি। একইভাবে আদালতের ব্যবহারের জন্য একটা পরিভাষা কোষ করা যেতে পারে, যা সারা দেশের বিচারকার্যে ব্যবহার করা হবে। এটা করা সম্ভব হলে আদালতে বাংলাভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা অনেকাংশে দূর হয়ে যাবে।
১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় যে আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধার্ঘ জানানোর দৃষ্টান্ত হাজির হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই লোক দেখানো কিংবা গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এ আশঙ্কা তখনই অমূলক হয়ে দেখা দেবে, যখন আদালত দ্রুতই সব রায় ও আদেশ বাংলায় দেয়ার ব্যবস্থা করার প্রক্রিয়া শুরু করবেন।
ভাষা নদীর মতো বহমান। যে নদীর বহতা নেই, সেই নদীকে বলা হয় মৃত নদী। ভাষাও মৃত হয়ে যায়। যেমনটা হয়েছে একসময়ের রাজভাষা সংস্কৃত। বাংলা ভাষাও সেই দশার দিকে এগিয়ে যেতে পারে, যদি এখন থেকে সতর্ক ও সাবধানতা অবলম্বন না করা হয়। বাংলা ভাষা বিকাশের জন্য যথাযথ প্রযত্ন না নেয়া হলে পক্ষান্তরে আমরা আমাদের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করব।
স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা তিন ধারায় বিভক্ত এবং তিন ভাষার রাজত্ব কার্যকর। বেদনার বিষয় হলো, দেশের উচ্চশিক্ষিত ও মধ্যবিত্তদের কিছু ব্যতিক্রম বাদে প্রায় পুরোটাই ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার প্রতি ঝুঁকে রয়েছে। এ ধারা বাড়ছে তো বটেই, নিম্ন মধ্যবিত্তের মধ্যেও এ প্রবণতা সংক্রমিত হচ্ছে। ফলে দেশের জনসংখ্যার সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশটাই বাংলা ভাষাবিমুখ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠছে। এসব নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো ‘বিকার’ না থাকলে ভবিষ্যতে অন্ধকার আরো গাঢ় হবে! অথচ বাঙালি রাষ্ট্রগঠনের আঁতুড়কালেই ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার ভাষা সমস্যা’ বিষয়ে প্রবন্ধে বাংলা, উর্দু, আরবি ও ইংরেজি ব্যবহারের যৌক্তিকতা ও উপযোগিতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিয়েছেন। বাংলা সম্পর্কে বলেন : ‘হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রত্যেক বাঙালির জন্য প্রাথমিক শিক্ষণীয় ভাষা অবশ্যই বাংলা হইবে। ইহা জ্যামিতির বিষয়ের ন্যায় স্বতঃসিদ্ধ। উন্মাদ ব্যতীত কেউই ইহার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে পারে না। এই বাঙলাই হইবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা।’
আরবি সম্পর্কে বলেন : ‘মাতৃভাষার পরেই স্থান ধর্মভাষার, অন্তত মুসলমানের দৃষ্টিতে। কিন্তু বর্তমানে আরবি পাকিস্তান রাষ্ট্রের একটি বৈপ্লবিক ভাষা ভিন্ন একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের যথেষ্ট অন্তরায় আছে।’
উর্দু সম্পর্কে বলেন : ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে যোগ স্থাপনের জন্য, যাঁহারা উচ্চ রাজকর্মচারী কিংবা রাজনৈতিক হইবেন, তাঁহাদের জন্য একটি আন্তঃপ্রাদেশিক (ইন্টারপ্রোভেন্সিয়াল) ভাষা শিক্ষা করা প্রয়োজন। তজ্জন্য উর্দুর আবশ্যকতা আছে। এই জন্য রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উচ্চ রাজকর্মচারী ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী প্রত্যেক নাগরিকেরই উর্দু শিক্ষা করা কর্তব্য।’
ইংরেজি সম্পর্কে বলেন : ‘আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে একটি আধুনিক প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে দেখতে চাই। তজ্জন্য ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান বা রুশ ভাষাগুলির মধ্যে যে কোনো একটি ভাষা আমাদের উচ্চশিক্ষার পঠিতব্য ভাষারূপে গ্রহণ করিতে হইবে। এই সকলের মধ্যে অবশ্য আমরা ইংরেজিকেই বাছিয়া লইব। ইহার কারণ দুইটি (১) ইংরেজি আমাদের উচ্চশিক্ষিতদের নিকট সুপরিচিত; (২) ইংরেজি পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক প্রচলিত আন্তর্জাতিক ভাষা।’
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উর্দুর ‘ভূত’ আমাদের মাথা থেকে গেলেও বাকিরা চেপে বসেছে সিন্দবাদের দৈত্যের মতো। যার আগ্রাসনে মাতৃভাষা বাংলা আজ কোণঠাসা হতে বসেছে। ভাষা আন্দোলনের বয়স সাত দশক পেরিয়েছে, স্বাধীনতার বয়স পাঁচ দশক। অথচ এখনো আমরা বাংলার প্রচলন সর্বত্র করতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের—‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শিক্ষার পত্তন’, আমরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে আওড়াই বটে এ বাক্য। কিন্তু এজন্য কী করণীয় তা ঠিক করা, উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা দরকার; তার কিছুই কি আমরা করতে পেরেছি?
হোসেন শহীদ মজনু: বার্তা সম্পাদক, বণিক বার্তা










