ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে দুই খণ্ডের History of Bengal প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে একমাত্র মুসলমান লেখক ছিলেন আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ। অর্থাৎ এমন একাডেমিক একটা গ্রন্থে লেখার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ইতিহাসবিদ বাংলার মুসলমানদের মধ্যে সেকালে তেমন ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হিন্দু শিক্ষকরা চলে যাওয়ায় যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলো শিক্ষকের অভাবে খাঁখাঁ করছিল তখন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দায়িত্ব নিতে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৫০ সালে। কেবল চাকরি সূত্রে নয় বরং নিজের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি চারটি লেখা প্রকাশ করেছিলেন ১৯৪০-৪৮ সালের মধ্যে। সে লেখাগুলো থেকে বোঝা যায় কতটা আন্তরিকতা, দরদ আর বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিকের দৃষ্টি দিয়ে তিনি বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। শুধু পর্যবেক্ষণ নয়, আপনজন হিসেবে কিছু পরামর্শ‌ও দিয়েছিলেন, যেগুলো এখনো আমাদের জন্য পাথেয়। 

বাংলার মুসলমানদের মধ্যে যে পরমতসহিষ্ণুতা রয়েছে তার মূল কারণ হিসেবে আমাদের ইতিহাসে সুফিদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসারকেই মোটা দাগে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ সুফিদের আগমনের কয়েকশ বছর আগেই পেয়েছেন পরমতসহিষ্ণুতার খুঁটি। তিনি লিখেছেন: “পশ্চিম এশিয়া থেকে এই নতুন জীবনাদর্শের বাণী বাংলায় প্রথম এসেছিল স্থলপথে নয়—সমুদ্রপথে এবং এর বাহক তুর্কি-ইরানি নয়—আরব। অন্য জাতির তুলনায় আরবরা সবচেয়ে বেশি পরধর্মসহিষ্ণু এবং প্রভাবগ্রাহী; পাকা ব্যবসাদার হিসাবে বণিক স্বার্থের সম্ভাব্য ক্ষতি করে, একাগ্রভাবে ধর্মমত প্রচার করতে তাদের কোনোকালেই উৎসাহ ছিল না। ফলে এখানে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভাব, বিশ্বভ্রাতৃত্বের ও যুক্তিবাদিতার অলক্ষ্য প্রসার‌ই হয়েছিল বেশি।” (হবিবুল্লাহ: ১৯৭৪, ১৩৮) অর্থাৎ, সমুদ্রপথে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আরবদের বাংলায় আগমন ও ইসলাম প্রচারের যে ছিটেফোঁটা ইতিহাস পাওয়া যায় সেখানেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন পরমতসহিষ্ণুতার খুঁটি। যে খুঁটি শতকের পর শতক মজবুত হয়েছে সুফিদের মাধ্যমে। 

বাংলার মুসলমানদের এই পরমতসহিষ্ণুতাকে তিনি কেবল একটি লক্ষ্মণ হিসেবে চিহ্নিত করেননি, একটি সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ হিসেবে পেশ করেছেন। এই বুনিয়াদ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মোগলের মতো ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও সে যুদ্ধ করতে পিছপা হচ্ছে না। হবিবুল্লাহর মতে, দিল্লির বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করে বাংলায় স্বাধীন সুলতানদের যে মসনদ প্রতিষ্ঠা তার পেছনে আরবদের সেই শতকের পর শতক ধরে তৈরি করা সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তিনি লিখেছেন: “বাংলা কোনোকালেই উত্তর ভারতের রাষ্ট্রীয় বন্ধন স্থায়ীভাবে গ্রহণ করেনি, এ ঐতিহাসিক ট্রেডিশনের সঙ্গে উপরোক্ত আরব-মুসলিম সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ একীভূত হ‌ওয়ায় বিদেশী জাতি ও মানসিকতার প্রতীক দিল্লির সঙ্গে বাঙালির বিরোধ একরকম সহজাত হয়ে দাঁড়াল।” অর্থাৎ আরবের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণের ফলে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক বীজ বপন হয়েছিল তার একটা বড় ভূমিকা ছিল দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পেছনে। দিল্লির বিরুদ্ধে এই আরব প্রভাবিত সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ কতটা শক্তিশালী ছিল তার দৃষ্টান্তে হবিবুল্লাহ উল্লেখ করছেন: “মুসলমানের সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এই প্রাদেশিক স্বাতন্ত্র্যবোধ কোন পথে আত্মবিকাশ করতে আরম্ভ করেছিল তার কতকটা আভাস পাওয়া যায়—তুর্কি বা ফার্সির পরিবর্তে শিলালিপি ও মুদ্রায় আরবি ভাষা, প্রকাশভঙ্গি ও সংকেতের একচেটিয়া ব্যবহারে।” এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “এখনকার লৌকিক ইসলামের সঙ্গে উত্তর ভারতের বিরাট পার্থক্য, আজকের বাঙালি-মুসলমানের মানসে ইরানি বা উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব কতটা ক্ষীণ, তার চিন্তার পদ্ধতিতে ইসলামীয়তার চেয়ে প্রাদেশিক বাঙালিত্বের অংশ বেশি কেন, এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে মুসলিম বাঙলার এই প্রাথমিক অবস্থার কথা মনে রাখলে।” হবিবুল্লাহর মতে বাংলার মুসলমানদের সাংস্কৃতিক মানস সুলতানি কিংবা মোগল আমলের তৈরি নয় বরং ভারতে মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাসিলের আগে আরব বণিকদের ইসলাম প্রচারের আমলে তৈরি। বলা যায়, ইতিহাসবিদ হিসেবে তিনি বাংলার মুসলমানের সাংস্কৃতিক পাটাতনকেও ইতিহাসের ছাঁচে ফেলে বিশ্লেষণ করেছেন। তার বিশ্লেষণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলামতের চেয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাই প্রাধান্য পেয়েছে। বস্তুত এখানেই ইতিহাসবিদ হিসেবে আবু মহামেদ হবিবুল্লাহর স্বতন্ত্র স্বাক্ষর বিশেষভাবে লক্ষণীয়। 

বাংলার মুসলমানের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তার আরেকটি স্বতন্ত্র জায়গা আছে। ইংরেজদের হাতে মোগল সাম্রাজ্যের পতনে মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বয়ান আমরা শুনি সেখানে হবিবুল্লাহ দেখছেন ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা’। কীভাবে? তিনি বলছেন: “মোগল সাম্রাজ্যের ভাঙনের সময় থেকেই বাঙালার সঙ্গে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ক্ষীণ হয়ে পলাশীতে একেবারে লুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এই সংস্কৃতির ধারাও রুদ্ধ হয়ে গেল। বাঙলার মুসলমান নগরগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় মুসলমান অভিজাতরা যখন নগর ছেড়ে গ্রামে ও ইংরাজের ব্যবসায় কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলো, তখন থেকেই বাঙলায় মুসলমান সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা।” অর্থাৎ পলাশীর আগে বাংলার মুসলমানদের সংস্কৃতি কখনো আরবিনির্ভর আবার কখনো ফারসি; কিন্তু এখন এই প্রথম বাংলার মুসলমান আরবি ও ফার্সি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের দিকে তাকাতে এক রকম বাধ্য হলো। পলাশীতে ভারতীয় মুসলমানদের বিপর্যয়ের কারণে যে বাংলার মুসলমান এই প্রথম নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজের ওপরই আস্থাবান হতে বাধ্য হলো তা ইতিহাসবিদ হবিবুল্লাহর দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি ধরতে পেরেছিলেন: “গ্রামে বাস করতে বাধ্য হ‌ওয়ায় মুসলমান সমাজের নেতাদের গ্রাম্য জীবনধারার সঙ্গে বাঙলার নিজস্ব সম্পদ তার কাব্য ও সংগীত, প্রেমভক্তিমূলক ধর্ম ও লোকসাহিত্য, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, নিসর্গবৈচিত্র্য অতিন্দ্রীয় রহস্যসন্ধানী মন—সাক্ষাৎভাবে সর্বপ্রথম পরিচিত হবার সুযোগ হলো। তার থেকে একদিকে যেমন নিম্নশ্রেণীর গ্রাম্য মুসলমানের সঙ্গে অভিজাতদের একাত্মবোধ জন্মাল অন্যদিকে তেমনি বাঙালি পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে মুসলমান সংস্কৃতির ফার্সি চেহারা লুপ্ত হতে আরম্ভ করল।” এখানে মূলত ‘নিম্নশ্রেণীর গ্রাম্য মুসলমানের সঙ্গে অভিজাতদের একাত্মবোধ’ জন্মানোর ফলে তাদের পারস্পরিক সহযোগিতায় উনিশ শতকের শেষার্ধে ও বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার মুসলমানের যে একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তার প্রতি নির্দেশ করেই পলাশীর বিপর্যয়কে হবিবুল্লাহ বলেছেন ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা’। যেখানে আমরা দেখি মীর মশাররফ হোসেন বাগদাদ থেকে আসা পূর্বপুরুষের বংশধর হয়েও সব রচনা লিখছেন বাংলায় ; কবি নজরুল পীর বংশের সন্তান হয়েও কিশোর বয়স থেকেই বাংলা লেখা শুরু করেছেন। বাগদাদ থেকে আগত পূর্বপুরুষের বংশধর এবং জমিদার হয়েও ন‌ওয়াব ন‌ওয়াব আলী চৌধুরী কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই ইংরেজ সরকারকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন, “ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক না কেন, বাংলার রাষ্ট্রভাষা বাংলা-ই করতে হবে।” এই যে অভিজাত মুসলমানদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি এত দরদ তা পলাশীর পূর্বে কল্পনাও করা সম্ভব ছিল না, যা হবিবুল্লাহ কথিত ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা’-কেই সমর্থন করে। 

পলাশীতে হবিবুল্লাহ ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা’ দেখলেও তা যে বঙ্গভঙ্গের পর ‘রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রভাবে’ থেমে গেল তাও তিনি দেখেছেন। হিন্দু-মুসলমানের স্বাতন্ত্র্যবাদী রাজনীতির কারণে যখন বাংলার মুসলমান ‘বাঙালিত্ব বর্জন ও উত্তর ভারতের সঙ্গে ভাষা এবং আন্দোলনগত যোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা’ করছিল তখন তিনি বললেন, বাংলার মুসলমানের সংস্কৃতি হবে বাঙালি সংস্কৃতি এবং এই কথার উচ্চারণে গত ১০০ বছর  বাঙালিত্বের সংজ্ঞা নিয়ে যে বিতর্ক চালু রয়েছে তাতে শরিক হয়ে তিনি বললেন, “বাঙলার সংস্কৃতি হিন্দুপ্রধান হবে না, মুসলমানপ্রধান‌ও হবে না, এ হবে বাঙালিত্বপ্রধান—যে বাঙালিত্বের বিকাশে, পুষ্টি ও সংরক্ষণে মুসলমানের ধারাবাহিক ঐতিহাসিক সক্রীয়তা হিন্দুর চেয়ে অধিক না হলেও সমতুল্য ত বটেই‌।” অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলমানের একটি মিলিত সংস্কৃতির প্রতিই ছিল তার পক্ষপাত। সঙ্গে সঙ্গে উনিশ শতকের যে হিন্দুপ্রধান আগ্রাসী বাঙালিত্বের প্রতি মুসলমানদের অভিযোগ তাকেও তিনি সাদরে কবুল করেছেন। তিনি বলেন: “এতে দ্বিমত নেই, বর্তমান বাঙলার সাংস্কৃতিক জীবনে, উপরে যে বাঙালিত্বের কথা বলেছি, তার সর্বাঙ্গীণ প্রকাশ নেই, এ কালচার হিন্দু প্রভাবিত। মুসলমানের অংশগ্রহণ বা অংশ স্বীকৃতির প্রতিফলন এতে নেই এবং সেজন্য এ সংস্কৃতি পুরোপুরি বাঙালি নয়।” যে সংস্কৃতিতে বাংলার মুসলমানের ‘অংশগ্রহণ বা অংশ স্বীকৃতির প্রতিফলন’ নেই সে সংস্কৃতিকে তিনি ‘পুরোপুরি বাঙালি’ মানতে রাজি নন। তার মতে, ‘মুসলমানের দান যুক্ত হয়েই বাঙালি সংস্কৃতি সর্বাঙ্গীণ পুষ্টতা লাভ করবে।’ 

আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ এ ভাবনাগুলো প্রকাশ করেছেন পঞ্চাশের দশকে, তার ভাষায়—‘বাংলার মুসলমান যখন পাকিস্তান-জ্বরে বিকারগ্রস্ত’। আজ ইতিহাসের বাস্তবতায় পাকিস্তানের বিকারগ্রস্ততা ভেঙে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার‌ও বয়স পেরিয়ে গেছে পঞ্চাশ, কিন্তু বিতর্ক এখনো চলমান ‘বাঙালি মুসলমান’ প্রসঙ্গে। ইতিহাসবিদের চোখে বাংলার মুসলমানদের যে সাংস্কৃতিক ধারা তিনি চিহ্নিত করেছেন, আজ‌ও তার অতিক্রম তো দূরের কথা, আলোচনায়ও উল্লেখ হয় না। হবিবুল্লাহর মতো প্রাজ্ঞ ঐতিহাসিক এবং দরদী মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বকে যখন স্মরণ করা হয় না তখন টিপ আর হিজাব নিয়ে সাংস্কৃতিক কুতর্কে জড়ানোই হয় আমাদের নিয়তি। 


মোহাম্মদ আবু সাঈদ

লেখক ও গবেষক