কাশ্মীরের শ্রীনগরের এক সরু গলির পুরনো এক কর্মশালায় দিন কাটে গোলাম মোহাম্মদ জাজের। বয়স আশির কোঠায়। ধারণা করা হয়, উপত্যকায় হাতে তৈরি সন্তুর বানাতে পারেন এমন শেষ ব্যক্তি তিনিই।
সন্তুর এক ধরনের ত্রিভুজাকৃতি তারযন্ত্র বা ততযন্ত্র, যা হাতের ছোট কাঠি দিয়ে বাজানো হয়। কাঠির আঘাতে এর তারগুলো থেকে তৈরি হয় সুর। শতাব্দী ধরে কাশ্মীরি সঙ্গীতে সন্তুরের বিশেষ জায়গা রয়েছে। জাজ পরিবার সাত প্রজন্ম ধরে সন্তুর ছাড়াও রাবাব, সারেঙ্গি ও সেতারের মতো ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে আসছে।
তবে সময় বদলেছে। স্বল্পদামে দ্রুত তৈরি হওয়া যন্ত্রের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে হাতে তৈরি সন্তুরের কদর। সেইসঙ্গে আধুনিক সঙ্গীতধারার প্রসারে ঐতিহ্যবাহী সুর থেকে মুখ ফিরিয়েছে নতুন প্রজন্ম।
স্থানীয় সঙ্গীতশিক্ষক শবির আহমেদ মির বলেন, ‘হিপহপ, র্যাপ, ইলেকট্রনিক সাউন্ডের যুগে তরুণরা আর ঐতিহ্যবাহী সুরের গভীরতা বা শৃঙ্খলার সঙ্গে নিজেদের সংযোগ খুঁজে পায় না। এতে শুধু সন্তুর নয়, হারিয়ে যাচ্ছে সেই শিল্পও, যেগুলো গড়ে উঠেছিল শতাব্দীর সাধনায়।’
ঘুলাম মোহাম্মদ বলেন, ‘এখন আর কেউ নেই যে এ শিল্প শিখতে চায়। আমি-ই শেষ ব্যক্তি।’ অথচ এক সময় তার তৈরি সন্তুর বাজিয়েছেন পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, ভজন সোপোরির মতো কিংবদন্তিরা। এমনকি ২০২২ সালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে পদ্মশ্রী পুরস্কারও গ্রহণ করেছেন।

২০২২ সালে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা গ্রহণ করেন গোলাম মোহাম্মদ, ছবি: বিবিসি
শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, এটি ছিল এক গভীর শৈল্পিক সাধনার ফল। কাঠ বাছাই থেকে শুরু করে কাঠের পরিপক্বতা, কাঠামো খোদাই, ২৫টি ছোট সেতু (ব্রিজ) বসানো, ১০০টির বেশি তার যুক্ত করা—প্রতিটি ধাপে লাগে ধৈর্য আর সংবেদনশীলতা। ঘুলাম মোহাম্মদের ভাষায়, ‘এটা কেবল কাঠের কাজ নয়, এটা কবিতা। এটা এমন এক ভাষা, যা আমি সন্তুরের হাতে তুলে দিই।’
সন্তুর শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়—প্রতিটি যন্ত্র তৈরি হয় অনেক যত্ন, ধৈর্য ও শিল্পচর্চার মাধ্যমে। শুরুতেই বেছে নিতে হয় ভালো মানের কাঠ, যা অন্তত ৫ বছরের পরিপক্ব হতে হয়। এরপর কাঠটি খোদাই করে তৈরি করা হয় কাঠামো। এতে ২৫টি ছোট কাঠের টুকরো বসাতে হয়, যেগুলোকে 'ব্রিজ' বলা হয়—এসবের ওপর দিয়েই তারগুলো টানা হয়। একটি সন্তুরে শতাধিক তার থাকে, যেগুলো ঠিকভাবে লাগানো ও সুর ঠিক করতে অনেক সময় লাগে। ঘুলাম মোহাম্মদ বলেন, ‘এটি কেবল কাঠের কাজ নয়, বলা যেতে পারে কবিতা। আর কবিতার ভাষা আমি সন্তুরে গেঁথে দেই।’
তার ইচ্ছা, কেউ এই শিল্পকে ভালবেসে এগিয়ে নেবে। শুধু অর্থ বা খ্যাতির জন্য নয়, সুরের প্রতি ভালোবাসা থেকে। তার তিন মেয়েই অন্য পেশায়, পরিবারে কেউ উত্তরসূরির ভার কাঁধে নিচ্ছে না। সরকার ও হস্তশিল্প বিভাগ থেকে নানা প্রতিশ্রুতি এলেও তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি।
আজকের ডিজিটাল যুগে তার কর্মশালায় নেই কোনো যন্ত্রপাতি—আছে শুধু কাঠ, কাঠের গন্ধ আর স্মৃতিতে গাঁথা সুর। সামাজিক মাধ্যমে তার কথা ছড়ালেও কার্যকর উদ্যোগের অভাব বোধ করেন তিনি।
সন্তুরের পাশে বসে ঘুলাম মোহাম্মদ বলেন, ‘সঙ্গীত আর কাঠ—দু’টোই মরে যায় যদি সময় না দেয়া হয়।’
বিবিসি অবলম্বনে










