প্রকৃতির নিয়মে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলাতে থাকে। আসে একের পর এক নতুন বছর। বয়ে যাওয়া সময়ের সঙ্গে জনজীবনেও অনেক পরিবর্তন ঘটে। যে কারণে পুরনো ও নতুন বছরের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জীবনের নানা বাঁকে চোখ রাখা মানুষের সহজাত স্বভাব হয়ে ওঠে। বছরের শেষ দিন কিংবা শুরুতেই মানুষ বসে পড়ে আত্মসমালোচনায়। যাপিত জীবনের ভুল-ত্রুটি শুধরাতে কিংবা জীবনকে কোনো সুন্দরের দিকে নিয়ে যেতে নেয় নতুন নতুন লক্ষ্য। প্রচলিত ভাষায় যাকে বলে ‘নিউ ইয়ার রেজল্যুশন’। ডায়েরি কিংবা নোটপ্যাডে লিখে রাখা হয় সেসব রেজল্যুশন। কিন্তু বছরের প্রথম দিনগুলোয় লক্ষ্য পূরণে যতটা উচ্ছ্বাস ও দৃঢ়তা চোখে পড়ে, ধীরে ধীরে তাতে ছেদ ঘটতে দেখা যায়। এমনকি জানুয়ারির মাঝামাঝিতে এসেই অনেকে হার মেনে নেয়। ফলে নিজের সঙ্গে করা নিজের প্রতিশ্রুতি অধরা থেকে যায়। এ কারণে জানুয়ারির দ্বিতীয় শুক্রবারকে অভিহত করা হয়েছে ‘কুইটার’স ডে’ নামে।

জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এসে লক্ষ্য পূরণের পথ থেকে ছিটকে পড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এর অন্যতম কারণ হলো বেশির ভাগ মানুষ বাস্তবতার নিরিখে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে যা করণীয় বা প্রচলিত (ট্রেন্ডি), সেগুলোকেই লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। যেমন শরীর চর্চা, ডায়েট করা ইত্যাদি।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব কাজের জন্য বছরের শুরুর দিকে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ মোটিভেশন অনুভূত হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই মোটিভেশন কমতে থাকে। অন্যদিকে, ততদিনে লক্ষ্য অর্জনের কাজের অভ্যাস গড়ে ওঠে না। আর পরবর্তী সময়ে মোটিভেশনও পাওয়া যায় না। আবার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও তা কীভাবে পূরণ করবে সেই পথ অনুসন্ধানে কম মনোযোগী থাকে অনেকেই। এর পাশাপাশি সময়ের পরিক্রমায় নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে পড়ে যায় মানুষ, যা তাদেরকে লক্ষ্য থেকে বিছিন্ন করে ফেলে। অর্থাৎ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে লক্ষ্য পূরণে যা করা প্রয়োজন সেই কাজের ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটে। এতে নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে এবং হাল ছেড়ে দেয়।

কিন্তু কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারার কারণে নিজেকে ব্যর্থ ভাবা ঠিক নয় বলেই অভিমত বিশেজ্ঞদের। জীবন কারো নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কিন্তু জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতি প্রতিক্রিয়া কেমন হবে তা মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। তাই কোনো ঘটনা প্রবাহে না আটকে থেকে, বার বার ঘুড়ে দাঁড়ানোই হতে পারে লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

এজন্য প্রয়োজন যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি বা ঘটনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। মনে রাখা প্রয়োজন, একই গন্তব্যে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে পৌঁছাতে পারে। তাই হার না মেনে প্রয়োজন হলো নিজের জীবন যাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করা। লক্ষ্য না বদলে, পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা যেতে পারে। আর সেই পরিকল্পনা মোতাবেক একটা জীবন যাপনের পদ্ধতি গড়ে তোলার অভ্যাস গড়তে হবে। হতে পারে এ কারণে বহুল আলোচিত বই ‘অ্যাটমিক হ্যাবিটস’ এর লেখক জেমস ক্লিয়ার উল্লেখ করেছিলেন, ‘You don’t rise to the level of your goals; you fall to the level of your systems’।

তাই কুইটার’স ডে হোক আত্মসমালোচনার। হার না মেনে বরং আরেকবার নিজের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে বসা যেতে পারে।