হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হয়েছে। কিন্তু দেশে এখন নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও নব্য স্বৈরাচার- দুই শক্তিকেই পরাজিত করা হবে। ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। অন্যথায় আন্দোলনের কর্মসূচি আরো বিস্তৃত করা হবে।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, সন্ত্রাস-রাহাজানিতে দোকানদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ- সবার জীবন আজ নাজেহাল। দেশে বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। দেশের সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা দিতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় সবচেয়ে বেশি বর্তায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ওপর। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধনের কাজে ব্যস্ত হয়েছেন। গণভোটের গণরায় বাদ দিয়ে তিনি সংবিধান কাটাছেড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। চলমান নৈরাজ্য ও গুম–খুনের দায় নিয়ে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। সঙ্গে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকেও পদত্যাগ করতে হবে। কারণ দুজনই তাদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন।’

তিনি আরো বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে। অবিলম্বে এ কমিটি বাতিল করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।

সরকার গঠনের প্রথমদিন থেকেই বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহার, ৩১ দফা ও জুলাই সনদে দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে বিএনপি। তারেক রহমানের দেশ পরিচালনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। সরকার দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, কীভাবে দেশে দুর্নীতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারত্ব কায়েম করা হবে, সেই পরিকল্পনা নিয়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ঢাকায় এসেছেন। আমরা এক স্বৈরাচারকে বিদায় করে এখন নতুন স্বৈরাচারের উত্থান দেখছি। কিন্তু জনগণের সামনে আমাদের প্রতিশ্রুতি, পতিত স্বৈরাচার এবং এই নব্য স্বৈরাচার—এই দুই স্বৈরাচারকেই আমরা পরাজিত করব, ইনশাআল্লাহ।

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে নাহিদ বলেন, আগামী ডিসেম্বরে শুনছি পতিত স্বৈরাচার নাকি আসবে দেশে! আমরা জানি, সেই স্বৈরাচারকে এই নতুন স্বৈরাচার কোনোভাবেই মোকাবেলা করতে পারবে না।...তাই বাংলাদেশের তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের জনগণকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গেও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র চলছে। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, পাহাড়ে অশান্তি এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের নিপীড়নের বিষয়গুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

সীমান্ত হত্যা, পাহাড়ে অশান্তি, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের নির্যাতন, দিল্লিতে মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ভারতের চক্রান্ত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পারবে না। জাপানে গিয়ে আবারও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে অবৈধ করিডর ভারতের হাতে তুলে দেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তারেক রহমান। এ ধরনের কোনো অবৈধ করিডর বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না।

এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, আগামী ডিসেম্বরে যদি গঙ্গা চুক্তি ন্যায্যভাবে নতুন করে তৈরি করা না হয়, বাংলাদেশের জনগণ আবারও মাঠে নামবে। এবার আমরা গঙ্গা চুক্তিতে কোনোভাবেই বিন্দু পরিমাণ আমাদের ন্যায্য হিস্যায় ছাড় দেব না’ বলে উল্লেখ করেন নাহিদ।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদর কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা–৮ আসনে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছিল। ইনশাআল্লাহ, এবার আমরা তাঁকে হারাতে দেব না। আসিফ মাহমুদকে পরিকল্পনা করে নির্বাচনের বাইরে রেখে যারা ভেবেছিল গণ–অভ্যুত্থানের শক্তিকে নিঃশেষ করে দেবে, তারাও ইনশাআল্লাহ এবারের স্থানীয়

এদিন বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর বাজানো হয় জাতীয় সংগীত। পরে এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ আল আমিন, আতিক মোজাহিদ, আবদুল হান্নান মাসউদ ও নুসরাত তাবাসসুম সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেননি।