এটা সবাই জানেন যে, যদি ঠাণ্ডা লাগে, তাহলে গান গাওয়ার সময় গলার ওপর অস্বস্তিকর চাপ পড়ে। কিন্তু এটা কি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর? মহামারীর অভিজ্ঞতা যোগ করে এও বলা যায়, কভিডজনিত গলার সংক্রমণও কি গায়কদের দীর্ঘমেয়াদে বা স্থায়ীভাবে ভোগাতে পারে?

যুক্তরাজ্যের ওয়েক্সহ্যাম পার্ক হাসপাতালের ভয়েস ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞ ডেক্লান কস্টেলো বলছেন, যদি আপনি সর্দি কিংবা কভিডজাতীয় ফ্লুতে আক্রান্ত হন, তাহলে আপনার গান না গাওয়াই ভালো।

শ্বাসকষ্ট কভিডের একটি সাধারণ উপসর্গ। করোনাভাইরাসের কিছু সাম্প্রতিক রূপ যেমন ওমিক্রন স্বরযন্ত্রের চারপাশে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

কভিড মহামারী সঙ্গীতশিল্পীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর গলার সমস্যায় ভুগেছেন। এমনকি কারো কারো দীর্ঘমেয়াদে গলার স্বরও পরিবর্তন হয়ে গেছে।

যদি সর্দি বা ফ্লুতে গলার সাইনাস বা ওপরের অংশ সংক্রমিত হয়, তাতে স্বরের কোনো ক্ষতি হয় না। ব্যাকটেরিয়াজনিত টনসিলাইটিস হয়ে থাকলেও স্বর ঠিকমতো কাজ করে। ডেক্লান কস্টেলো জানান, তার কাছে বিভিন্ন ধরনের রোগীরা আসেন, তারা অনেকেই স্বরযন্ত্রের এ ধরনের সমস্যায় ভোগেন। তবে স্বরযন্ত্রের ওপরের অংশে সমস্যা হওয়ায় তারা গান গাইতে বা উচ্চশব্দে চিৎকার করতে কোনো সমস্যা বোধ করেন না।

এ চিকিৎসক বলেন, অবরুদ্ধ সাইনাস বা গলা ব্যথা আপনার গানের গলায় তেমন প্রভাব ফেলবে না। তবে আপনার নাক যদি বন্ধ থাকে, সেক্ষেত্রে আপনি হয়তো গান গাইতে পারবেন না, বা আপনার উচ্চারণ বা স্বরও ঠিকমতো কাজ করবে না। তাছাড়া কভিডজনিত সংক্রমণের কারণে এ ধরনের সমস্যা হলে সংক্রমণ ছড়ানো এড়াতেও আপনার গানের রিহার্সাল এড়িয়ে চলা উচিত।

ভয়েস ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞ ডেক্লান কস্টেলো বলেন, সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ, যেমন ঠাণ্ডা বা ফ্লু কখনো কখনো ল্যারিনজাইটিস নামে পরিচিত একটি অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে, যার ফলে বাকযন্ত্রের প্রদাহ এবং ভোকাল কর্ড ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। আর এর লক্ষণ শুরু হতে পারে গলাভাঙা, ব্যথা ও কাশি দিয়ে। 

এসব ক্ষেত্রে সাধারণত গায়কদের গলা বিশ্রামে রাখতে বলা হয়। চিকিৎসকরা ওই সময়ে তাদের গান-বাজনা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।

মিনেসোটা মেডিকেল স্কুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অটোল্যারিঙ্গোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডেইরডে মাইকেল বলেছেন, এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে আপনার অপেক্ষা করা উচিত নয়। সঙ্গে সঙ্গেই কণ্ঠের বিশ্রামে চলে যাওয়া উচিত। ল্যারিনজাইটিস জাতীয় সমস্যার জন্য ব্যথা প্রথম কথা নয়। ব্যথা নাও হতে পারে। প্রথমে হয়তো আপনার গলা ভাঙবে, এরপরও যদি আপনি বিশ্রামে না যান বা আপনার কণ্ঠের পেশিগুলোকে চাপ দিতে থাকেন, সেক্ষেত্রে হয়তো ব্যথা হতে পারে।

পেশাদার গায়করা তাদের গলার মাঝামাঝি ও নিম্নাঞ্চলে চাপ প্রয়োগ করেন, এসব ক্ষেত্রে তাদের কণ্ঠস্বর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। করোনা বা ফ্লুতে আক্রান্ত অবস্থায় এমন হলে শুরুতেই যদি নজর দেয়া না হয়, সেক্ষেত্রে হয়তো দীর্ঘমেয়াদে ভোকাল কর্ড নষ্ট হয়ে যেতে পারে বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর।

চিকিৎসকরা বলছেন, ল্যারিনজাইটিসে আক্রান্ত হলে সাধারণ লোকজনদের চেয়ে গায়কদের বেশি সচেতন থাকা উচিত। কারণ, গায়করা সাধারণত উচ্চাঙ্গের কর্ড ব্যবহার করেন। যদি উচ্চাঙ্গে কণ্ঠ নিতে গায়করা তাদের ঠেলাঠেলি চালিয়েই যান, সেক্ষেত্রেই সমস্যাটি হয়। অনেকটা এমন, যদি পা মচকে যাওয়ার পর আপনি দৌড়াদৌড়ি করেন, তাহলে আপনার সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। পরে চিকিৎসা করেও এটিকে আর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় না।

এসব ক্ষেত্রে গলা শুকিয়ে থাকে। তাই প্রচুর পানি পান করা এবং বিশ্রামে থাকার কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া সামান্য পর্যায়ের কাশি এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, অল্পকিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়তে পারে অপারেশনেরও। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, বিশ্রামের পাশাপাশি হালকা কণ্ঠশীলন করা যেতে পারে। বিশ্রাম মানে বোবা হয়ে যাওয়া নয়।

বিবিসি অবলম্বনে