দুই হাতে বসে আছে উজ্জ্বল রঙিন পালকের দুটি ম্যাকাও। লম্বা লেজ দোল খেয়ে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে আলবি রামলির জামা। পাখি দুটিকে হাতে নিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন তিনি। পেছনের সিটে কাঠের বাক্সে অপেক্ষা করছে আরো ছয়টি পাখি। গন্তব্য রামলির বাড়ির কাছের খোলা মাঠ, যেখানে প্রতিবেশী শখের ম্যাকাওপ্রেমীদের সঙ্গে জড়ো হয়ে চলে উড়াল আর ঘরে ফেরার প্রশিক্ষণ।

ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ জাকার্তার গ্রামীণ এলাকার মাঠটি যেন দিনে দিনে হয়ে উঠেছে পাখি আর তাদের পালনকারীদের প্রাণের আড্ডাখানা। সেখানে ৩৩ বছর বয়সী রামলি বাঁশির শব্দে পাখিগুলোকে ওড়ার নির্দেশনা দেন। ঠিক তিন মিনিটের ভেতর ফিরে এলে পুরস্কার মেলে আদরমাখা স্পর্শ ও খাবার। শৃঙ্খলা, সমন্বয় ও মানুষের সঙ্গে পাখির সম্পর্ক—সব মিলিয়ে চলতে থাকে অনুশীলন।

macaw

বাড়ির কাছের মাঠে ম্যাকাওপ্রেমীদের সঙ্গে প্রশিক্ষক রামলি, ছবি: এপি

রামলির গল্প শুরু হয় ২০১৮ সালে। ছোট পারাকিট পোষা থেকেই তার পাখির প্রতি টান তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাঁচা থেকে বের হয়ে উড়ে আবার প্রশিক্ষকের কাছে ফিরে আসা ম্যাকাওয়ের ভিডিও দেখেই তার স্বপ্নের বুনন হয়। তিনি তখন মোটরসাইকেল মেকানিক। কিন্তু মনে হলো, যদি বড় পালকের এ বর্ণিল পাখিদের সঙ্গে সারাদিন কাটানো যেত! ২০২০ সালে সেই সুযোগ এল। এক বিরল পাখির মালিক তার কাছে রাখল জোরোকে—নীল আর সোনালি পালকের অপরূপ ব্লু অ্যান্ড গোল্ড ম্যাকাও। জোরোকেই প্রথম প্রশিক্ষণ দেন রামলি। সেখান থেকেই শুরু তার নতুন জীবন।

এখন রামলির ঘরের পাশের অংশটুকুই যেন ম্যাকাওদের স্কুল। তিনি ১৮টি পাখি সামলান। প্রতিটির আলাদা নাম, আলাদা স্বভাব। আছে লেক্সাস—লালের মুকুটধারী শ্যামরক ম্যাকাও। আছে ওয়েল—কমলার ছোঁয়ায় চেনা শ্যামলেট। খাবার দেয়া থেকে পালক ছাঁটা, সপ্তাহে দুই দিন খাঁচা পরিষ্কার—সবই নিয়ম মেনে হয়। রামলি বলেন, ‘এরা মানুষ থেকে আলাদা কিছু না। কেউ দ্রুত বুঝে, কেউ একটু সময় নেয়।’

macaw

ম্যাকাওদের বসার স্ট্যান্ড পরিষ্কার করছেন রামলির সহযোগী, ছবি: এপি

পাখিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় রামলি নিজেকে ঝাঁকের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রতিযোগিতায় যত দূরেই উড়ুক, বাঁশির ডাক বা ইশারায় তারা ফিরে আসে তার কাছেই। প্রশিক্ষণের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কোনো পারিশ্রমিক নেন না। মালিকরা যে পরিমাণই দিতে চান, সেটাই গ্রহণ করেন তিনি। সঙ্গে আছে দুই সঙ্গীর সহায়তা। পুরস্কার জেতাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। রামলি চান প্রতিদিনের যত্ন আর পরিশ্রমের ফল সবাইকে দেখাতে।

তবে এ ভালোবাসার ভিত শুধু শখ নয়, গর্বও আছে সেখানে। দামি পাখি সামলানোর দায়িত্ব তাকে তৃপ্তি দেয়। রামলি বলেন, ‘আমি পাখি খুব ভালোবাসি। আর সেটার সঙ্গে গর্বও আছে। এত দামের পাখি যত্নে রাখা! এগুলো হয়তো নিজে কিনতে পারতাম না, কিন্তু দেখভাল তো করতে পারছি।’

খোলা আকাশে যখন রঙিন পালক রোদে ঝলকে ওঠে, তখন রামলির জীবনের নতুন পথটি চোখে পড়ে স্পষ্টভাবে। মোটরসাইকেলের টুলবক্স থেকে সরে এসে এখন তার হাতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র একটি ছোট বাঁশি। সেই বাঁশির সুরেই ফিরে আসে জোরো, লেক্সাস বা ওয়েল। আর রামলির ঘর ভরে ওঠে ডানার শব্দে, যা তাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—স্বপ্নেরও তো নিজস্ব ডানা আছে!

এপি অবলম্বনে