নাচকে আমরা সাধারণত আনন্দ, বিনোদন বা শরীরচর্চার মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করি। তবে আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, এটি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির এক শক্তিশালী হাতিয়ার। মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক অনন্য মাধ্যম। সম্প্রতি ‘ডান্স সাইকোলজি’ বা নৃত্য মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় উঠে এসেছে, কীভাবে ছন্দময় মুভমেন্ট আমাদের চিন্তাধারা, মানসিক স্বাস্থ্য, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে আমূল বদলে দিতে পারে। তাই আপনি শখের বশে নাচুন বা নিয়মিত, দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে মানসিক স্থিতিশীলতা অর্জনে এ ‘ব্রেইন হ্যাক’ পদ্ধতিটি হতে পারে কার্যকরী সমাধান।

ভারতীয় কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপিস্ট সোনাল খাঙ্গারোতের মতে, নাচ একই সঙ্গে মস্তিষ্কের একাধিক অংশকে সক্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে মোটর কন্ট্রোল, স্মৃতিশক্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলো এতে ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়।

মনোবিজ্ঞানিরা জানান, নিয়মিত নাচ মস্তিষ্কে নতুন নিউরাল সংযোগ তৈরি করে, যাকে বলা হয় নিউরোজেনেসিস। এটি স্মৃতিশক্তি বাড়াতে ও বার্ধক্যজনিত ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া নাচের সময় জটিল শারীরিক মুভমেন্টের মাধ্যমে শরীরের ভারসাম্য এবং স্থানিক সচেতনতা উন্নত হয়।

সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানে ‘ইমপ্রোভাইজেশন’

আন্তর্জাতিক নৃত্য প্রশিক্ষণ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ডান্স মাস্টারক্লাস’-এ প্রচারিত এক ভিডিওতে বিখ্যাত ডান্স সাইকোলজিস্ট পিটার লোভাট বলেন. যখন আমরা কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়া বা ‘ইমপ্রোভাইজড’ উপায়ে নাচি, তখন তা আমাদের চিন্তার ধরন বদলে দেয়। নাচতে গিয়ে যখন আমরা নতুন নতুন মুভমেন্ট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কও ভিন্নভাবে চিন্তা করতে শেখে। এছাড়া নাচের সময়ের স্বতঃস্ফূর্ততা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জটিল সমস্যাগুলোকে আরো সৃজনশীলভাবে সমাধান করতে অনুপ্রাণিত করে।

shorna

ছবি: শশী, মডেল: সাবরিনা স্বর্ণা

হরমোন ও জেনেটিক্সের রসায়ন

নাচের ফলে শরীরে সুখের হরমোন হিসেবে পরিচিত ডোপামিন, সেরোটোনিন ও এন্ডোরফিন নির্গত হয়। এগুলো আমাদের মনকে শান্ত রাখে এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া জেনেটিক গঠন অনুযায়ী কেউ কেউ হয়তো অন্যদের চেয়ে দ্রুত নাচ শিখতে পারেন। তবে এর ইতিবাচক প্রভাব সবার জন্যই সমান।

সামাজিক বন্ধন ও একাত্মতা

সোনাল খাঙ্গারোত জানান, নাচ যখন দলগতভাবে বা সঙ্গীর সাথে করা হয়, তখন মস্তিষ্ক থেকে অক্সিটোসিন বা ‘বন্ডিং হরমোন’ নিঃসৃত হয়। অন্যদের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে নাচলে পারস্পরিক বিশ্বাস, সহযোগিতা ও একাত্মবোধ তৈরি হয়। এটি একাকীত্ব দূর করে মনের গহীনে এক গভীর সংযোগ স্থাপন করে।

কোন নাচে কী উপকার?

সব ধরনের নাচই উপকারি, তবে বিশেষ বিশেষ শৈলী ভিন্ন ভিন্ন মানসিক প্রভাব ফেলে।

hip hop

হিপ-হপ ও ফ্রিস্টাইল: হিপ-হপ বা ফ্রিস্টাইল নাচের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর কোনো ধরাবাঁধা কঠোর নিয়ম নেই। এটি মূলত নিজের ভেতরে জমে থাকা আবেগগুলোকে শরীরের ভাষায় মুক্তি দেয়ার একটি মাধ্যম। এ ধরনের নাচ মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং সৃজনশীল চিন্তা করার জায়গা তৈরি করে দেয়। যখন কেউ কোনো নির্দিষ্ট স্টেপ না মেনে নিজের ছন্দে নাচে তখন মস্তিষ্ক অনেক বেশি সচল ও ফুরফুরে থাকে।

ভরত নাট্যম

শাস্ত্রীয় নৃত্য: কত্থক, ভরতনাট্যম বা ওড়িশির মতো শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলো অত্যন্ত ব্যাকরণসম্মত এবং এখানে প্রতিটি মুদ্রা ও তালের সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকে। বছরের পর বছর একই মুদ্রা বা তাল নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য ও অধ্যবসায়। এটি আমাদের মস্তিষ্কের ‘ফোকাস’ বা একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে।

salsa

সালসা বা ট্যাঙ্গো: এই নাচগুলো সাধারণত একজন সঙ্গীর সাথে করতে হয়। এখানে নিজের নাচের ছন্দের পাশাপাশি সঙ্গীর মুভমেন্টের সাথেও তাল মেলাতে হয়। সালসা বা ট্যাঙ্গোর মতো নাচে সঙ্গীর চোখের ভাষা ও শরীরের সংকেত বুঝতে হয়, যা মানুষের সামাজিক দক্ষতা এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতা বাড়ায়। এটি একাকীত্ব দূর করতে এবং অন্যের সঙ্গে গভীর আবেগীয় বন্ধন ও বিশ্বাস তৈরি করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যারা মানুষের সাথে মিশতে দ্বিধা বোধ করেন, তাদের জন্য এই ডান্স ফর্মগুলো এক চমৎকার থেরাপি হিসেবে কাজ করে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে