বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় শিশুতোষ চরিত্র উইনি দ্য পুহ। সরল ও হৃদয়বান মধুপ্রেমী এ ভালুকের গল্প বই আকারে প্রথম প্রকাশের শতবর্ষ পার করেছে গতকাল। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘উইনি-দ্য-পুহ’ বইটির লেখক এ এ মিলনে ও চিত্রাঙ্কন করেছিলেন ই এইচ শেপার্প।

চরিত্রটির অনুপ্রেরণা ছিল ব্রিটিশ লেখক মিলনের ছেলে ক্রিস্টোফার রবিন এবং তার সংগ্রহে থাকা খেলনা প্রাণী। যাদের মধ্যে ছিল পুহ, পিগলেট, ইইয়োর, আউল, র‍্যাবিট, ক্যাঙ্গা ও রু।

শতবর্ষ পেরিয়ে চরিত্রগুলো আজো কয়েক প্রজন্ম পরের শিশুদের কাছেও জনপ্রিয়। এর মূল কারণ পুহর সরলতা, বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা এবং জীবনের ছোট ছোট আনন্দের প্রতি ভালোবাসা। ‘খুব বেশি বুদ্ধিমান নয়’ বলে নিজেকে বর্ণনা করলেও তার সহজ কথাগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মের গভীর জীবনবোধের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

winnie2

মার্চেন্ডাইজ পণ্যে উইনি দ্য পুহ ও তার বন্ধুরা। ছবি: ওয়াল্ট ডিজনি

উইনি দ্য পুহর কয়েকটি পরিচিত উক্তি—

* কখনো কখনো ছোট ছোট জিনিসই তোমার হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে।
* বন্ধু ছাড়া একটি দিন মানে যেন একটা পাত্র, যেখানে এক ফোঁটাও মধু নেই।
* যদি এমন একটি দিন আসে যখন আমরা একসঙ্গে থাকতে না পারি, তবে আমাকে তোমার হৃদয়ে রেখে দিও। আমি সেখানে চিরকাল থাকব।
* যতটা ভাবো তুমি তার চেয়েও বেশি সাহসী, যতটা মনে করো তার চেয়েও শক্তিশালী, আর যতটা ধারণা করো তার চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান।
* নদী জানে—কোথাও তাড়াহুড়া করার দরকার নেই। আমরা একদিন ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছাব।
* ভালোবাসা মানে কয়েক পা পেছনে হাঁটা, হয়তো আরো বেশি—যাতে অন্যের সুখের জন্য জায়গা করে দেয়া যায়।
* কিছু না করা—এটাই অনেক সময় সবচেয়ে ভালো কিছু করা।

১৯২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর লন্ডনের ইভিনিং নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত দ্য রং সর্ট অব বি’স গল্পে প্রথমবার আবির্ভূত হয় পুহ। এরপর ১৯২৬ সালের ১০ মার্চ পূর্ণাঙ্গ বই প্রকাশিত হয়। ১৯২৮ সালে দ্বিতীয় বই ‘দ্য হাউজ অ্যাট পুহ কর্নার’ প্রকাশিত হয়, যেখানে টিগার চরিত্রটি যুক্ত হয়। গল্পগুলোর পটভূমি ছিল ইংল্যান্ডের অ্যাশডাউন ফরেস্ট, এখানকার গ্রামীণ পরিবেশে ছিল লেখক মিলনের বাড়ি।

১৯৬০-এর দশকে পুহ চরিত্রটির মালিকানা স্বত্ত্ব লাভ করে দ্য ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানি। এরপর অ্যানিমেশন, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও নানা পণ্যের মাধ্যমে চরিত্রটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৬৬ সালে ডিজনির প্রথম অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম প্রকাশ হলে পুহের অতিপরিচিত লাল টি-শার্ট পরা মোটা ভালুকের চেহারা স্থায়ী হয়ে যায়।

winnie3

গল্পের বইয়ে উইনি দ্য পুহ। ছবি: ওয়াল্ট ডিজনি

পরবর্তী কয়েক দশকে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ হয়েছে পুহকে নিয়ে লেখা বই, চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন, খেলনা, ব্যাকপ্যাক ও ঘড়িসহ নানান ধরনের মার্চেন্ডাইজ পণ্য। এছাড়া ২০১৮ সালে ‘ক্রিস্টোফার রবিন’ চলচ্চিত্রে প্রাপ্তবয়স্ক রবিনের সঙ্গে পুহর পুনর্মিলনের গল্প দেখানো হয়।

পুহ শুধু শিশুতোষ চরিত্রই নয়, সাংস্কৃতিক প্রতীকও হয়ে উঠেছে। ১৯৭২ সালে মজার ছলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ‘প্রার্থী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তুলনা করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ফলে চীনে অনেক সময় সেন্সরে পড়েছে পুহ। ২০২৩ সালে উইনি দ্য পুহর প্রথম বইয়ের কপিরাইটমুক্ত হয়ে যায়। এর পর ওয়াল্ট ডিজনির সংস্করণ বাদ দিয়ে চরিত্রটিকে শিথিল উপস্থাপন করে কিছু কনটেন্ট তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘উইনি দ্য পুহ: ব্ল্যাড অ্যান্ড হানি’।

এদিকে পুহের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ডিজনি বছরব্যাপী বৈশ্বিক উদ্‌যাপনের আয়োজন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন বই ও প্রকাশনা, খেলনা ও পণ্যের বিশেষ কালেকশন, অ্যানিমেশন ও গল্পভিত্তিক নতুন কনটেন্ট, বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনী এবং অভিজ্ঞতামূলক অনুষ্ঠান। এছাড়া অ্যাশডাউন ফরেন্ট এলাকায় বিশেষ অনুষ্ঠান, হাঁটার ট্রেইল এবং পুহ-থিমের ইনস্টলেশনও পরিকল্পনা করা হয়েছে।