কাচের দেয়ালঘেরা আকাশচুম্বী ভবনের ফাঁক গলে দ্রুত ছুটে যাচ্ছে ড্রোন। অন্যদিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টারত গুপ্তচরকে ধাওয়া করছে এজেন্টরা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চালকবিহীন আকাশযানটি পাকড়াও করে ফেলে ফেলে গুপ্তচরকে। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনঝেনের নাটকীয় দৃশ্যটি এরই মধ্যে দেশ-বিদেশে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও লাখো মানুষ দেখেছে।
দৃশ্যটি সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া চীনা চলচ্চিত্র ‘স্কেয়ার আউট’-এর। একে বিরল এক নির্মাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ চীনের গোপন ও শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি বা এমএসএসের এর সমর্থনে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র এটি।
অনেক দেশে গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরে মোল বা গুপ্তচর নিয়ে সিনেমা নতুন কিছু নয়। কিন্তু চীনে তা এতদিন অভাবনীয় বিবেচিত হয়ে আসছিল। কারণ সাধারণত কী প্রকাশ করা যাবে সে বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে দেশটির নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিদেশী ভাষা বিভাগে অস্কারের জন্য মনোনীত চলচ্চিত্রের পরিচালক ঝাং ইমৌ নির্মাণ করেছেন ‘স্কেয়ার আউট’, যেখানে উপস্থাপিত হয়েছে এমএসএস। সংস্থাটি আশা করছে, সিনেমাটি নাগরিকদের সম্ভাব্য বিদেশী হুমকি থেকে দেশকে রক্ষা করার ব্যাপারেও সচেতন করবে। চীনা নববর্ষের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে এমএসএস বলেছে, চলচ্চিত্রটির লক্ষ্য হলো ‘গণ প্রতিরক্ষা লাইন শক্তিশালী করা’ এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তা শিক্ষার সময়োপযোগী প্রতিধ্বনি’।
সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রকাশ্য হয়েছে এমএসএস। কিছু গোপন কার্যক্রমও আংশিকভাবে সামনে আনছে এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। প্রায় দুই বছর আগে চীনের বৃহত্তম সামাজিকমাধ্যম প্লাটফর্ম উইচ্যাটে তাদের প্রথম অনলাইন পোস্টে বলা হয়েছিল, কাউন্টার-এসপিওনাজের জন্য পুরো সমাজকে সক্রিয় করা প্রয়োজন।

স্কেয়ার আউট চলচ্চিত্রের দৃশ্য। ছবি সংগৃহীত
এরপর থেকে মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতিদিনই পোস্ট দিচ্ছে। কিছু পোস্টে বাস্তব ঘটনার কথাও উল্লেখ থাকে। যেমন একটিতে বলা হয়েছিল, এক ট্রাভেল-ব্লগার নাকি চীনা কলেজ শিক্ষার্থীকে একটি সামরিক ঘাঁটির ছবি তুলতে বলেছিলেন। আরেক ঘটনায় বলা হয়, সামরিক বিষয়ে আগ্রহী এক ব্যক্তি স্থানীয় রিসাইক্লিং স্টেশন থেকে এক ডলারেরও কম দামে চারটি সামরিক গোপন তথ্যসংবলিত বই কিনেছিলেন। সংস্থাটি কমিকস, ছোট ভিডিও ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও প্রকাশ করেছে।
জ্যাকসন ই ও ঝু ইলং অভিনীত ‘স্কেয়ার আউট’ চলচ্চিত্রে চীনের গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরে থাকা এক ‘মোল’কে খোঁজার অভিযান দেখানো হয়েছে। ওই ব্যক্তি নতুন একটি যুদ্ধবিমানের তথ্য ফাঁসের চেষ্টা করছিল।
কিছু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, এমএসএস তাদের কাজকে শুধু দৃশ্যমানই করতে চায় না। বরং সন্দেহজনক কিছু দেখলে তা জানানোর জন্য সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণেও উৎসাহ দিতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক শিনা গ্রেইটেন্স বলেন, ‘তথ্য শেয়ারে উৎসাহিত করতে জনসমর্থন গড়ে তুলতে চাইছে এমএসএস।’
তিনি আরো বলেন, এটি ‘চীনা নাগরিকদের সক্রিয় করার এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে বিনোদনমূলক ও আকর্ষণীয় করে তোলার একটি অত্যন্ত পরিশীলিত প্রচেষ্টা।’
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র এবং দেশের বৃহত্তম জাতীয় পত্রিকা পিপলস ডেইলিতে লেখা এক মতামত নিবন্ধে পরিচালক ঝাং ইমৌ বলেন, ‘চলচ্চিত্রটি বাস্তবতার কাছাকাছি রাখতে পুরো শুটিং প্রক্রিয়াজুড়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন রয়েছে, সিনেমাটির গল্প নাকি বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা। যেখানে একজন গবেষক চীনের জে-৩৫ যুদ্ধবিমান সম্পর্কিত তথ্য ফাঁস করে দেন। তবে এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে জবাব দেয়নি এমএসএস।
চীনের পাশাপাশি ‘স্কেয়ার আউট’ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় মুক্তি পায়। দুই সপ্তাহে এর বক্স অফিস আয় পৌঁছেছে ১১০ কোটি ইউয়ান বা ১৬ কোটি ডলারের সমপরিমাণ।
ওয়াশিংটনে ই-কমার্স খাতে কাজ করা ২৮ বছর বয়সী অ্যালিস জিনের ভাষায়, ‘এটা আমার প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ছিল। এমএসএস কী তা আগে আমি জানতামই না।’
সিনেমায় দেশপ্রেম তুলে ধরার বিষয়টি উল্লেখ করে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ওয়াং লেহাংয়ের মতে, ‘সিনেমাটি যেকোনো বক্তৃতার চেয়ে অনেক ভালো।’
দশকের পর দশক ধরে বিশ্বের অন্যান্য দেশে গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে সিনেমা তৈরি হচ্ছে। প্রথম ‘জেমস বন্ড’ চলচ্চিত্র মুক্তি পায় ছয় দশকেরও বেশি আগে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অনেক চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজে উপস্থাপিত হয়েছে, যেমন জনপ্রিয় জেসন বর্ন সিরিজ। জানা যায়, বিনোদন শিল্পে নিজেদের উপস্থাপন কেমন হবে তা প্রভাবিত করে সিআইএ।
ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এজ হিল ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র প্রভাষক লিয়াম ম্যাকলাফলিন বলেন, পশ্চিমা চলচ্চিত্র সাধারণত ‘সমস্যা কোথা থেকে আসছে’ তা দেখানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। অন্যদিকে চীন অভ্যন্তরীণভাবে মানুষকে বোঝাতে চায় যে তারা পশ্চিমের পক্ষে নয়।
‘স্কেয়ার আউট’ মুক্তির সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই সময়ে অনলাইন মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে চীনা কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গুপ্তচর হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে সিআইএ। সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে ম্যান্ডারিন ভাষায় বলা হয়েছে, ‘চীনের শীর্ষ নেতাদের সম্পর্কে আপনার কাছে কি কোনো তথ্য আছে? আপনি কি সামরিক কর্মকর্তা, অথবা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেন? আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আমরা সত্যটা জানতে চাই।’
এ ধরনের সম্ভাব্য গুপ্তচর নিয়োগের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের বক্তব্য, অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এপি অবলম্বনে









