মানুষ কেবল বাঁচার জন্য খায় না, খাবার উপভোগের
ব্যাপারও বটে। মানব সভ্যতা যত এগিয়েছে, খাবার পর্যায়ক্রমে তত বেশি শৈল্পিক হয়েছে। ‘রন্ধনশিল্প’
শব্দবন্ধের উত্পত্তি এখান থেকেই। বিভিন্ন সময়ে এক বা একাধিক খাবার আভিজাত্যের পরিচায়ক
হয়ে উঠেছে। তেমনই একটি ‘কাছিমের স্যুপ’!
কাছিমের স্যুপ খাওয়াকে উত্সাহিত করা কোনোভাবেই
এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাসের একটি অধ্যায় তুলে ধরাই লক্ষ্য।
জিভে
জল চলে আসছে?
ঢাকনাযুক্ত বড় একটি পাত্র পরিবেশন করা হলো
আপনার সামনে। ঢাকনা তোলার সঙ্গে সঙ্গে খুশবুতে ভরে গেল চারপাশ। পাত্রের ভেতরে রাখা
সুস্বাদু স্যুপের মাঝে ভাসছে চমত্কার করে কাটা সবুজ কাছিমের টুকরো। একবার চোখ বন্ধ
করে ভাবুন তো। নাসারন্ধ্রে সুড়সুড়ি দিচ্ছে? জিভে জল চলে আসছে?
এখন অদ্ভুত মনে হলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি
সময়ে ভারতে বসবাসরত ইংরেজ অভিজাতদের ভোজসভায় সবচেয়ে মূল্যবান ও অভিজাত খাদ্য ছিল কাছিমের
স্যুপ।
অভিজাত ইংরেজদের ব্যাপক চাহিদা মেটানোর জন্য
ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে এসব কাছিম জ্যান্ত ধরে আনা হতো।
কাছিমের
গল্প আরো পুরোনো
ইংরেজ ছাড়াও উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে কাছিম
খাওয়ার অভ্যাস প্রচলিত ছিল। এছাড়া হরিণ, ছাগল ও ভেড়ার মাংস ছিল তাদের পছন্দের তালিকায়।
ইংরেজরা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে অভিযান চালানোর সময়ে কাছিম খাওয়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু
ভারতে এ খাদ্যাভ্যাস বহু আগে থেকে প্রচলিত ছিল। এ অঞ্চলের সাহিত্যে অনেক আগে থেকেই
কাছিমের ডিম ও মাংস খাওয়ার কথা উঠে এসেছে।
মধ্যযুগের কবি নারায়ণ দেব রচিত ‘পদ্মপুরাণে’ ননদকে ভাবীর জন্য বাচ্চা কাছিমের পা রান্না করার ঘটনা উল্লেখ আছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলে কোড়া নারিকেল দিয়ে কাছিমের মাংস রান্না করার কথা বলেছেন। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত আসামের ‘কুমার হরণ’ কাব্যে মসুর ডাল দিয়ে কাছিমের ডিম রান্নার কথা বলা হয়েছে।
ছবি: এপি
কাছিম
রান্নার রেসিপি
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর রান্নার বইগুলোতে
কাছিমের মাংস রান্না করার কিছু রেসিপি আছে। একটি রেসিপি অনুসারে, কাছিমের টুকরো প্রথমে
মসলা দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে কিছু সময় রাখতে হবে। তারপর ওয়াইন ও লেবুর রস দিয়ে তা ভেজে
নিতে হবে।
আরেকটি রেসিপি হলো, কাছিমের মাংস সুগন্ধি
মসলা ও লাল মরিচ দিয়ে মাখিয়ে অর্ধেক দিন রেখে দিতে হবে। তারপর কাছিমের স্যুপ রান্না
করে কাছিমের খোলসেই তা পরিবেশন করতে হবে।
পেট
ভালো রাখে কাছিম!
কাছিমের খোলসে কাছিম খাওয়া! ওষুধ হিসেবেও
এর প্রচলন ছিল। প্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিত্সক চারক বদহজম ও দুর্বলতায় ভোগা রোগীদের ওষুধ
হিসেবে কাছিমের মাংস খাওয়ার পরামর্শ দিতেন।
ওয়াইল্ড
ম্যান অ্যান্ড ওয়াইল্ড বিস্টস
ইংরেজদের মাঝে কাছিমের মাংস ব্যাপক জনপ্রিয়তা
লাভ করেছিল। লেফটেন্যান্ট কর্নেল গর্ডন কামিংস তার ‘ওয়াইল্ড ম্যান অ্যান্ড ওয়াইল্ড
বিস্টস’ নামক গ্রন্থে কাছিম শিকারের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। রীতিমত বিজ্ঞাপন দিয়ে কাছিম
সংগ্রহ করতো ইংরেজরা। ১৭৮৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ক্যালকাটা গেজেট পত্রিকায় জনৈক মিস্টার
ক্রেইফটন কাছিমের মাংসের খোঁজ চেয়ে একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। কোলকাতার এক ধর্মযাজক
ওয়ালটার কেলি ফারমিংগার তার “থেকার’স গাইড টু ক্যালকাটা” বইয়ে সে বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ
করেছেন।
স্ক্রল.ইন
অবলম্বনে নিজাম আশ শামস










