যে কোনো দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে জাতির মহান নেতাদের ভাষণের গুরুত্ব অশেষ। যেমন আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করেছিল প্যাটরিক হ্যানরির ‘Give me liberty, or give me death!’ ভাষণটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ৭ মার্চের ভাষণের কথা সর্বজনবিদিত ও আজো প্রাসঙ্গিক।
সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে যেতে হয়, সংগ্রামের পথে আম জনতাকে অনুপ্রাণিত করতে হয় এবং জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে দিতে হয়। এভাবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন পেতে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে বিপুল জনসমাবেশে ভাষণ দিতে হয়।
অধিক সংখ্যক লোকের কাছে পৌঁছুতে তাই তাদের ব্যবহার করতে হয় মাইক্রোফোন যন্ত্র; যা তাদের গলার আওয়াজ বিবর্ধিত করে সামনে জড়ো হওয়া শ্রোতাদের কানে পৌঁছে দেয়।
দেরিতে হলেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পেছনে থাকা মাইক্রোফোন কোম্পানি ‘কল রেডি’র গল্প আমরা জানতে পেরেছি। ভারতের স্বরাজ আন্দোলনের সাথেও এমন একটি মাইক্রোফোন কোম্পানির গল্প জড়িয়ে রয়েছে যার নাম ‘শিকাগো রেডিও’।
মাইক্রোফোন কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভারতের মুম্বাই শহরে। যার স্বপ্নদ্রষ্টা নানিক মোতওয়ানে ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তরুণ স্বেচ্ছাসেবক।
ভারতের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে দলটির একটি জনসভায় বক্তৃতা করতে গিয়েছিলেন গান্ধী। তখন ২৭ বছর বয়সী মোতওয়ানে দেখেন যে, উপস্থিত জনগণের সামনে গান্ধী উচ্চস্বরে বক্তৃতা করতে পারছেন না। এমনিতেই গান্ধীর গলায় শক্তি বিশেষ একটা ছিল না। বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায় মোতওয়ানে তা ভাবতে লাগলেন। এর দুই বছর পর সভাস্থলে বক্তাদের কথা বলতে সুবিধা হওয়ার জন্য প্রবর্তন করলেন মাইক্রোফোন ব্যবস্থা। নাম রাখলেন ‘শিকাগো রেডিও’।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গান্ধী, নেহেরু, নেতাজী তথা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িত নেতৃবন্দ এ মাইক ব্যবহার করে ভাষণ দিয়েছেন। এভাবে পরবর্তী দুই দশক ধরে ভারতের স্বরাজ আন্দোলনের প্রতিটি ভাষণে ব্যবহৃত হয়েছে শিকাগো রেডিওর মাইক।
সেকালে নেতা-কর্মীদের সাথে নানিক মাতওয়ানকে মাইক্রোফোনের সমস্ত সরঞ্জাম নিয়ে ছুটতে হতো দূর-দূরান্তের জনসভায়। নির্ধারিত সভার আগের দিন পৌঁছে সাউন্ড সিস্টেম ঠিক আছে কিনা দেখতে হতো। এরপর তিনি অপেক্ষা করতেন নেতা-কর্মীদের আগমনের।
সম্প্রতি নানিক মাতওয়ানের পুত্র কিরণ মাতওয়ান পিতার প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির গল্প শোনান।
তিনি জানান, বর্তমানে আধুনিক অনেক প্রযুক্তি সুলভ হওয়ায় কমে যাচ্ছে মাইক্রাফোনের ব্যবহার। নতুন দিনের চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করে আজও টিকে আছে ‘শিকাগো রেডিও’ নামে কালের সাক্ষী এই প্রতিষ্ঠানটি।
বিবিসি অবলম্বনে










