উত্তর মালাউইয়ের এক নিরিবিলি পাহাড়ের পাদদেশে ছড়িয়ে থাকা পোড়া হাড় আজ অতীতের এক রহস্যময় গল্প বলছে। প্রায় সাড়ে ৯ হাজার বছর আগে সেখানে এক নারীকে আগুনে দাহ করা হয়েছিল। আফ্রিকা মহাদেশে এখন পর্যন্ত পাওয়া এটি সবচেয়ে প্রাচীন অগ্নিদাহের প্রমাণ।

উত্তর মালাউই সমতলের হোরা পর্বত

উত্তর মালাউই সমতলের হোরা পর্বত

আফ্রিকার হোরা পর্বতের পাদদেশে ‘হোরা-১’ নামে একটি বিশাল পাথরের গুহায় এই নারীর হাড়ের টুকরো পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, ওই নারী ছিলেন শিকারি ও সংগ্রাহক গোষ্ঠীর সদস্য। ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তিনি উচ্চতায় ছিলেন ৫ ফুটেরও কম। আনুমানিকভাবে তার বয়স ছিল ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। ওই গুহায় সাধারণত মৃতদেহ কবর দেয়ার প্রথাই চালু ছিল। কিন্তু এই নারীই ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম, যার জন্য বেছে নেয়া হয়েছিল দাহ করার রীতি। তাই প্রশ্ন উঠেছে, কেন তার জন্য বিশেষ এ আয়োজন?

গবেষকরা জানান, সেই আদিম যুগে একটি শরীরকে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা ছিল খুব বিরল ও পরিশ্রমসাধ্য একটি কাজ। এই নারীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় প্রায় ৩০ কেজি শুকনো কাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল। আগুন জ্বলেছিল দীর্ঘ সময় ধরে, হয়তো কয়েক দিন। তাপমাত্রা ছিল ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি। আগুন নিভে যাওয়ার পর যে ছাইয়ের স্তূপ পাওয়া যায়, তা ছিল প্রায় একটি বড় খাটের সমান। সেখানে পাথরের তৈরি ধারালো অস্ত্রের অংশও পাওয়া গেছে। আর তা ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অগ্নিদাহের জায়গা থেকেপাথরের তৈরি তীরের ফলা বা সুচালো অংশ উদ্ধার করা হয়েছে

অগ্নিদাহের জায়গা থেকে পাথরের তৈরি তীরের ফলা বা সুচালো অংশ উদ্ধার করা হয়েছে

হাড়ের চিহ্ন দেখে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, দাহ করার আগে ওই নারীর শরীর থেকে মাংস সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তবে এটি নরখাদকতার ইঙ্গিত নয়। বরং এটি ছিল কোনো প্রথা বা বিদায় অনুষ্ঠানের অংশ।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক দল ওই নারীর হাড়ে কাটা দাগ খুঁজে পেয়েছে, যা হাড় থেকে মাংস ছাড়িয়ে নেয়ার প্রমাণ দেয়

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক দল ওই নারীর হাড়ে কাটা দাগ খুঁজে পেয়েছে, যা হাড় থেকে মাংস ছাড়িয়ে নেয়ার প্রমাণ দেয়

আরো আশ্চর্যের বিষয় ছিলো, চিতার ছাইয়ের স্তূপে তার মাথার খুলি বা দাঁতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, মাথাটি আগে আলাদা করে অন্য কোথাও সংরক্ষণ বা সমাহিত করা হয়েছিল।

হোরা-১ এর আশেপাশের এলাকায় মাটির বিভিন্ন স্তরের মধ্যে কালো ও ঘন ছাইয়ের স্তূপটি স্পষ্টভাবে আলাদা করা যাচ্ছে

হোরা-১ এর আশেপাশের এলাকায় মাটির বিভিন্ন স্তরে কালো ও ঘন ছাইয়ের স্তূপ স্পষ্টভাবে আলাদা করা সম্ভব হয়েছে

এই নারী সম্পর্কে খুব বেশি জানা না গেলেও তার জীবন যে আলাদা গুরুত্ব বহন করত, সেটি স্পষ্ট। তার হাড় পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তার চলাফেরা সীমিত থাকলেও অন্যদের তুলনায় বাহু ব্যবহারের হার ছিল অনেক বেশি। আর এ কারণেই গবেষকরা ধারণা করছেন, তিনি শিকারি হয়ে থাকতে পারেন। কিংবা হয়তো তার সামাজিক জীবনের কোনো বিশেষ পরিস্থিতি তাকে সমসাময়িক অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল, যার কারণে মৃত্যুর পর তিনি এমন অনন্য এক বিদায় পেয়েছিলেন।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো হোরা পর্বতকে ঘিরে মানুষের স্মৃতিচর্চাও এই আবিষ্কারকে আরো অর্থবহ করে তুলেছে। দাহের প্রায় ৭০০ বছর আগেও সেখানে বড় আগুন জ্বালানোর চিহ্ন মিলেছে। আবার দাহের ৫০০ বছর পরেও একই জায়গায় আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, এই জায়গাটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত হতো স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।

—সিএনএন