প্রায় তিন মিলিয়ন বছর আগে প্রাচীন ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলে দুই প্রজাতির মানুষ একইসঙ্গে বাস করত। এতদিন আমাদের প্রচলিত ধারণা ছিল, মানুষের বিবর্তন একটি সরল রেখার মতো, যেখানে এক প্রজাতি বিলুপ্ত হলে অন্য প্রজাতির আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু পুরো বিষয়টি এতোটাও সরল নয়।
ঐ সময় এক ধরনের মানুষ ছিল অস্ট্রেলোপিথেকাস জাতের। তারা লুসি প্রজাতির মতো ছোট মস্তিষ্কের কিন্তু দুই পায়ে হাঁটতে সক্ষম ছিল। আবার অন্যটি ছিল হোমো প্রজাতির। এরা বড় মস্তিষ্ক নিয়ে উদ্ভূত প্রাথমিক মানুষ। সম্প্রতি এই রহস্য উদঘাটন করেছে আফারে পাওয়া জীবাশ্ম দাঁত।
২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিভিন্ন খননের সময় এই দাঁতগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে। ২০১৮ ও ২০২০ সালে পাওয়া দশটি দাঁত অস্ট্রালোপিথেকাসের এবং ২০১৫ সালে পাওয়া তিনটি দাঁত হোমো প্রজাতির। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার’ জার্নালে।
গবেষকরা বলছেন, যেকোনো প্রাণীরই দুটি প্রজাতির একই সময়ে বসবাসের প্রমাণ খুবই বিরল। আর এক্ষেত্রে মানুষের দুই প্রজাতি তো বিজ্ঞানীদের চিন্তার বাইরে ছিল! কারণ আগে মনে করা হতো, হোমো প্রজাতি অস্ট্রেলোপিথেকাসের পরে উদ্ভূত হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, তারা একই সময়ে একই জায়গায় বাস করত।
অস্ট্রেলোপিথেকাসরা মানুষের মতো হাঁটত। কিন্তু তাদের মস্তিষ্ক ছোট ছিল। অন্যদিকে, হোমো প্রজাতির বড় মস্তিষ্ক তাদের আধুনিক মানুষের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।
তবে আফারের আবিষ্কার দেখাচ্ছে, মানুষের পুর্বপুরুষদের জীবন সরলরৈখিক নয়। বরং একটি জটিল, ঝাউজাতীয় বৃক্ষের মতো। তাদের কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে, কিছু আবার একসঙ্গে বাস করেছে, এদের কেউবা এক হয়ে নতুন সংস্করণও তৈরি করেছে।
অফার অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান ও টেকটোনিকে প্লেটের সক্রিয়তার কারণে বিভিন্ন স্তরের জমি উন্মোচিত হয়েছে। আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে থাকা খনিজের মাধ্যমে প্রাচীন স্তরের সঠিক তারিখ নির্ধারণ সম্ভব হয়েছে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলোপিথেকাসের দাঁতগুলো ২ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন বছর পুরনো। আর হোমো দাঁতগুলো ২ দশমিক ৫৯ থেকে ২ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন বছর পুরনো।
অস্ট্রেলোপিথেকাসের দাঁত আকৃতিতে লুসির সঙ্গে মিললেও কিছু বৈশিষ্ট্য আবার ভিন্ন। গবেষকরা আরো জীবাশ্ম খুঁজছেন, যাতে নতুন প্রজাতি চিহ্নিত করা যায়। এতে মানুষের বিবর্তনের আরো স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করছেন তারা।
প্রায় তিন মিলিয়ন থেকে দুই মিলিয়ন বছর আগে আফারের পরিবেশ ছিল আধা-শুষ্ক, নদী কেবল মরসুমে পূর্ণ হতো আর আশপাশে ছিল তৃণভূমি ও জলাভূমি।
গবেষকরা এখন পরীক্ষা করছেন, এই দুই প্রজাতি একই খাবার খেত কিনা। এছাড়াও তারা খুঁজছেন, প্রাচীন পাথরের সরঞ্জাম কোন প্রজাতি ব্যবহার করত। এই আবিষ্কার মানুষের বিবর্তনের অজানা অধ্যায় উন্মোচন করছে। আশা করা হচ্ছে, আরো জীবাশ্মের মাধ্যমে প্রাচীন মানুষের পুর্বপুরুষদের জীবন ও তাদের যাপিত জীবনের গল্প আরো ভালোভাবে জানা যাবে।
—সিএনএন










