‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’, অর্থনীতি নিয়ে পাঠে যে বইটি আপনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না। ‘পুঁজিবাদের জনক’ হিসেবে পরিচিতি অ্যাডাম স্মিথের এ ম্যাগনাম ওপাস প্রকাশের পর কেটে গেছে ২৫০ বছর। এটি এমন এক সময় যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প সূচিত বাণিজ্য মেরুকরণের বিরোধিতা জোরালো হচ্ছে। ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপ, শুল্ক কমানো বা মনোপলির বিরোধিতাও আজকের অর্থনৈতিক বিতর্কে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। অ্যাডাম স্মিথ বেঁচে থাকলে হয়তো তার কলম থেকে এসবও উঠে আসতে পারত। আসলে কি তাই?

আধুনিকাতার সূচনাপর্বের ‘প্রগতিশীল অর্থনীতিবিদ’ হিসেবেও দেখা হয় অ্যাডাম স্মিথকে। ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ পুঁজিবাদ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে দেখা হলেও একই বইয়ে বাণিজ্য সুরক্ষা নীতি এবং চরম ধনতন্ত্রের বিরোধিতা রয়েছে। অবশ্য স্মিথ যখন এসব লিখেছিলেন, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প বা আধুনিক প্রযুক্তি পুঁজিপতিদের মতো বাস্তবতা ছিলই না। আবার পুঁজিবাদের চরম বিকাশকালে এসব এড়ানো সম্ভব কি-না তাও প্রশ্ন।

স্কটিশ এ অর্থনীতিবিদ লিখেছেন, ‘বিচক্ষণ পরিবারপ্রধানের নীতি হলো, কখনোই এমন কিছু তৈরি করার চেষ্টা না করা যা নিজে তৈরি করতে গেলে কেনার চেয়ে বেশি খরচ হবে।’ উদাহরণ সামনে আনেন, স্কটল্যান্ডে আঙুরের তৈরি মদ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এ পানীয় প্রস্তুতের জন্য বিদেশী মদ আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করা কি যৌক্তিক?

ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির ভিত্তিমূলক গ্রন্থটি প্রকাশ হয় ১৭৭৬ সালের ৯ মার্চ। ফরাসি বিপ্লবের ১৩ বছর আগে এবং শিল্প যুগের প্রারম্ভিক উত্থানের সময়। আর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষিত হয় একই বছরে। এখন বইয়ে সমালোচিত নীতিগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মতবাদের অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
adam-smith2

’দ্য ওয়েলথ অব নেশনসের’ প্রথম সংস্করণ। ছবি রয়টার্স

সাধারণত মুক্ত বাজার ও মুক্ত বাণিজ্য নীতির জন্য আলোচনার কেন্দ্রে থাকে অ্যাডাম স্মিথ। তার গুণগ্রাহী ও সমালোচক দুইপক্ষের কাছ থেকেই। তাকে এভাবে উদ্বৃত করেন অনেকে, ‘জনগণের খরচে ধনীদের অবদান রাখা উচিত, এটি মোটেও অযৌক্তিক নয়। শুধু আয়ের অনুপাতে নয়, বরং তার চেয়েও বেশি অবদান রাখতে পারে তারা।’ অথবা ‘কোনো সমাজ সত্যিই সমৃদ্ধ ও সুখী হতে পারে না, যদি তার প্রায় সব সদস্য গরিব ও দুঃখী হয়।’

এই যে অনেক পণ্ডিত বলেন, আজকের অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিক ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’। তবে স্মিথ আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান।

মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রবক্তারা দীর্ঘদিন ধরে অ্যাডাম স্মিথকে আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে দেখেন। আবার কিছু সাম্প্রতিক পাঠ তাকে প্রায় মধ্যপন্থী প্রগতিশীল, অনেকটা আধুনিক ইউরোপীয় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটসদের মতো করে বর্ণনা করেন।

কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষণা সহকারী লিও স্টিডসের মতে, অর্থনীতি বিষয়ে যেকোনো বক্তব্যের সমর্থনে অ্যাডাম স্মিথের লেখা বা মতামত এখনো ব্যবহার করা যায়। কারণ তার বইতে এত বিস্তৃত ধারণা রয়েছে, যা প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। যেমন স্মিথ স্বীকার করতেন, বাণিজ্যের শর্তের অসামঞ্জস্য বা নিরাপত্তার কারণে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শুল্ক প্রযোজ্য হতে পারে। এখনো এমন যুক্তি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য বাণিজ্য ব্লকে শোনা যায়।

মুক্তবাজারকেন্দ্রিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অ্যাডাম স্মিথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ইমন বাটলার বলেন, ‘স্মিথ এসব যুক্তি বুঝতে পারতেন। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন এগুলো যতটা সম্ভব অস্থায়ী হওয়া উচিত। তার মতে, যত বেশি বাণিজ্য হবে, সবাই তত উপকৃত হবে।’

‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ বইয়ের সবচেয়ে পরিচিত রূপক হলো ‘অদৃশ্য হাত’ বা ইনভিজিবল হ্যান্ড। টার্মটি সাধারণত বোঝায়, মুক্ত বাজারে সবাই নিজের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করলেও তা শেষ পর্যন্ত সবার জন্য ভালো ফল দেয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের ডিনারের জন্য আমরা কসাই, পানীয় বা রুটি প্রস্তুতকারকের সদিচ্ছা থেকে আশা করি না, বরং তাদের স্বার্থের প্রতি মনোযোগ থেকে আশা করি।’
Adam-Smith3

স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় অ্যাডাম স্মিথের সমাধি। ছবি: রয়টার্স

তবে অনেকে এটা মনে করিয়ে দিতে কসুর করেন না, অদৃশ্য হাত শব্দটি বইয়ে শুধু একবারই ব্যবহার করেছেন স্মিথ। তাই পুরো বইয়ের যুক্তি কাঠামোর সঙ্গে এক মিলিয়ে পড়া উচিত, শুধু বাজারকে ছেড়ে দেয়ার নীতি (লেসে ফেয়ার) সমর্থনের জন্য নয়। ভারতীয় শিক্ষাবিদ ও পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল প্রতাপ ভানু মেহতা বলেন, ‘আসলে বিশেষ স্বার্থ, মনোপলি, ক্ষমতাধর ব্যক্তি এবং দেনদরবার কীভাবে রাষ্ট্র দখল করে তা নিয়ে সমালোচনা এ বই।’ এসব ঠিক করলে মুক্ত বাজার আসবে এমনটাই স্মিথের ধারণা বলে জানান প্রতাপ ভানু।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী জোসেফ স্টিগলিটজও বিষয়টির সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, ‘সমাজকে বিস্তৃতভাবে দেখার ওপর ভিত্তি করে স্বার্থপরতার এ সংজ্ঞা অনেক বেশি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। আধুনিক অর্থনীতি অসীম স্বার্থপর মানুষকে ধরে সমাজকে বিবেচনা করে। স্পষ্ট যে অ্যাডাম স্মিথ তা বিশ্বাস করতেন না।’

গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে নীতি দর্শন পড়াতেন অ্যাডাম স্মিথ। স্বার্থপরতার নৈতিক সীমার প্রসঙ্গে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘নিজেদের জন্য সবকিছু, অন্যদের জন্য কিছুই না। এটি প্রতিটি যুগে মানবজাতির নেতাদের জন্য দুঃখজনক নীতি।’

তবে স্মিথকে আধুনিক প্রগতিশীল বা অন্য কোনো বর্তমান মানদণ্ডে পুরোপুরি পুনঃসংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। ধনীদের সমালোচনা করেছেন তিনি এবং বলেন, কয়েকজনের ধন সঞ্চয় অনেকের জন্য দারিদ্র্য সৃষ্টি করে। ভানু প্রতাপের মতে, নিজের সময়ের অন্য চিন্তাবিদদের মতো স্মিথও এমন কিছু বৈষম্য স্বাভাবিক মনে করতেন, যা আজকের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়।

কার্ল মার্কসসহ অনেকে পরবর্তীতে শ্রমের বিভাজন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি বিষয়ে স্মিথের ধারণাগুলোর সমালোচনা করেছেন। কারণ এ প্রক্রিয়া কারখানায় শ্রমিকদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, একঘেয়ে কাজ করতে বাধ্য করেছিল।

তবুও অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গোল্ডস্মিথস কলেজের অধ্যাপক রিচার্ড ভ্যান ডেন বার্গ বলেন, বইটি নিয়ে নানান ধরনের প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা সত্ত্বেও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এর আকর্ষণ কমেনি। ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ শুধু তথ্য দেয়ার জন্য নয়; বরং মানুষকে নতুন অর্থনৈতিক ধারণা ও চিন্তা তৈরি করতে সাহায্য করে।

রয়টার্স অবলম্বনে